হাজারও রফিক স্যার বাংলার আনাচে কানাচে

মোঃ আব্দুল কাদের সুমন ২৮ নভেম্বর,২০২০ ৯০ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ৫.০০ ()

আমাদের দেশের বেসরকারি শিক্ষক সমাজ কখনো ভালো অবস্থায় ছিলেন না । বিশেষ করে অবসরে যাবার পর অবশিষ্ট জীবনটা কেমন কাটি তা সত্যি বলা বড় কঠিন্ ।

         হাজারও রফিক স্যার বাংলার আনাচে কানাচে

শরতের বিকাল বেলা, গ্রামের ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব একজন বৃদ্ধ, পরোনে ময়লা সাদা পাজামা – পাঞ্জাবী, মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়ি  তবুও মুখ পানে চেয়ে  মনে হছে শরতের আকাশে যেন কাল মেঘের ঘনাঘটা।  জীবনহীন বৃক্ষের মত শরীর।প্রথমে মানুষটাকে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। খুব কাছাকাছি আসতেই মানুষটাকে চিনতে পারলাম। তিনি আর কেউ নন, আমাদের সবার প্রিয় রফিক স্যার। কিন্তু এ কী!! রফিক স্যারের একি হাল !

আসসালামুআলাইকুম স্যার। মাথা নিচু করে রাস্তার এক পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন রফিক স্যার । সালাম শুনে মাথা উঁচু করে আমাকে দেখে মুখে একটু হাঁসি এনে ওয়ালায়কুমআসসালাম বলে সালামের জবাব দিলেন। আমি জানতে চাইলাম স্যার কেমন আছেন ? স্যার বললেন জ্বী আকাস আল- হামদুল্লিলাহ, ভাল আছি। তুমি কেমন আছো ? জ্বী স্যার আল্লাহর রহমতে ও আপনাদের দোয়ায় ভাল আছি ।

এই সময় স্যারের কাঁশি শুরু হলো । বেশ একটা লম্বা সময় ধরে স্যার কাঁশলেন । আমি স্যারকে প্রশ্ন করলাম – স্যার ডাক্তার দেখাইছেন ? স্যার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন – না বাবা সাজু”র ডিসপেনসারি থেকে কাঁশির ঔষধ এনেছিলাম । কয়েকদিন সেটা খাইছি কিন্তু তাতে খুব একটা কিছু হচ্ছে না । আমি বললাম শহরে যেয়ে বড় ডাক্তার দেখাচ্ছেন না কেন ? স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন – বললেন বাবা তুমিতো জান আমি একজন বেসরকারী শিক্ষক ছিলাম । সরকার আমাদের যে অনুদান দিতেন তা দিয়ে আমাদের সংসার চালানো কতটা কঠিন ছিল । অবসরের পর পেনশনের টাকা টাও পাইনি । দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, মনে হয় এ জীবনে আর পাব না  -

হঠাৎ স্যারের চোখ ছলছল করে উঠল। স্যার অতীতে ফিরে গেলেন । স্যার বলতে শুরু করলেন –

ছোটবেলা থেকে  লেখাপড়ায় ভাল ছিলাম। কোনদিন কোন ক্লাসে দ্বিতীয় হয়নি । আব্বার অভাবের সংসারে আমার লেখাপড়ার খরচ চালানোর মত সামর্থ্য ছিলনা । তবুও আব্বার ইচ্ছা ছিল আমি যেন লেখাপড়া করি । আব্বা বলতো লেখাপড়ার যে কি মূল্য তা আমার আব্বা বুঝতো না । তাই আমাদের পেটেও কালির আঁচড় নেই । লেখাপড়ার কথা বললে তোর দাদা বলতো “লেহাপড়া দিয়ে কী হবে? (কথা বলতে বলতে স্যারের বাড়িতে পৌছে গেলাম) ওটা আমাদের জন্যি না। তুমি একটু বড় হয়ি আমাদের সাথে কামলা দিতি যাবা । দুই বাপ্পোই কামাই করলি সংসার চলবিনি । লেহাপড়া বড় লোহের জন্যি । আমাদের মত কামলাদের জন্যি না” । তাই আর লেখাপড়া করা হয়নি আব্বার । আর এ জন্যে আব্বার মনে বড় কষ্ট ছিল । মনে মনে ভেবেছিল আমারতো হলোনা , আমার সন্তানদের আমি অবশ্যই লেখাপড়া শেখাবো । তাই আব্বা আমাকে লেখাপড়ার জন্য সবসময় বলতেন । আমিও আব্বার স্বপ্ন পুরণের জন্য খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করতাম । যখন পড়া বুঝতাম না তখন আব্বাকে বলতাম আব্বা আমার একজন শিক্ষক লাগবে আমি সব পড়া বুঝি না। তখন আব্বা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো ফ্যাল ফ্যাল করে । কিছুক্ষণ পর বলতো বাবা মন দিয়ে পড়ো বুঝতে পারবা। আমি আব্বার কষ্টটা বুঝতাম তাই আর কিছু বলতাম না । মাথা নেড়ে বলতাম ঠিক আছে।

