মুজিববর্ষ ও আমাদের প্রত্যাশা- মো: আমিনুল ইসলাম,সহকারী শিক্ষক, হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়

মো. আমিনুল ইসলাম ০৫ জানুয়ারি,২০২০ ৮ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ০.০০ ()

মো: আমিনুল ইসলাম :

সময়ের প্রবহমান ধারায় আমরা নতুন বছরে পদার্পণ করেছি। বছর শেষ হবে আবার নতুন বছর আসবে, এটাই নিয়ম। এর মাঝে থেকে যাবে কিছু ভুল এবং কিছু শুদ্ধতার হিসেব-নিকাশ। নতুন বছর মানে শুধু সবকিছুকে নতুন করে বরণ করে নেওয়া নয়। অতীতের ভুলক্রটিগুলো শুধরে নতুন করে শুরু করাও নতুন বছরের অঙ্গীকার হতে পারে। প্রতিটি বছরে আমাদের দেশ অর্জন করছে নতুন নতুন সাফল্য। সাফল্যের খাতা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। আমরা এগিয়ে চলেছি সামনের দিকে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো, ‘জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’  আমরা মাথা নোয়াই নি কারো কাছে। বাংলাদেশ কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায় না। যত বাধাবিপত্তি আসুক, আমরা এগিয়ে যাবই। প্রত্যেকটি নাগরিকের উচিৎ দেশকে ভালোবাসা আর দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসাই আমাদের এক দিন চূড়ান্ত অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে। ২০২০ সাল আমাদের জন্য অন্য বছর থেকে আলাদা। কারণ এই বছরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। ২০২০-২১ সালকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আমাদের বাঙালি জাতির জন্য এ দু’টি বছর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সারা দেশে মুজিববর্ষ পালিত হবে। ফেলে আসা বছরের রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সমাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। কিন্তু শুধু সাফল্য নয়, এর মাঝে কিছু দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। যার অধিকাংশই সামাজিক অবক্ষয়জনিত। এসব স্মৃতি আমরা ভুলে যেতে চাই।  এসব ঘটনা যেন আর কোনো দিন আমাদের স্পর্শ করতে না পারে; সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আমাদের কোনো সন্তান সন্ত্রাসী হবে না। তারা মানুষ হবে। আমাদের এ ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কেবল জিপিএ ফাইভ সংকবলিত সনদ নিয়েই বের হবে না, তারা বেরিয়ে আসবে দেশ গড়ার ব্রত নিয়ে। তাদের এই ব্রতই একদিন আমাদের  দেশকে বিশ^দরবারে সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। মুজিবর্ষে আমাদের শিক্ষার্থীদের কাছে, শিক্ষকদের কাছে, সমাজপতি, রাজনীতিবিদসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা।

                  দুই

দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে। আমরা এখন অর্থনীতিতে সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছি। আমাদের এখন উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এটা আমাদের জন্য সত্যিই আনন্দের বিষয়। ক্রমোন্নতির এধারায় বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশ অবশ্যই উন্নত দেশে পরিণত হবে। একসময় তলাবিহীন এই ঝুড়ির তলা আজ মজবুত। দেশের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।  বেড়েছে আমাদের গড় আয়ু। প্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ উন্নতির সবকটি ক্ষেত্রেই আমরা এগিয়ে চলেছি। তবে এই এগিয়ে চলা কেবল আর্থিক মাপকাঠিতে হলেই হবে না। আমাদের পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা আজ ভাবতে বাধ্য করছে যে, আজ আমরা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি কি না। উন্নত দেশের বাসিন্দাদের মনমানসিকতাও উন্নত হতে হবে। সামাজিক ঘটনাগুলো আমাদের এই সাফল্যকে মøান করে দিচ্ছে। সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে সামাজিক আস্থাহীনতা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ধর্ষণ, খুন, হিংসা, লোভ, দুর্নীতি, বেকারত্ব, মাদকাসক্তের সংখ্যা, অবসন্নে ভোগা মানুষের সংখ্যা। মানুষে মানুষে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের দূরত্ব। আর এই দূরত্বের ফলে সমাজে বাড়ছে অপরাধের সংখ্যা। বিশ্বাস শব্দটিই আজ মানুষের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা আজ একজন আরেকজনকে চূড়ান্ত অবিশ্বাস করি। এমনকি এই অবস্থা পরিবারের ভেতরেও। অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনের মুক্তিও আবশ্যক। আমরা শ্রেণিহীন সমাজ চাই, আমরা বৈষম্যহীন সমাজ প্রত্যাশা করি।

