ম্যাগাজিন

পুরনো আমায় খুঁজে দুঃখ পাবে

নাসরীন আক্তার খানম ০২ নভেম্বর,২০১৯ ৫০ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ১.০০ রেটিং ( )

পুরনো আমায় খুঁজে দুঃখ পাবে ওগো,নতুনের মাঝে আমি নেইঃ
--
শাহানাজ রহমতুল্লার অভিমানী গান এটা।
পুরনো খুঁজে দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর কিছু নেই,নতুনের মাঝে পুরনো নেই,থাকে না।
তবু আমি বলব পুরনোকে ভুলতে নেই।পুরনো আর নতুন মিলেই ধারা বহমান বিশ্বের।
আলোচনায় যাই**
"শব্দের জন্ম-মৃত্যু আছে "--- ভেবে দেখলাম বেশ,কথাটা সত্য বটে।
সময়ের সাথে সাথে বাস্তব জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শব্দ মানুষ তৈরি করে ফেলে নিজেরাই- আবার অন্য ভাষার শব্দ হুবহু অথবা কিছুটা বিবর্তিত হয়ে এসে যুক্ত হয় মূল ভাষার শব্দ-প্রবাহের সাথে।
আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ/ষাট বছর পিছনের দিকে তাকাই!
আমাদের জীবনযত্রা কেমন ছিল!
আমাদের পূর্বপুরুষরা কী ধরণের কাজ করতেন? কাজ এবং শব্দ অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে জড়িত।
তাঁরা লাঙ্গল দিয়ে হালচাষ করতেন,বিভিন্ন ফসল ফলাতেন। চাষের সময়,চাষের ফসল,ফসল তোলার সময় - প্রত্যেকটি পর্বে অজস্র শব্দ ছিল।
মানুষ এখন শহর/নগর মুখী।দ্রুত নগরায়ন মানুষকে গ্রামীণ জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
অথচ বছর পঞ্চাশেক আগেও এদেশে মানুষ শহর নগর মুখী ছিল না।
এখন যারা গ্রামে হাল-চাষ করেন তাদের নিজের জমি নেই।পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তন- কাজেই সময়ের হাত ধরে নতুন শব্দ এসে যুক্ত হয়েছে অবধারিতভাবে।
লাঙ্গল নেই ট্রাক্টর এসেছে,তালপাতার পাখা নেই ফ্যানতো এখন গরীবের,এসি ছাড়া কথা নেই- করুণার পাত্র যার নেই।
হারিয়ে গেছে অনেক ফসল,হারিয়ে গেছে অনেক দেশী ফল,ফসল।নতুন এসেছে সাথে নিয়ে এসেছে নতুন নতুন শব্দ।
কাজেই হারিয়ে যাচ্ছে অনেক শব্দ।
" আউশ " বলে একটা ধান ছিল যা এখন নেই,"কাউন" বলে একটা চাল ছিল যা এতটাই সরু যে ওটা দিয়ে পায়েশ করা হত।
"বুগনী" নামে একটা মজার খাবার ছিল- যা এখন কেউ রান্না করে না,করলেও খুব কম যাদের পরিবারে প্রাচীনা কেউ আছেন কালে-ভদ্রে তারা কেউ হয়তো করেন।
এখন রান্না একটা শিল্প- টিভি তো কেউ দেখে না তেমন তবে ইউটিউব দেখে নবপ্রজন্ম।ওটা দেখে তারা রান্না শেখে,কত ধরণের আইটেম  আর কত ধরণের উপাদান যে লাগে, আমার তো সে সবের নাম উচ্চারণ করতেই দাত ভেঙে যায়।
জীবনযাপনে,লেখাপড়ার ক্ষেত্রে, ব্যবসা-বাণিজ্যে,চাকুরীতে নিত্য নতুন শব্দযোগে আমার হৃদকম্প বেড়ে যায়।
আমি কেবল আনমনে ভাবি খড়ম পায়ে দিয়ে লাঠি ধরে হাঁটতে থাকা আমার দাদার হুক্কা আর চিলুমচির কথা।ভাত বা কোনও কিছু খাবার পর হাত ধোয়ার জন্য সামনে রাখা সেই বাটি - জামবাটি, তাকে আমাদের ভাষায় কি বলা হতো মনে নেই।সব ছিল পিতলের।দাদা দস্তরখানা বিছিয়ে মাটিতে তারপর খেতেন।সৌখিন দস্তরখানা,চেয়ার টেবিল ছিল কিন্তু কেউ ভাবতেও পারত না চেয়ার টেবিলে বসে ভাত খাওয়া যায়।
আমাদের বাড়িতে বাড়তি ঘর যা মেহমানদের জন্য ছিল তাকে বলা হত দেউরি ঘর।ওখানে সতরঞ্জ বসিয়ে মাটিতে বসা হতো।
কালো মেহগনি কাঠের হাতলওলা চেয়ার ছিল- কেউ বসত না।বারান্দায় কাঠের বেঞ্চ ছিল,দাদার ছিল সখের আরাম কেদারা।
এখন ডাইনিং স্পেস,ডাইনিং টেবিল,প্লাস্টিং উড থাই গ্লাস কত যে নতুন শব্দ আর দ্রব্য যুক্ত হয়েছে।জামবাটিতে হাত ধোয় না কেউ আর তাই শব্দটা ব্যবহার হয় না।ব্যবহার না হলে শব্দ হারিয়ে যায়।
শব্দের ইতিহাসটাই এমন প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া।
-- আমি পুরনো মানুষ তাই পুরনো শব্দ খুঁজি,পুরনো ঘ্রাণ খুঁজে বেড়াই।ওখানেই যে আছে আমার মূল,ওখানেই আছে আমার অস্তিত্বের ঘ্রাণ।
নতুনকে বরণ করি বটে কিন্তু পুরনো সব থাকে হৃদয় জুড়ে।
পুরনোর হাত ধরেই নতুন আসে তাই পুরনোকে হেলা করতে নেই,ফেলে দিতে নেই,স্মৃতির সিন্দুকে রেখে দিতে হয়।
কবিগুরু লেখে গেছেন," তোমার হল শুরু,আমার হল সারা/ তোমায় আমায় মিলে এই যে বহে ধারা"।
--- পুরনোকে তাই ভোলা যায় না,যাওয়া উচিত-কর্ম নয়।
--২০/০৯/২০১৯

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মেফতাহুন নাহার
১৩ জুন, ২০২০ ০১:৩২ পূর্বাহ্ণ

শ্রেণি উপযোগী কন্টেন্ট আপলোড করে শিক্ষক বাতায়নকে সমৃদ্ধ করায় পূর্ণরেটিংসহ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। আমার আপলোড করা কন্টেন্টগুলো দেখার এবং আপনার গঠনমূলক মতামতসহ রেটিং প্রদান করার জন্যবিনীতভাবে অনুরোধ রইলো।