### ননক্যাডার গরীব! ### ২০০৮ কি ৯ সালের কথা। ইন্টার ১ম বর্ষের ৭-৮ জনের ছেলেদের একটি ব্যাচ পড়তে আসে আমার কাছে।

শিমুল সুলতানা হেপি ৩০ নভেম্বর,২০২১ ৮৬ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

### ননক্যাডার গরীব! ### ২০০৮ কি ৯ সালের কথা। ইন্টার ১ম বর্ষের ৭-৮ জনের ছেলেদের একটি ব্যাচ পড়তে আসে আমার কাছে। আমি তখন ব্যাচে জনপ্রতি ১০০০/-টাকা নিতাম। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরে, লাঞ্চ না করেই পড়াতে বসলাম। ওরাও কলেজ থেকে সরাসরি আমার বাসায় এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয়, ওরাও ক্ষুধার্ত। কোনরকমে পড়া শেষ করে, ভেতরে চলে এসে, খেতে বসে গেলাম। একটু বিশ্রাম নিব, হঠাৎ দেখি প্রধান দরজা খোলা। চিৎকার করে বাসার মেয়টিকে বললাম, ” সোমা! ” সোমা জবাব দিল, ” একটি ছেলে এখনো যায়নি ভাইয়া! ” গেলাম দেখতে, কে এখনো বসে আছে! আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো। ছেলেটি বললো, স্যার! একটি কথাছিল। - বলো। -এই ব্যাচটি আমিই যোগাড় করেছি। - তো, কি হয়েছে? - আমি টাকা দিতে পারবো না। -কিন্তু কেন? -আমার সামর্থ্য নেই, আমি গরীব। সোজাসাপটা জবাব দিল ছেলেটি। আমি গরীব কথাটি শুনেই, থতমত খেয়ে গেলাম। বললাম, লাঞ্চ করবে না? -না, সামর্থ্য নেই, তাই করি না। আমি দু’আহারী। আমি ছেলেটিকে ডাইনিং এ এনে খেতে দিয়ে পাশে বসে বললাম, এবার বলো, তুমি কতোটা গরীব। সে বলতে শুরু করলো, আমার মা, আমার তিন মামার একমাত্র বোন। নানা-নানী বেঁচে ছিলেন না। মা মোটামুটি সুন্দরী ছিলেন। কৃষক পরিবার হলেও মামারা স্বচ্ছল। মাকে বিয়ে দিলেন আরেক স্বচ্ছল গেরস্ত পরিবারের মেঝ ছেলের সঙ্গে। বাবা মাঠে কাজ করেন, আর মা বাড়িতে। আমার বয়স যখন দেড় বছর, মা পুনরায় অন্তসত্বা। এক রাত্রিতে প্রচন্ড বুক ব্যথা হয়ে বাবা মারা গেলেন। মামারা আমাকে রেখে মাকে নিয়ে গিয়ে, গর্ভের সন্তান নষ্ট করে, আবার বিয়ে দিবেন। মা, কিছুতেই যাবেন না। দাদা জীবীত থাকায়, আমরা নাশরীক। ( নাশরীক আইনটি অপ্রচলিত, হয়তো তারা জানতো না বা লড়াই করতে পারেনি।) চাচারা কিছুতেই আমাদের রাখবেন না। শুরু হলো মানসিক অত্যাচার। খাবার পর্যন্ত দেন না। নিরুপায় মা, এ বাড়ি ও বাড়িতে কাজ শুরু করেন। ধান ভানা, ঘর লেপা, রাস্তায় কোদালে মাটি কাটা, কি-না করেছেন! মায়ের কাজ পরিবারের মানহানি ঘটায়। দিলেন বাড়ি থেকে বের করে। মা, গ্রামের শেষ সীমায় দীঘির পাড়ে, ঝোপের ধারে এক শিমুল গাছের নিচে আশ্রয় নেন। গাছের ডালপালা কেটে, তালপাতার ছাউনি দিয়ে কোনোরকমে একটি চালা তোলেন। ঠিক ঘর বলা যাবে না, ছোটরা যেমন খেলাঘর বানায়। শেয়ালের ভয়ে, সারারাত অন্ধকারে আমাকে জড়িয়ে ধরে জেগে থাকেন, আর দিনের বেলা কাজে যান। সাথে আমাকে নিয়ে যান বলে, অনেকেই মাকে কাজে নিতে চান না। একসময় মায়ের শরীর ভারী হয়ে গেলে, আর নিজেই কাজে যেতে পারেন না। অবশেষে লোকালয়ের বাহিরে, ঝোপঝাড়ে মায়ের গর্ভের সন্তানটি পৃথিবীরতে আসে, আরেকটি মুখ নিয়ে। কোন হাসপাতালের নরম বিছানা নয়, নয় কোন ডাক্তার, নার্স, কবিরাজ এমনকি একটি গ্রাম্য দাইও। পরদিনই অসুস্থ, ভুখা মা, আমাদের আহার যোগাড় করতে কাজে নামেন। এবার শুরু হলো গ্রাম্য বদ লোকেদের উৎপাৎ। কাজের বাড়িতে বেটারা কুদৃষ্টিতে তাকায়। আরেঠারে কথা বলে, ইশারা ইঙ্গিত করে। পথ আটকায়, রাতবিরাতে ডেরার দরজা ধাক্কায়, চালে ঢিল ছোড়ে। মা বটি নিয়ে, সারারাত জেগে বসে থাকেন। আমি একটু বড় হলে, মা আমাকে একটি এতিমখানায় দিয়ে দেন, কিন্তু আমার ভাইটিকে রাখার কেউ না থাকায়, আমাকে আবার ফিরে আসতে হয়। একদিন ঘুরতে ঘুরতে গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে চলে আসি, গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পড়তে নয়, এমনিতেই ওদের সঙ্গে ক্লাসে বসে আছি। হেড স্যার ক্লাস নিচ্ছিলেন। তিনি একটি ভাগ অঙ্ক কষতে দিলেন। কেউই অঙ্কটি সঠিকভাবে করতে পারেনি। আমি