তিন

আমরা আশা করি, এ দেশ সন্ত্রাসীদের নয়, এ দেশ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের। এ দেশ সবার। এ দেশের মানুষ ক্রিকেটার মুস্তাফিজ, মাশরাফি, সৌম্যদের নিয়ে গর্ব করতে ভালোবাসে। পতাকা তুলে সারা মাঠ ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। বিশ্বকে জানিয়ে দিতে ভালোবাসি আমরা দেশটাকে ভালোবাসি। মিলেনিয়াম  ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনের পর এখন আমরা এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জনের পথে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এক দিন আমরা সেই অর্জন অবশ্যই করব। আমরা সে শর্তগুলো পূরণ করছি। শিগগিরই আমরা শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশের প্রত্যাশা করতে পারি। আমাদের দেশে চাকরির নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। তথ্যপ্রযুক্তিতে আমাদের দেশ এগিয়ে চলেছে। দেশের চলমান বেকার সমস্যার সমাধান হবে তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরেই। ইতোমধ্যেই দেশে বহু ফ্রিল্যান্সার তৈরি হয়েছে; যারা ঘরে বসেই তাদের চাকরির কাজটি কর চলেছে। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ আজ এক মডেলের নাম। অবকাঠামোগত উন্নয়নেও আমরা এগিয়ে চলেছি। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কয়েক কিলোমিটার আজ দৃশ্যমান। সড়ক যোগাযোগ, রেল যোগাযোগে উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে চলেছি। কিছু কিছু ঘটনা সাময়িক সমালোচনার জন্ম দিলেও তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে সে ঘটনা সেখানেই থেমে যাচ্ছে। অনেক চাওয়া পাওয়ার নতুন নতুন হিসাব নিয়ে নতুন একটি বছর শুরু হচ্ছে। এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। আমরা এগিয়ে যাবই দুর্বার গতিতে। আমদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে, বিদুৎ উৎপাদন বেড়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। আমাদের শোষণ-নির্যাতন করা পাকিস্থান পর্যন্ত আমাদের সফলতাকে আজ উদাহরণ টানে। এটাই বাংলাদেশ আর আমরা সেই এগিয়ে যাওয়া দেশটার মানুষ। আমরা গর্বিত। আমরা বাংলাদেশের মানুষ সারা পৃথিবিীকে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমরা সবাইকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে চাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা কোনো পুরস্কার দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। বরং বাঙালি জাতির অন্তরে তিনি যে আসন করে নিয়েছেন, তাই সর্বোচ্চ। কোনো পুরস্কারের জন্য যথেষ্ট নয়। দেশের মানুষের অন্তরে তার অবস্থান। মুজিববর্ষে নতুন প্রজন্ম তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ গঠনে এগিয়ে আসুক।

 চার

বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সব ধর্মের মানুষ এখানে একে অন্যের পাশাপাশি চলতে পছন্দ করে। এভাবেই এ দেশ এগিয়ে চলবে দুর্বারগতিতে। কোনো অপশক্তি তা রুখতে পারবে না। আগেও দেশের শান্তি বিনষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তা সফল হয়নি। এ দেশের মানুষ তা হতে দেবে না। আমরা বাংলাদেশের মানুষ সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমরা সবাইকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে চাই। এখানে অশান্তি, বিভেদ ও অসৌজন্যতার কোনো ঠাঁই নেই। ১৯৭১ সালে আমাদের দেশের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছে। পরাজয়ের মানসিকতা এ দেশের মানুষের মনে ঠাঁই হয় না। এ দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন দিয়ে গড়া। এ দেশের উন্নয়নের গতি রোধ করার মতো কোনো শক্তি নেই।


লেখক : আমিনুল ইসলাম 



 

মতামত দিন