রোহিঙ্গা শরনার্থী সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

এমদাদুল হক মিলন ২২ নভেম্বর,২০১৯ ২১১ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

 বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করে। কোন জাতি বা গোষ্ঠির কারনে আমাদের স্বাধীনতায় আঘাত আসুক এটা কোন বাংলাদেশীর প্রত্যাশা নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের মানুষ যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তা শুধু বিভিন্ন দেশ নয় জাতিসংঘ পর্যন্ত প্রসংশিত হয়েছে। একজন বাংলাদেশী হিসাবে আমিও এ মহৎ কাজের অংশীদার। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারত আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেই কঠিন সময়ের কথা আমরা আজও ভুলিনি এবং ভুলতে পারবোও না। সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ায় বাংলাদেশে ঝড়ের গতিতে তাদের আগমন ঘটছে। এতে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক ভাবে আলোচিত হচ্ছে। তবে রোহিঙ্গা ইস্য্ ুনিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সমস্যা অনেক দিনের। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে বহু দিন আগ থেকেই। উল্লেখ্য যে বর্তমানে বিভিন্ন সূত্রমতে রোহিঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠি। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের অধীবাসী। ইতিহাসের তথ্য মতে জানা যায় খ্রিষ্টীয় ৮ম শতাব্দী হতে বর্তমান রোহিঙ্গাদের পূর্ব পুরুষদের বসবাস রাখাইন প্রদেশে (আরাকান)। এক সময় থেকে বার্মার আরাকান দখলের পুর্ব পর্যন্ত রোহিঙ্গা মুসলমানরা তাদের প্রতিবেশী রাখাইন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিপুর্ণ অবস্থান করে আসছিল। কিন্তু বার্মা রাজা বোধপায়া কর্তৃক ১৭৮৪ সালে স্বাধীন আরাকান রাজ্যটি দখল করে নেয়ার পরই অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি দখলদার বার্মা রাজাদের নিপীড়ন, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের ফলে উনিশ শতকের শুরুতে অসংখ্য রোহিঙ্গা আরাকান ছেড়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। পরে শুধু রোহিঙ্গা নিপীড়ন বৃদ্ধি নয় তাদের সংখ্যালুঘু হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি থেকেও বঞ্চিত করা হয়। এর পর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন অপারেশনের নামে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা নিধনে কাজ করে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ভয়াবহতা আমরা নিজের চোখে অবলোকন করছি। পৃথিবীর কোন দেশ বা জাতির জন্য এরূপ ঘটনা প্রত্যাশিত নয়। আজ তারা গৃহহীন,ভুমিহীন,অন্যদেশে পরবাস; বিষয়টা তাদেরও কাম্য নয় । আমরা নাফ নদীতে রোহিঙ্গাদের মরা লাশ ভেসে যেতে দেখেছি, আমরা দেখেছি কী করে কিশোরের স্বপ্ন ভঙ্গ হয় । আজ তাদের স্বপ্ন নেই বড় হওয়ার। আজ তাদের বড় স্বপ্ন নিজ দেশে নিজের পরিচয়ে নগরিক হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া। কিন্তু মায়ানমার সরকার কী এই বিষয়ে আন্তরিক? শান্তিতে নোবেল জয় করেও নিজ দেশে শান্তি রক্ষায় সে কি পেরেছে কোন ভূমিকা রাখতে ? শান্তিতে নোবেল বিজয় রাষ্ট্রনায়কের দেশে যদি মানবাধিকার লঙ্গন হয় তা হলে এদের আশ্রয় কোথায় ? সম্মাান অর্জন করা খুব কটিন কাজ, তা আমরা জানি। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য অং সাং সূচি গনতন্ত্রের নেত্রী নামে পরিচিত কিন্তু বিভিন্ন দেশ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেয়া সম্মান সূচক ডিগ্রী প্রত্যাহার করা কি উনার কাছে অসম্মানের নয়? এমন কি এখন মানুষ সূচির নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের জন্য দাবি তুলছে। এটা কারো প্রত্যাশিত ছিল না। আমার কথা হল- মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ মানবিক বিবেচনায় সর্বদা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। তার সাথে যুক্ত হচ্ছে আর্ন্তজাতিক সাহায্য তারপরও মায়ানমার সরকারকে বুঝতে হবে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে প্রায় দশ লক্ষ শরণার্থীর চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তাই এই জাতীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করাতে জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। এই সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান হবে না, যদি না রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। শত শত বছর আরাকানে বসবাস করে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব লাভ তাদের অধিকার। পৃথিবীর সব মানুষের একটি দেশ পাওয়ার জন্মগত অধিকার আছে। এই অধিকার আদায় না হওয়ার পর্যন্ত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। ২০১৬ সালের জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে যে রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশন গঠন করা হয়েছিল এতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি জোর দিয়েই বলা হয়েছে। এ সংকট নিরসনে কফি আনান কমিশন আর ও যে সব সুপারিশ করে দ্রæত তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এই জন্য জাতিসংঘ, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, আসিয়ান এবং ও আইসির মতো আর্ন্তজাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা এবং বিশ্বরাজনীতির প্রভাবশালী দেশগুলোকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র ভারত আমাদের আরও সহযোগিতা করবে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলতে হবে রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রæত এবং টেকসই সমাধান নিশ্চিত না করা গেলে তারা চরমপন্থার দিকে ধাবিত হতে পারে। আর সেটা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তার হুমকি হতে পারে। এ ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাপ তৈরী করতে হবে। তবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা পালন অনেকটাই বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে। এ ব্যাপারে আভ্যন্তরীণ জাতীয় ঐক্য গঠন ও গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, আর এই বিষয়ে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার এর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আমার মনে হয় বিষয়টি জাতিসংঘের মাধ্যমে সমন্বয় করলে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যপারে এক ধরনের চাপে থাকবে, অন্যতায় মিয়ানমার যে কোন সময় চুক্তি বাস্তবায়নে অস্বীকার করতে পারে। এই সমস্যা সমাধান করা না গেলে আমাদের দীর্ঘ মেয়াদী রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। সরকার ও দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এ সত্য উপলব্ধি করে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখবেন এটাই ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা। লেখক: সহকারি শিক্ষক ইংরেজী, সোনাপুর মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, দোয়ারাবাজার ও ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কো-অর্ডিনেটর, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোঃ হাফিজুল ইসলাম
২৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ

আপনাকে ধন্যবাদ , আমার কন্টেন্ট দেখে লাইক, রেটিংসহ মতামতের জন্য বিনীত অনুরোধ রইল । আমার শিক্ষক বাতায়ন আইডি- hafizb2013/hafiznt19@gmail.com আমার প্রোফাইল লিংকঃ- https://www.teachers.gov.bd/user-profile কন্টেন্ট লিংক- https://www.teachers.gov.bd/content/details/505914 1. কান্ড কি তা বলতে পারবে । 2. কান্ডের বিভিন্ন ধরনের রূপান্তর বলতে পারবে । 3. ভূ-নিম্নস্থ রূপান্তরিত কান্ড সমূহের বর্ণনা করতে পারবে ।


এমদাদুল হক মিলন
২৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০৭:৪২ অপরাহ্ণ

Thanks sir..