আখেরি চাহার শোম্বা

মোঃ আবদুল গাফফার ভুঁইয়া ২২ অক্টোবর,২০১৯ ১২৪ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

আখেরি চাহার শোম্বা :


সফর মাসের শেষ বুধবার আখেরি চাহার শোম্বা। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণে এ দিনটি অতি মর্যাদাপূর্ণ। ফারসি শব্দমালা ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ অর্থ শেষ চতুর্থ বুধবার। রাসূলুল্লাহ (সা.) এদিন শেষবারের মতো রোগমুক্তি লাভ করে গোসল করেছিলেন। এ দিন মুসলমানরা ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত মহব্বত ও প্রেমের সঙ্গে নফল ইবাদত-বন্দেগি করেন ও রাসূল (সা.)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করে ঈমানি চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টিতেও এ দিনের গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরানসহ বিশ্বের অনেক দেশে আখেরি চাহার শোম্বা তাৎপর্যের সঙ্গে পালন করা হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকালের প্রায় ৬ মাস আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পন্ন হয়েছে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আভাস পেতে লাগলেন, ‘আপনার জন্য পরবর্তী সময় তো পূর্ববর্তী সময় অপেক্ষা শ্রেয়।’ (সূরা আদ-দোহা, আয়াত-৪)। এরপর থেকেই তিনি দুনিয়া থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু করেন ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ১০ম হিজরিতে লক্ষাধিক সাহাবি ও স্ত্রীদের নিয়ে পবিত্র হজ করতে যান। যা ছিল ঐতিহাসিক বিদায় হজ। বিদায় হজের ভাষণে তিনি একটি আদর্শ মুসলিম সমাজের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরেন। শ্রোতামণ্ডলীকে প্রাক-ইসলামী যুগের শ্রেণীবৈষম্য, নারী ও দাসদের প্রতি অন্যায়-অত্যাচার, ধনী সুদখোর মহাজনদের হাতে সাধারণ লোকের শোষণ-নির্যাতন, প্রাচীন রীতি-নীতি প্রভৃতি অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি মূল্যবান বক্তব্য তুলে ধরেন।

পবিত্র হজব্রত পালন শেষে মদিনা শরিফ রওনার পথে ১৮ জিলহজ ইসলামের ইতিহাসের আরও একটি চিরস্মরণীয় ঘটনার অবতারণা হয়। শেষবারের মতো আল্লাহর ঘর জিয়ারতের পর প্রিয় জন্মভূমি পবিত্র মক্কা ত্যাগ করে ক্লান্ত শরীর ও ব্যথাভরা হৃদয়ে মদিনা যাওয়ার সময় গাদীর-এ-খুম নামক স্থানে পৌঁছলে পবিত্র কোরআনের এ আয়াতটি নাজিল হয়, হে রাসূল! যা (যে আদেশ) আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন, আর যদি তা না করেন, তবে (যেন) তার কোনো বার্তাই পৌঁছাননি; এবং (আপনি ভয় করবেন না) আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন; এবং নিশ্চয় আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না। (সূরা মায়িদাহ, আয়াত-৬৭)।

আল্লাহর পক্ষ থেকে এ আয়াতটি নাজিল হওয়ার পর, রাসূলুল্লাহ (সা.) গাদীর-এ-খুম নামক স্থানে আল্লাহর সেই ঘোষণাটি তার উম্মতকে জানিয়ে দেয়ার জন্য সবাইকে একত্রিত হতে বললেন। জোহরের নামাজ শেষে উটের গদিগুলো দিয়ে বেদি বা মঞ্চ তৈরি করা হল। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে বললেন, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে দুটি মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি এ দুটিকে আঁকড়ে ধর তাহলে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। তার একটি হল আল্লাহর কিতাব- যা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত রজ্জু এবং অন্যটি হল আমার আহলে বাইত (আমার পরিবার)। এ দুটি কখনও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না এবং এ অবস্থায়ই হাউসে কাউসারে আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তাই লক্ষ্য রেখ তাদের সঙ্গে তোমরা কিরূপ আচরণ করবে।’ (তিরমিযি শরিফ)।

