পারস্পাররিক লেনদেনে ইসলামী নীতিমালা: একটি পর্যালোচনা

মোঃ মিজানুর রহমান ২৭ জুন,২০২২ ২০ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

ইসলামে পারস্পরিক লেনদেনের স্বচ্ছতা, বৈধতা ও যথার্থতা নিম্নোক্ত নীতিমালার উপর নির্ভরশীল। ইসলামী শরীয়তে সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান বিষয় হচ্ছে ঈমান-আকীদা, যা শুদ্ধ না হলে একজন ব্যক্তি মুসলমানই হতে পারে না। ঈমান-আকীদার পর সবচে গুরুত্বপূর্ণ হল ইবাদত-বন্দেগীর অধ্যায়। এর পরেই মুআমালাত ও মুআশারাতের স্থান। কিন্তু ইসলামী শরীয়তের অধ্যায়গুলোর একটিকে আরেকটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। সকল অধ্যায় একই সুতোয় গাঁথা।

হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন-

لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন- ‘যার আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই। যার প্রতিশ্রুতির ঠিক নেই তার দ্বীন নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ/১২৩৮৩)।

        অনুরূপভাবে মুসলিম শরীফের এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, যার উপার্জন হারাম আল্লাহ পাক তার দুআ কবুল করেন না। (সহীহ মুসলিম/১০১৫)।

অন্য এক হাদীসে নবীজী সা. ঘোষণা দিয়েছেন,

لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُولٍ

ওযু ছাড়া নামায কবুল হয় না; আর আত্মসাতের (অর্থাৎ অবৈধভাবে উপার্জিত) সম্পদের ছদকাও কবুল হয় না। (সহীহ মুসলিম/২২৪; জামে তিরমিযী/১)। সুতরাং ঈমান-আকীদা ও ইবাদতের সাথে মুআমালাতের যোগসূত্র অতি গভীর ও সুদৃঢ়। ইসলামী শরীয়তে অনেক দিক থেকেই মুআমালাতের বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। 

পারস্পাররিক লেনদেনে ইসলামী নীতিমালা :

ব্যবসা-বাণিজ্যের বৈধতা যেহেতু পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই বাণিজ্যিক ব্যাপারে উভয় পক্ষের সহযোগিতা অবশ্যই থাকতে হবে। মুনাফার ক্ষেত্রে একজনের বেশি মুনাফা আর অপর জনের বেশি লোকসান, এমনটি যেন না হয় এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয় উল্লেখ করে পবিত্র কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :

تَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমা লংঘনে  একে অন্যের সাহায্য করবে না। (সূরা মায়িদা, ৫:২)

কারবারে উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি থাকা আবশ্যক। জোরপূর্বক সম্মতি আদায় করার অবকাশ নেই। এ ধরনের সম্মতি বৈধ বলে গণ্য হবে না।

ইরশাদ হয়েছে :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ

হে মু’মিনগণ! তোমরা  একে অপরের সম্মতি অন্যায়ভাবে গ্রাস করবে না কিন্তু তোমরা পরস্পর রাযী হলে ব্যবসা করা বৈধ। (সূরা নিসা, ৪ : ২৯)

চুক্তি সম্পাদনকারীদের মধ্যে ব্যবসার যোগ্যতা থাকতে হবে। অর্থাৎ তাকে বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক ও আযাদ হতে হবে। অবুঝ, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও পাগল হলে ব্যবসার চুক্তি সম্পাদন সহীহ হবে না। রাসূল সা. ইরশাদ করেন :

رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ عَنْ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنْ الْمُبْتَلَى حَتَّى يَبْرَأَ وَعَنْ الصَّبِيِّ حَتَّى يَكْبُرَ  

তিন ব্যক্তির উপর শরী’আতের নির্দেশ আরোপিত হবে না, পাগল, ঘুমন্ত ব্যক্তি ও অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক।’

