২৮শে অক্টোবর নিবেদিতার জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

দেবপ্রসাদ মণ্ডল ২৮ অক্টোবর,২০১৯ ১৫১ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ০.০০ ()

নিবেদিতা ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিকথা

*************************


ভারতবর্ষের প্রতি নিবেদিতার ভালবাসা, তা সাধারণ দেশপ্রেমীর ঊর্ধে। ভারতের মুক্তিসাধনায় তাঁর আত্মত্যাগ অতুলনীয়।  স্বামী বিবেকানন্দের কাছে যে আত্মনুসন্ধানের মন্ত্রে তাঁর দীক্ষা, তার সাধনার পীঠস্থান ভারতবর্ষ। তাঁর স্বদেশসেবা এই আধ্যাত্মিক সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সে সাধনায় জগন্মাতার সঙ্গে ভারতমাতা এক হয়ে গেছেন। এই ছিল নিবেদিতার জীবনাদর্শ।


বিপ্লবী বলে নিবেদিতাকে বড় করার চেষ্টা করলে তাঁকে ছোট করা হয়। তিনি কি ছিলেন, নবযুগের উদবোধনে তাঁর দান কতখানি তা নির্ণয় করা কঠিন। ভারতের স্বাধীনতা  সংগ্রাম ও জাতীয় আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, যা একে অন্যের সম্পুরক, নিবেদিতার ভূমিকা সন্ধানে, সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নিবেদিতা ও স্বামীজীর পত্রাবলি।  ঐ যুগের ইতিহাস রচনায় যার মূল্য অপরিসীম।  সেইসব চিঠিতে কখনো তিনি উপদেষ্টা, কখনো তিনি স্নেহবৎসলা মাতা ও বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা, কখনো বা শত্রুপক্ষের কাছে আপসহীন রণচণ্ডীরূপে প্রকাশিতা। 


একাধারে স্নেহময়ী জননী আবার অন্যাধারে 'শিখাময়ী' চরিত্র ও শক্তির অভিব্যক্তি তিনি। কিভাবে বাংলার বিপ্লবগুরু অরবিন্দ ঘোষকে নিজের জীবন বিপন্ন করে আশ্রয় দিয়েছেন ও রক্ষা করেছেন অবধারিত ফাঁসি বা যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর থেকে। কিভাবে চরম ও নরমপন্থীদের দ্বন্দ্বের সময় মধ্যপন্থী কংগ্রেস নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলেসমেত সবাইকে সমঝোতায় আনতে চেষ্টা করেছেন।  একদিকে লর্ড কার্জনকে ফুঁসে উঠে বলেছেন --- 'একদল ডাকাত ভারত আক্রমণ করে ভারতভূমি ধ্বংস করতে এসেছে...  ডাকাতেরা আবার কী শেখাতে পারে'? অপরদিকে দেশবাসীগণকে উদ্দেশ্য করে আপসহীন রণহুঙ্কার ---- 'কবে এক হাতে গীতা আরেক হাতে তরবারি নিয়ে মাতৃভূমি জাগবে'? 


বিপ্লবী ও বাগ্মী বিপিনচন্দ্র পাল নিবেদিতার কথাকে মনে করতেন ডাইনামাইটস...  বিস্ফোরক!  নিবেদিতার চিঠি পড়ে মনে হয় সত্যিই তো 'বিস্ফোরক'!  আশঙ্কিত ইংরেজ সরকার নিবেদিতার চিঠি সেন্সর করা শুরু করলে অপ্রতিহত নিবেদিতা 'Nealous' ছদ্মনামে তাঁর রাজনৈতিক মতমত প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁর আইরিশ ধমনিতে প্রবাহিত বিপ্লবের রক্ত। আইরিশ বিপ্লবী সিনফিনদের টেকনিক রপ্ত করেছিলেন এবং রাশিয়ার বিপ্লবী নেতা প্রিন্স ক্রপ্টকিনের ভাবে অনুপ্রাণিতা নিবেদিতা বোমা তৈরি পর্যন্ত শিখেছিলেন। কিছু চিঠিতে জন্মযোদ্ধা নিবেদিতার এই অসুরদলিনী রণরঙ্গিণী মূর্তিই প্রকটিত।