বিদায় হজ পালন করে মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেখানেই অতিবাহিত করেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) জনৈক সাহাবির জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। ফেরার পথে তাঁর ভীষণ মাথাব্যথা শুরু হয়। ক্রমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পীড়া বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসূল (সা.)-এর জ্বর ও মাথাব্যথা এত বেশি ছিল যে, মাথায় একটি রুমাল বাঁধা ছিল। আর তাঁর শরীর এত বেশি উত্তাপ ছিল যে, তাঁর দেহে হাত রাখা সম্ভব হল না।

সফর মাসের শেষ বুধবার সকাল বেলায় রাসূলুল্লাহ (সা.) আয়েশা (রা.)-কে ডেকে বললেন, আয়েশা! আমার জ্বর কমে গেছে, আমাকে গোসল করিয়ে দাও। সে মতে রাসূল (সা.) কে গোসল করানো হল। এটিই ছিল তাঁর মানবজীবনের শেষ গোসল। অতঃপর তিনি সুস্থবোধ করলেন। গোসল সেরে তিনি বিবি ফাতেমা ও নাতিদ্বয়কে ডেকে এনে সবাইকে নিয়ে সকালের নাশতা করলেন। হজরত বেলাল (রা.) এবং সুফফাবাসী সাহাবিরা এ সংবাদ মদিনার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলেন। স্রোতের মতো সাহাবিরা রাসূল (সা.) কে দেখার জন্য ভিড় জমাতে লাগল। মদিনার অলিতে-গলিতে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। ঘরে ঘরে শুরু হল সদকা, দান-খয়রাত ও শুকরিয়া জ্ঞাপন। রাসূল (সা.)-এর একটু আরামের বিনিময়ে সাহাবায়ে কেরামের জানমাল কোরবানি দেয়ার ঘটনাটি ছিল সবার জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়।

জনৈক আশেক এ অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, এই পৃথিবীতে যত খুশি, যত আনন্দ, যত সুখ, যত সম্ভোগ ও উপভোগের বিষয়বস্তু রয়েছে- এর সব একত্র করলেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপশম বোধের আনন্দের হাজার ভাগের এক ভাগও হবে না। এটা একান্তই সত্য ও প্রতিষ্ঠিত যে, ‘প্রেমাস্পদই সত্তা কেবল প্রেমিক খোলস মাত্র তার, প্রেমাস্পদই জিন্দা-জাভিদ।’ সাহাবায়ে কেরাম ফানাফির রাসূলের অতল সমুদ্রে সর্বদা অবগাহন করতেন বলেই, তাদের এমন আনন্দ-উৎফুল্ল হওয়া বিচিত্র ছিল না।

আখেরি চাহার শোম্বা এমন একটি দিন যে দিনের সকালে ছিল আনন্দ আর বিকালে ছিল বিষাদের ছায়া। রাসূল (সা.) ওই দিন সকালে সুস্থতা বোধ করে গোসল করেন আর দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে জোহরের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে আগমন করেন অতঃপর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। আখেরি চাহার শোম্বার পর নবী করিম (সা.)-এর পীড়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। পরদিন তিনি নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে নববীতে যেতে চাইলেন এবং প্রতিবারই চেতনা হারিয়ে ফেললেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, জীবনের আয়ুষ্কাল ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে। তিনি সর্বমোট ১৩ দিন রোগ-যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন অবশেষে ১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেন।