ব্যবসায় কোন প্রকার প্রতারণা, আত্মসাৎ, ক্ষতি ও পাপপচার উদ্দেশ্য থাকতে পারবে না। অর্থাৎ ইসলামী শরী’আতে যেসব বস্তুর কারবার হারাম, সে সবের ব্যবসা করা যাবে না। রাসূল সা. ইরশাদ করেন : উত্তম উপার্জন হচ্ছে যা কল্যাণকর বেচাকেনা (ব্যয়-এ মাবরূর) এবং তার নিজ হাতের উপার্জন। আর ‘মাবরূর’ বেচাকেনা হচ্ছে, যাতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও কল্যাণ নিহিত থাকে। তাতে প্রতারণা, আত্মসাৎ ও আল্লাহ তা’আলার নাফরমানী থাকবে না।

রাসূল সা. আরো ইরশাদ করেন: لا ضرر و لا ضرار  ‘(নিজ) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং (অন্যকে) ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয় (অবৈধ)।’

সম্পদ বাড়ানো এবং মুনাফা অর্জনের জন্য এরূপ লেনদেন করা, যাতে একজনের নির্ঘাত লোকসানের মাধ্যমে অপরের মুনাফা অর্জিত হয়। যেমন, জুয়া ও লটারী। কুরআন মাজীদে জুয়া, লটারী সম্বন্ধে ইরশাদ হয়েছে :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

নিশ্চয় সুদ, জুয়া, মূর্তি বেদী ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে। (সূরা মায়িদা, ৫ : ৯০)

মুনাফা অর্জন ও সম্পদ বৃদ্ধির যে সব ব্যবসা উভয় পক্ষের কোন এক পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি পাওয়া যায়নি। বরং জবরদস্তিমূলক সম্মতিকে স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির স্থলাভিষিক্ত ধরে নেওয়া হয়েছে। যেমন, সুদের ব্যবসা বা শ্রমিককে তার শ্রমের তুলনায় কম পারিশ্রমিক প্রদান করা। এরূপ করা হারাম। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে :

احل الله البيع و حرم الربوا

আল্লাহ তা’আলা বেচাকেনাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন। (সূরা বাকারা, ২ : ২৭৫)।

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে :

قد نهى النبي صلى الله عليه وسلم عن بيع المضطر

অর্থাৎ ক্ষতিকর ক্রয়-বিক্রয় হতে রাসূল সা. নিষেধ করেছেন। শাহ ওয়ালী উল্লাহ (র.) জবরদস্তি সম্মতিকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।   

এমন ব্যবসা করা যা ইসলামের দৃষ্টিতে পাপ অথবা এমন বস্তু ক্রয় করা যা মূলগত দিক থেকে অপবিত্র। যেমন : শরাব, মৃত বস্তু, প্রতিমা, শূকর ইত্যাদির ব্যবসা। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ

তোমাদের জন্য হারাম হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত ও শূকর মাংস। (সূরা মায়িদা, ৫ : ৩)

হাদীসে উল্লেখ রয়েছে :

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ عَامَ الْفَتْحِ وَهُوَ بِمَكَّةَ إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ بَيْعَ الْخَمْرِ وَالْمَيْتَةَ وَالْخِنْزِيرَ وَالْأَصْنَامَ  

হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি শুনেছেন রাসূল সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা মদ ও মাদক দ্রব্য, মৃত শূকর ও প্রতিমার বেচাকেনাকে হারাম করে দিয়েছেন।

উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরও যেসব লেনদেনের কলহ বিবাদের আশংকা থাকে এবং যে সব লেনদেনে কোন এক পক্ষেরই ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, সে সব লেনদেন জায়িয নয়। যেমন পণ্য কিংবা মূল্য অথবা উভয়টি অস্পষ্ট রাখা। অথবা একটি লেনদেনকে দু’টো লেনদেনে পরিণত করা। যেমন বলা হল, যদি এটি নগদ টাকায় ক্রয় করা হয় তবে এর মূল্য একশত টাকা আর বাকীতে কিনলে দুইশত টাকা। অথবা বেচাকেনার মধ্যে এমন শর্ত আরোপ করা যা উক্ত লেনদেনের অংশ বা রুকন নয়। এসব লেনদেন পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবর্তে কলহ বিবাদেরই সৃষ্টি হয়ে থাকে। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে :

نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن بيع الملامسة والمنابذة في البيع

রাসূল সা. এক বেচাকেনাকে দুই বেচাকেনায় রূপান্তরিত করতে নিষেধ করেছেন। অপর এক হাদীসে আরো বর্ণিত হয়েছে:  রাসূল সা. বেচাকেনার সাথে (বাইয়ের) শর্ত আরোপ করতে নিষেধ করেছেন।     

যেসব লেনদেনে ধোঁকা ও প্রতারণা নিহিত আছে, এ জাতীয় প্রতারণামূলক লেনদেন করতে রাসূল সা. নিষেধ করেছেন। যেমন পাথরের টুকরা মিশিয়ে কোন বস্তু বেচাকেনা করা ইত্যাদি। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:  রাসূল (সা.) পাথর নিক্ষেপ করে বেচাকেনা করতে এবং প্রতারণামূলক লেনদেন করতে নিষেধ করেছেন। 

        হাদীসে আরো উল্লেখ রয়েছে:

نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن النجش

রাসূল (সা.)   লেনদেনে জালিয়াতি ও ফটকাবাজারী করতে নিষেধ করেছেন।’ এসব লেনদেনের মধ্যে যেহেতু জুয়া অথবা ক্রেতা বিক্রেতার যে কোন একজনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা তাদের পরস্পরের মেধ্য ঝগড়া বিবাদের সম্ভাবনা রয়েছে, এ জন্য এ জাতীয় লেনদেনকে ইসলাম বাতিল বলে ঘোষণা করেছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে লেনদেনে পরিচ্ছন্ন হওয়ার এবং বান্দার হকের বিষয়ে সচেতন হওয়ার তাওফীক দান করুন। হালাল উপার্জনে বরকত দান করুন, হারাম থেকে রক্ষা করুন।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
জামিলা খাতুন
২৮ জুন, ২০২২ ০৪:০৬ অপরাহ্ণ

লাইক ও রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট ও ব্লগ দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ প্রত্যাশা করছি।


লুৎফর রহমান
২৮ জুন, ২০২২ ১২:২৩ অপরাহ্ণ

Thanks for nice content and best wishes including full ratings. Please give your like, comments and ratings to watch my innovation story-2 https://www.teachers.gov.bd/content/details/1275215 Presentation link 83: https://www.teachers.gov.bd/content/details/1276919 Blog link 508: https://www.teachers.gov.bd/blog-details/649301 Publication link 23: https://www.teachers.gov.bd/content/details/1277141


জাহিদুল ইসলাম
২৮ জুন, ২০২২ ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ

আসসালামু আলাইকুম/আদাব। লাইক ও রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট ও ব্লগ দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ প্রত্যাশা করছি। কনটেন্ট লিংক: https://www.teachers.gov.bd/content/details/1273517


কোহিনুর খানম
২৮ জুন, ২০২২ ০৭:১০ পূর্বাহ্ণ

লাইক ও রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা।


প্রকৌঃ মোঃ শফি উদ্দীন
২৮ জুন, ২০২২ ০৭:০৫ পূর্বাহ্ণ

Excellent!  Surely your competency will enrich the 'Shikkhok Batayon'. You are invited to my _ppt content _Video  content


সুশিল চন্দ্র রায়
২৭ জুন, ২০২২ ১১:৪৭ অপরাহ্ণ

লাইক ও রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট ও ব্লগ দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ প্রত্যাশা করছি।