আধুনিক বাংলা কবিতার স্রষ্টা শামসুর রাহমানের প্রয়াণ দিবস আগস্ট ১৭, ২০২০।

আবু হোসাইন মোঃ আসাদুল ইসলাম ১৭ আগস্ট,২০২০ ৪৭ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

আধুনিক বাংলা কবিতার স্রষ্টা শামসুর রাহমানের প্রয়াণ দিবস আজ


জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতাকে আধুনিকতার পথে ধাবিত করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শামসুর রাহমান। ষাটের দশকের শুরুর দিকেই তাঁর কবি প্রতিভার বিচ্ছুরণে আলোকিত হতে থাকে সাহিত্যের ভুবন। ‘উনিশ শ’ ঊনপঞ্চাশ’ রচনার মাধ্যমে ১৯৪৮ সালে পদচিহ্ন আঁকেন কবিতার আঙ্গিনায়। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। কবির নিমগ্ন অন্তর্গতবোধ ও ভাবনার জগতের অপূর্ব রূপায়ণ ছিল এ কাব্যগ্রন্থে।
শামসুর রাহমান সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে চিরকালীনতার অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন তার কাব্য ভাবনায়। সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যেমন কবিতার ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উজ্জীবিত মানুষকে যুগিয়েছেন প্রেরণা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তার দুটি কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ একই সঙ্গে পাঠক ও বোদ্ধাদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ও সমাদৃত। স্বাধীনতার পর পর প্রকাশ পায় তার সাড়া জাগানো কাব্য ‘বন্দী শিবির থেকে’। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আরও আন্তত ষাটটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিক হয়েছে।
অনন্য মাত্রা যুক্ত করে গেছেন দেশাত্মবোধক কবিতায়। ন্যায়, যুক্তি ও প্রগতির পক্ষের সাহসী যোদ্ধা শামসুর রাহমান তৎকালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ১৯৫৮ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় লেখেন ‘হাতির শুঁড়’ নামক কবিতা। সত্তরের নভেম্বরে ভয়াল জলোচ্ছ্বাসের পর মওলানা ভাসানীর পল্টনের ঐতিহাসিক জনসভার পটভূমিতে রচিত ‘সফেদ পাঞ্জাবি’, তারও আগে ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘গেরিলা’, ‘কাক’ ইত্যাদি কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে এ দেশের কোটি মানুষের কণ্ঠধ্বনি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে জীবন বিসর্জন দেওয়া আসাদকে নিয়ে লিখেছেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাগারে তখন তাকে উদ্দেশ করে লেখেন কবিতা ‘টেলেমেকাস’। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লিখেছেন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ ও ‘ইকারুসের আকাশ’। যুদ্ধাপরাধীদের উত্থানে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়ে লিখেছেন ‘একটি মোনাজাতের খসড়া’, ‘ফুঁসে ওঠা ফতোয়া’র মতো আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতা। গণতন্ত্রের জন্য লড়াকু সৈনিক শহীদ নূর হোসেনকে উৎসর্গ করে রচনা করেছেন ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’।
কবিতার জমিনে তিনি পরিস্ফুটিত করেছেন চিরকালীন বেদনা, প্রেম, মৃত্যু, ভালোবাসাসহ নানা বিষয়ের শৈল্পিক ব্যঞ্জনা। নগর জীবনের প্রতি ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে তার কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে গদ্যগ্রন্থ ‘স্মৃতির শহর’। ১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেন। শামসুর রাহমান তখন সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তান’ এ কর্মরত ছিলেন। পেশাগত অনিশ্চয়তার তোয়াক্কা না করে রবীন্দ্র সঙ্গীতের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ‘দৈনিক পাকিস্তান’ এর হাসান হাফিজুর রহমান, আহমেদ হুমায়ুন, ফজল শাহাবুদ্দীন ও শামসুর রাহমান। ১৯৭০ সালের ২৮ নভেম্বর ঘূর্ণিদুর্গত দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ও মৃত্যুতে কাতর কবি লেখেন ‘আসুন আমরা আজ ও একজন জেলে’ নামক কবিতা।
১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর বুধবার সকালে ঢাকা শহরের মাহুতটুলির নানার কোঠাবাড়িতে শামসুর রাহমানের জন্ম। ১৯৩৬ সালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ পোগজ স্কুলে। ১৯৪৭ সালে আই.এ. পাশ করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। স্নাতক সম্মান পড়া শেষ বছর পর্যন্ত চালিয়ে গেলেও পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। ১৯৫৩ সালে পাস কোর্সে স্নাতক পাশ করেন। ১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই জোহরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ সন্তান (তিন কন্যা ও দুই পুত্র)। তারা হলেন যথাক্রমে সুমায়রা রাহমান, ফাইয়াজুর রাহমান, ফৌজিয়া রাহমান, ওয়াহিদুর রাহমান মতিন এবং সেবা রাহমান।
শামসুর রাহমান সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্নিং নিউজে। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর তিনি অধুনা নামের একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প-সাহিত্যে অবদানস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯), একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পদকসহ (১৯৯১) দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন। রবীন্দ্র ভারতী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য তিনি আমৃত্যু লিখেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতার অমর ¯্রষ্টা, কবিতার বরপুত্র শামসুর রাহমান বেঁচেছিলেন ৭৭ বছর। ২০০৬ সালের আজকের এই দিনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পরও তার সৃষ্টি অবিরল ঝর্ণাধারার মতো আমাদের দেয় আলোর দিশা। মৃত্যুর পর কবির ইচ্ছানুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। তিনি তাঁর কবিতা ও অন্যান্য লেখার মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবেন সবসময়। তাঁর স্মৃতির প্রতি রইলো বিন¤্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোসাঃ রাফিয়া খাতুন
১৮ আগস্ট, ২০২০ ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ

অনেক সুন্দর আপনার কনটেন্ট লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ শুভকামনা রইল |শিক্ষক বাতায়নে কন্টেন্ট আপলোড করে শিক্ষক বাতায়ন কে সমৃদ্ধ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ |ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন আর দয়া করে আমার বাতান বাড়ি ঘুরে এসে আপনার সুচিন্তিত মতামত প্রদান করুন আবারো ধন্যবাদ |


মোঃ রওশন জামিল
১৭ আগস্ট, ২০২০ ০২:১৫ অপরাহ্ণ

পূর্ণরেটিং সহ শুভ কামনা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, সুস্থ্য থাকুন, ভাল থাকুন।।