এভাবেই বি.এ পাশ করলাম। রেলের একটা বড় চাকরিও পেলাম। আমার ইচ্ছা ছিল আবার ছিলনা কেননা শিক্ষকতা পেশা আমার ভাল লাগতো। কিন্তু সংসারের অভাবের কথা চিন্তা করে আমি চাকরিটা করতে চাচ্ছিলাম। এরপর আব্বা যখন বাধ সাধলেন বললেন” বাবা রেলের বাবু হলে হয়ত তোমার বা আমাদের অভাব থাকবে না কিন্তু গ্রামের ছেলে – মেয়েরা মানুষ হতে পারবে না। তুমি বরং গ্রামে থেকে গ্রামের ছেলে- মেয়েদের মানুষ কর। আল্লাহ আমাদের একভাবে নিয়ে যাবে । গ্রামের ছেলে – মেয়েরা মানুষ হলে আমি বড় শান্তি পাব। মনে মনে খুঁশি হলাম – বললাম ঠিক আছে আব্বা আমি গ্রামেই থাকবো। আব্বা খুব খুঁশি হলো বললো আমি জানতাম তুমি আমার কথা রাখবে।

সেই থেকে গ্রামে থেকে যাওয়া। এর কিছুদিন পরে বিয়ে করলাম। বিয়ের দুই বছর পর আব্বা আর তার এক বছর পর মা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। মা যে বছর চলে গেল ঐ বছরই আমার স্ত্রী একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিল। ওর নাম রাখলাম “শাওন” । ওর নামটা রাখা বোধ হয় স্বার্থক হয়েছে। কারণ ওকে আমরা কখনো সেইভাবে সুখ দিতে পারিনি। সারা জীবন শুধু ওর চোখে অশ্রু ঝরেছে। ওকে আমরা মানুষের মত মানুষ করতে পারিনি। লেখাপড়াটাও শেষ করাতে পারিনি। আমার স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করার পর ওকে শহরে পাঠিয়েছিলাম লেখাপড়া শেখানোর জন্য কিন্তু পারিনি। অর্থের অভাবে ওর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ যে কয়টা টাকা মাস শেষে পেতাম তা আমার স্ত্রীর চিকিৎসা আর সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিলনা। এর মধ্যে যতটুকু জমি-জমা ছিল তা বিক্রি করে ফেলেছি। এরপর যে অবশিষ্ট  এক খণ্ড জমি ছিল সেটাও বন্ধক রেখে ছেলেকে একটা মুদি দোকান করে দিয়েছি। তা না হলে বাবা না খেয়ে মরবো।

স্যারের কথা শুনতে শুনতে কখন যে দু’চোখের কোণে পানি জমে গেছে বুঝতে পারিনি।  

বিড় বিড় করে বলে ফেললাম –

“বাতির নিচে অন্ধকার”

যে রফিক স্যার বট বৃক্ষের মত হাজারও মানুষকে ছায়া দিয়েছেন আজ তার মাথার উপরে কোন ছায়া নেই। মনকে বুঝালাম –

“বট বৃক্ষের কাজইতো পথচারীকে ছায়া দেওয়া”।

 যে রফিক স্যারের আলোয় আলোকিত হয়ে শত - শত  , হাজার – হাজার ছাত্র - ছাত্রী আজ দেশের ও দেশের বাইরে অনেক বড়- বড় চাকুরি করছে। দেশের সুনাম বয়ে আনছে, দেশের অগ্রগতি সাধন করছে, তাদের ও দেশের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করছে। যে মানুষটা মোমবাতির মত জ্বলে আলো ছড়িয়েছে, যার আলোয় অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে, যার আলোয় পথ খুঁজে পেয়েছে হাজারও বাংলা মায়ের সন্তান।

কিন্তু তার সন্তান ? সেকি আলোর সন্ধান পেয়েছে ?