'মডার্ন রিভিউ'-এর সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় উদবোধন পত্রিকায় (১৩৩৫) নিবেদিতার স্মৃতিচারণে লিখেছেন : 'তিনি ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রয়াসী ছিলেন। তিনি সকল অবস্থাতেই অহিংসার পক্ষপাতী ছিলেন না।  প্রয়োজন বিশেষে স্থান-বিশেষে বলপ্রয়োগ ও যুদ্ধ তিনি আবশ্যক মনে করতেন'। নিবেদিতা রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা করতেন কারণ তিনি স্বদেশসেবাকেই জীবনের আদর্শরূপে গ্রহণ করেছিলেন। 


ছাত্র সম্প্রদায়ের ওপর নিবেদিতার প্রভাব ছিল সর্বাধিক।  তিনি যখন তাদের কাছে গীতা ব্যাখ্যা করতেন অথবা স্বামী বিবেকানন্দের বাণী প্রচার করতেন, তখন তাঁর মধ্যে দিয়েই তারা ভারতবর্ষের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করত, পরাধীন দুর্বল জাতির অসহায় বেদনা তাদের মর্মবিদ্ধ করত, বীরত্ব ও পৌরষে তাদের অন্তর ভরে উঠত। সিস্টার নিবেদিতার বক্তৃতা, তাঁর সংস্কৃতি-বিশ্লেষণের নৈপুণ্য, ইংরেজী রচনার কৌশল বহু ছাত্রকে আকৃষ্ট করে জীবনযাত্রায় উচ্চ প্রেরণা দিয়েছে। বিপ্লবীরা তাঁর 'Kali the Mother' পাঠে উদ্দীপিত হতেন। ভারতমাতার মূর্তি হৃদয়সিংহাসনে বসিয়ে সমবেত কণ্ঠ মিলিয়ে উচ্চারণ করতে শিখিয়েছিলেন ---- "বন্দে মাতরম"।

নিবেদিতা বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস থেকে মাতৃমন্ত্র তুলে এনে তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিবেদিতার প্রিয় চিহ্ণ 'বজ্র'সহ রাষ্ট্রীয় পতাকার প্রথম কল্পনা তিনিই করেন। দেহত্যাগের আগে তাঁর বড়ই সাধ ছিল, স্বাধীনতার প্রথম দিনটিতে তিনিই বইবেন স্বাধীন ভারতের পতাকা। নিবেদিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাণী: " ভারতবর্ষ এক, অখন্ড এবং অবিনশ্বর"।


নিবেদিতার এই আত্মনিবেদনকে, স্বামীজি ঈশ্বরের কাছে প্রাণভরে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। স্বামীজির জাতীয় জাগরণ ও স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্নকে, মিশন ত্যাগ করার পর... সার্থক করার সঙ্কল্প করেন স্বামীজির উত্তরকান্ডারী নিবেদিতা, সময়াভাবে যুদ্ধস্তরীয় তৎপরতায়। তাই উনবিংশ শতাব্দীর জাতীয় জাগরণের বহমান ধারাকে বিংশ শতাব্দীর বৈপ্লবিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে, পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ারে পরিণত করার জন্য, ভারতের ইতিহাস চিরদিন এই ত্যাগী ওজস্বিনী সাধিকাকে স্মরণ করবে।


 এই লেখকের  'সেবিকা-বান্ধবী- মাতা ---  প্রণমি হে নিবেদিতা' গ্রন্থটি থেকে গৃহিত। গ্রন্থটি বর্তমানে প্রকাশনায়।

মতামত দিন