তো লিখতে পারি না, তাই মুখে মুখে হিসেব করে উত্তর দিয়ে দিলাম। স্যার আমাকে বললেন, তুমি খাতায় লিখনি কেন? - স্যার, আমি লিখতে পারি না। আর আমার বই, খাতা-কলমও নেই। স্যার অবাক হয়ে বললেন, তোমাকে কোনোদিন দেখিনি। তুমি স্কুলে আস না কেন? -আমার মায় জানে। -ছুটির পর থেকো, তোমার সাথে তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাবো। -স্যার মাকে তো সন্ধ্যার আগে পাইবেন না। -কেন? আমি স্যারকে, ছোট মানুষ যতটুকু জানি, সব খুলে বললাম। ঐদিন সন্ধ্যায় স্যার আমাদের ডেরায় এসে, মায়ের সাথে কথা বললেন। পরদিন থেকে ভাইটিকে কোলে নিয়ে স্কুলে যেতে শুরু করলাম। স্যারই আমার বই-পুস্তক, খাতা পেন্সিলের ব্যবস্থা করে দেন। তিন বছরের মাথায় পঞ্চম পাশ দিলাম। স্যার উনার পরিচিত একটি হাই স্কুলে বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা করে দেন। বৃত্তি পেলাম টেলেন্টপুলে। বেতন দেয়ার আর দরকারও পড়লো না। বৃত্তির টাকায় বই, খাতা, কলম কেনা হয়ে যেত। প্রাইমারীর হেডস্যার নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতেন। হাই স্কুলের হেডস্যারও আমার খেয়াল রাখতেন। অষ্টমে এসে আবারো বৃত্তি পেলাম, ঐ টেলেন্টপুলেই। আমার পড়া চললেও ছোট ভাইটির পড়া হলো না। একটু বড় হতেই সেও মায়ের সাথে কাজে নামে। মা গেরস্ত বাড়িতে, আর ভাই ক্ষেত খামারে মুনি মজুরের। নাইনে উঠে সাইন্স নিলাম। পড়ার সুবিধার্থে ও মা ভাইয়ের কেরোসিন আর খাবার খরচা বাঁচাতে স্কুলের কাছাকাছি হেডস্যারের সহযোগিতায় একটি লজিং ঠিক করি। বিনি পয়সায় থাকা খাওয়া, বিনিময়ে ঐ বাড়ির দু’টি বাচ্চাকে পড়াতে হতো। এসএসসিতে গোল্ডেন জিপি ফাইভ পাই। হাই স্কুলের হেডস্যার নিজে আমাকে ঢাকায় নিয়ে এসে কলেজে ভর্তি করে দিয়ে যান। স্যার আমাকে সাইন্স নিতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি জানি, বিজ্ঞান পড়ায় অনেক খরচ। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আমাকে দিয়ে হবে না। ওসব ধনীদের জন্য থাক। আর্টস নিয়েছি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়, এই আশায়। এজন্যই ইংরেজিটাতে জোর দিচ্ছি। আমার মা এখন অসুস্থ, আগের মতো কাজ করতে পারেন না। আমরা চিকিৎসাও করাতে পারছি না। এতটুকু শুনতে আমি আনমনা হয়ে যাই। আমার মনে পড়ে যায়, আমার শৈশবের কথা। আমার মাও স্বামী মারা যাবার পর, আমাদের অনেকগুলো ভাই-বোন নিয়ে অনেক কষ্ট করেছিলেন। এতোদিন ভাবতাম, আমার কষ্ট বুঝি অস্কার বিজয়ী, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কষ্ট। না, ওর কষ্টের কাছে, আমার কষ্ট এ মাইনাস(A-)। কথা বলছিল, কিন্তু সে কাঁদছিল না। কী জানি, কোন ধাতুতে গড়া! হয়তোবা জীবনে এতো বেশি কেঁদেছে যে, চোখের জল শুকিয়ে গেছে অথবা, আবেগ মরে গেছে অথবা, লড়াই করতে শিখে গেছে। আমার চোখের কোল ভিজে জামাও যে কখন ভিজে গেছে টের পাইনি। খাওয়া শেষ হলে বললাম, তোমার টাকা কখনোই দেয়া লাগবে না। তোমাকে

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোঃ মনিরুজ্জামান মিয়া
০৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা রইলো। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। আমার কনটেন্ট লিঙ্কঃ http://www.teachers.gov.bd/ content/details/1186282


মোঃ মুজিবুর রহমান
০৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৫:০৬ পূর্বাহ্ণ

ধন্যবাদ


মোঃ আব্দুর রাজ্জাক
০১ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৭:৪৯ অপরাহ্ণ

সুন্দর উপস্থাপনা। আপনার জন্য রইল শুভকামনা।আমার কনটেন্ট সম্পর্কে আপনার সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শ কামনা করছি। https://www.teachers.gov.bd/content/details/1185506


লুৎফর রহমান
৩০ নভেম্বর, ২০২১ ১০:৫০ অপরাহ্ণ

Best wishes with full ratings. Sir/Mam. Please give your like, comments and ratings to watch my all-contents