আর সেই আমাদের রফিক স্যার ???

অযত্ন- অবহেলায় আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে। জীবনের পড়ন্ত বিকেলটা একটা কানা গলিতে ঠেকেছে।অমানিশার অন্ধকারে  মোমবাতির অবশিষ্ট অংশের মত টিমটিম করে জ্বলছে। যেন একটু খানি হাওয়া লাগলেই ফুত করে নিভে যাবে।

বাংলার আনাচে – কানাচে এভাবেই নিরবে – নির্ভূতে বড় কষ্ট আর অভিমান নিয়ে চলে যাচ্ছে হাজারও রফিক স্যার ।

আমরা কি তার খবর রাখি ??

রাষ্ট্র কি তার খবর রাখে ??????????

 মোঃ আব্দুল কাদের সুমন

সহকারী শিক্ষক (গণিত)

রোটারী স্কুল, খুলনা।।

মতামত দিন
সাম্প্রতিক মন্তব্য
মোহাম্মদ শাহাদৎ হোসেন
২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

লাইক ও পূর্ণ রেটিংসহ আপনার জন্য শুভকামনা রইলো। আমার আপলোডকৃত কনটেন্ট দেখে আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন এবং নিরাপদে থাকবেন। অশেষ ধন্যবাদ।


অচিন্ত্য কুমার মন্ডল
২০ ডিসেম্বর, ২০২০ ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

শুভকামনা রইলো এবং সেই সাথে পূর্ণ রেটিং । আপনার তৈরি কন্টেন্ট আমার দৃষ্টিতে সেরার তালিকা ভুক্ত। সে জন্য আপনাকে একটু সহযোগিতা করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। সেই সাথে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। আমার এ পাক্ষিকের কন্টেন্ট ও ব্লগ দেখার ও রেটিং সহ মতামত প্রদানের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। ধন্যবাদ কন্টেন্টঃ https://www.teachers.gov.bd/content/details/814593 ব্লগঃ https://www.teachers.gov.bd/blog-details/586269


রেহানা আক্তার ঝর্ণা
২৯ নভেম্বর, ২০২০ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

রেটিং সহ অভিনন্দন ও শুভকামনা। আমার এ পাক্ষিকের কনটেন্ট 'পাখির কাছে ফুলের কাছে' ও ব্লগ দেখে আপনার মূল্যবান মতামত, রেটিং ও লাইক প্রদান করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।


অচিন্ত্য কুমার মন্ডল
২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০১:২১ অপরাহ্ণ

শুভকামনা রইলো এবং সেই সাথে পূর্ণ রেটিং । আপনার তৈরি কন্টেন্ট আমার দৃষ্টিতে সেরার তালিকা ভুক্ত। সে জন্য আপনাকে একটু সহযোগিতা করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। সেই সাথে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। আমার এ পাক্ষিকের কন্টেন্ট ও ব্লগ দেখার ও রেটিং সহ মতামত প্রদানের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। ধন্যবাদ https://www.teachers.gov.bd/content/details/777226 https://www.teachers.gov.bd/blog-details/583774


আব্দুল্লাহ আত তারিক
২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

শুভ সকাল, আপনার দিনটি শুভ হোক। আপনার নির্মিত কনটেন্টে পূর্ণ রেটিং, লাইক ও কমেন্টসহ শুভ কামনা রইল। আবার বাতায়ন বাড়িতে এই পাক্ষিক-এ নির্মিত কনটেন্ট "মংড়ুর পথে" দেখার আমন্ত্রণ রইল।


মোঃ তৌফিকুল ইসলাম
২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ

লাইক ও রেটিংসহ শুভকামনা। আমার এ পাক্ষিকে আপলোডকৃত কন্টেন্ট এ আপনার লাইক ও রেটিং প্রার্থনা করছি। আমার কন্টেন্ট এর লিংকঃ https://www.teachers.gov.bd/content/details/777801


মোঃ মেহেদুল ইসলাম
২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

আসসালামু আলাইকুম। শ্রদ্ধেয় প্যাডাগজি রেটার, এডমিন, সেরা কনটেন্ট নির্মাতা, শিক্ষক বাতায়নের সকল শিক্ষক- শিক্ষিকা ও আইসিটি জেলা অ্যাম্বাসেডর স্যারদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ওঅভিনন্দনhttps://www.teachers.gov.bd/content/details/780113 http://teachers.gov.bd/blog-details/584023