মহানবী (সা.)-এর রোগমুক্তি, শেষ গোসল এবং সুস্থদেহে মসজিদে নববীতে ইমামতি প্রভৃতি বিশেষত্বের কারণে এ দিবসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। রাসূল (সা.) কে ভালোবাসতে হলে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। মুসলিম সমাজকে ইসলামের সত্য দীক্ষা ও সুস্থ চিন্তা-চেতনায় এগিয়ে নিতে হবে। অসুস্থ চিন্তা-চেতনা এবং সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার রোগবালাই দূর করতে হবে। সত্য চিন্তা, ন্যায়-নিষ্ঠা, সহানুভূতিশীল ও সহমর্মিতাপূর্ণ মানবতাবোধের আদর্শে অনুপ্রাণিত হলে সেটাই হবে সত্যিকার মুসলিম পরিচয়।

কিন্তু বিশ্ব মুসলিমের আজ এ কী দশা? রাসূল (সা.)-এর শিক্ষা কোথায়? ইসলামের নামে যে অমানবিক কার্যক্রম চলছে, অবলীলায় নিরাপরাধ ও সাধারণ মানুষের জীবনহানি এবং বাস্তুচ্যুতি করা হচ্ছে তাতে ইসলামের কী লাভ হচ্ছে? যারা ইসলামের নামে এসব কাজ করছে তারা কতটুকু ইসলামের অনুসারী? ধিক্কার, অপদস্থতা, হীনতা, সম্মানহানি, নিগ্রহ মুসলিম সমাজকে যে অবস্থানে নিয়ে এসেছে তার জন্য কারা দায়ী? রাসূল (সা.) কি তলোয়ারের জোরেই ইসলাম প্রচার করেছিলেন নাকি প্রেম ভালোবাসা ও উত্তম আদর্শ স্থাপনের মাধ্যমে মানুষের অন্তর জয় করেছিলেন? হজরত উমর (রা.)-এর মাধ্যমেই ইসলামের ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি হয়েছিল। কিন্তু তাঁর আদর্শ কী ছিল? তিনি নিজে কিছু পথ উটের পিঠে চড়েছিলেন এবং ভৃত্যকে কিছু পথ উটে চড়িয়েছিলেন। এতে প্রমাণিত হয় তিনি মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু আজকের মুসলিম চিত্র কী? কোথায় সেই আদর্শ? বিভ্রান্তি আর অজ্ঞতার বেড়াজালে মুসলিম সমাজ নির্বোধ-অসহায় জাতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত। এ অধঃপতন ও পদস্খলন কেন?

বলা যায় মুসলিম সমাজ রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এ থেকে মুক্তির উপায় রাসূল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করা এবং আধ্যাত্মিক জীবন পরিগ্রহ করা। এখনও তো প্রতিনিয়ত বহু অমুসলিম ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করে ধন্য হচ্ছেন। কিন্তু কেন? অস্ত্রের শক্তিতে পরাস্ত হয়ে নয় বরং সুন্দর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই তারা ধর্মান্তরিত হচ্ছেন। তাই সঠিক পথ বেছে নিতে হবে, তবেই আল্লাহতায়ালার সাহায্য আসবে প্রতিক্ষণে প্রতিপলে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাসূল পাক (সা.)-এর রোগমুক্তির স্মারক আখেরি চাহার শোম্বাই হোক মুসলিম সমাজের সঠিক দীক্ষা গ্রহণের নতুন শপথ।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোঃ গোলাম ওয়ারেছ
০৪ জুন, ২০২০ ১০:০৫ অপরাহ্ণ

অনেক সুন্দর উপস্থাপন হয়েছে। আপনি মানসম্মত ও শ্রেণি উপযোগী কন্টেন্ট আপলোড করে বাতায়নকে সমৃদ্ধ করেছেন। আপনাকে অভিনন্দন। লাইক, কমেন্ট ও পূর্ণ রেটিং সাথে অসংখ্য শুভ কামনা রইল। আপনার দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করছি। সেই সাথে আমার জুন ২০২০ ইং ১ম পাক্ষিকের কন্টেন্ট 'আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স ' দেখে সুচিন্তিত মতামত, লাইক ও রেটিং প্রদানের অনুরোধ রইল।