Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৯:৫০ অপরাহ্ণ

বাউলতত্ত্বের ( ﺑَﻮْﻝٌ ) গুপ্তবিদ্যা ও উৎপত্তি:

বাউলতত্ত্বের ( ﺑَﻮْﻝٌ ) গুপ্তবিদ্যা ও  উৎপত্তি:


( বাউল সম্পর্কে গবেষণামুলক লেখায় নেগেটিভ মন্তব্য কাম্য নয় )


বাউল একটি বিশেষ লোকাচার ও ধর্মমত। এই মতের সৃষ্টি হয়েছে বাংলার মাটিতে। বাউলকূল শিরোমণি লালন সাঁইয়ের গানের মধ্য দিয়ে বাউল মত পরিচিতি লাভ করে। বাউল গান যেমন জীবন দর্শন সম্পর্কিত তেমনই সুরসমৃদ্ধ। বাউলরা লোকসম্প্রদায়ের একটি সাধন-ভজন গোষ্ঠী, যারা গ্রামে-গঞ্জে একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের দেখা গেলেও সাধারণত কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, যশোর এবং পাবনা অঞ্চলেই এদের বেশি দেখা যায়। বাউলরা দেহভিত্তিক গুপ্ত সাধনার অনুসারী। এই সাধনায় সহজিয়া ও সুফি সাধনার সম্মিলন ঘটেছে; তবে সুফি ভাবনার প্রভাবই বেশি। বাউলরা মসজিদ বা মন্দিরে যায় না। কোনো ধর্মগ্রন্থে তাদের বিশ্বাস নেই। মূর্তিপূজা, বর্ণবৈষম্য বা জাতিভেদে তারা বিশ্বাসী নয়। তারা মানবতাবাদী। তাদের বিশ্বাস জন্মগতভাবে কেউ বাউল নয়, গুরুর নিকট দীক্ষা নিয়েই বাউল হতে হয়। বাউল সাধনা মূলত নারী-পুরুষের যুগলসাধনা।


ভাষাগত ভাবে বাউল এটা আরবী/ ফার্সি শব্দ( ﺑَﻮْﻝٌ ) যার অর্থ হ'লো প্রস্রাব, নাপাক ও নিকৃষ্ট। আভিধানিক অর্থ- হলো পাগল, ক্ষ্যাপা  বা উদাসীন। বাংলা একাডেমীর অভিধানে ''বাউল ''শব্দটির অর্থ করা হয়েছে--ধর্মীয় সাধক সম্প্রদায় বিশেষ একটি গায়ক সম্প্রদায় , সঙ্গীতের সূর বিশেষ পাগল ক্ষ্যাপা।


অর্থের সাথে অনেকটা মিলও পাওয়া যায়। তাই যারা বাউল হয় তারা নাপাক ও নিকৃষ্ট হয়। এরা যেনা, ব্যভিচার ও অবাধ মেলামেশায় মত্ত থাকে। বর্তমানে পালা ও বাউল গান নাম দিয়ে যেভাবে গান করানো হয়। এটা আসলে বাউল গান নয়, বাউল গানের নামে ভন্ডামী মাত্র। কারণ ১২ বছরের বয়স থেকে ২৫ বছরের ৪ থেকে ৮ ও ১০ জন মেয়ে শিল্পী নিয়ে ওরশ মাহফিলের নামে যে ভাবে গান করানো হয় , এটাকে ভেরাটে যাত্রা বলা চলে। যে গান শুনলে নফস আম্মারা সক্রিয় হয়ে উঠে তা হারাম। কিছু সংখক বস্তুবাদি পীর তার কিছু বস্তুবাদি শিষ্য দ্বারা "ওরশ মাহফিল" নামে এসব কাজ করে থাকেন। তাদের জন্য হক্কানি আলেম ও পীরদেরও বদনাম হয়, তাইতো মাওলানা জালাল উদ্দিন রূমী বলেছেন-"ভ্রান্ত পীর বিষাক্ত সর্পের চেয়েও ভয়ংকর। আর বৈরাগী বাউল শয়তানের চাইতেও ভয়ংকর। শরীয়ত বহির্ভূত বিয়ে ছাড়া শাদির নামে কতশত বিয়ে করে বাউল তা' নিজেও জানেনা। বাস্তবেও দেখা যায় প্রতিটি গানের আসরে বাউল শিল্পীরা তাদের মধুমক্ষিকা মেয়ে শিল্পী নিয়ে রাত্রি যাপন করে। এর প্রামাণ্য রেফারেন্স দেওয়া হ'লো। নর নারীর মিলন যাকে ইংরেজীতেঃ SEXO-YOGIC PRACTICE বলা হয়ে থাকে, এখানেই তাদের সাধনা আবর্তিত। অপর পক্ষে লালন শাহ, পান্জু শাহ, দুদ্দু শাহ প্রমুখ বাউল যুগল মিলন বা মিথুন ভিত্তিক যোগ নির্ভর সাধনা অতিক্রম করে দেহাতীতে পৌঁছবার সাধন করেছেন।


বাউল ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে ডক্টর আনোয়ারুল করিম তার বাংলাদেশের বাউল বইতে যা লিখেছেন তার সারাংশ হল, প্রাচীন প্যালেস্টাইন এর রাসসামরায় বা’আল নামের একজন প্রজনন দেবতার উপাসনা করা হতো। তৌরাত, ইঞ্জিল (বাইবেল), কোরান মজিদসহ সকল ধর্মগ্রন্থেই এই দেবতাকে তীব্র নিন্দা করা হয়েছে এবং তার উপাসনা থেকে সকলকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মূলত বা’আল প্রজনন-দেবতা হওয়ায় মৈথুন বা যৌনাচার এই ধর্মের অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে। এই বা’আল ধর্ম একসময় এ উপমদেশীয় অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে এ অঞ্চলে ইসলামের সুফীবাদী মতবাদের প্রচার-প্রসার ঘটার পর ইসলাম ও পৌত্তলিকতা উভয় মতবাদের সংমিশ্রণে একটি নতুন লোকধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল যার উপরিভাগে ছিল মুসলিম সূফীবাদের প্রাধান্য, অভ্যন্তরে ছিল তন্ত্র ও যোগনির্ভর দেহজ সাধনা। তাই তার ধারণা মতে কালক্রমে এই বা’আল লোকধর্মই পরবর্তীতে বাউল লোকধর্মে পরিণত হয়েছে এবং লোকনিরুক্তি অনুসারে বাউল শব্দটি বা’আল >বাওল >বাউল এভাবে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। (বা.বা: পৃষ্ঠা ১৩৩-১৪৫) ডাঃ আহমদ শরীফ তার “বাউলতত্ত্ব” বইটিতে বাউল ধর্মমত সম্পর্কে বলেন, “ব্রাহ্মণ্য, শৈব ও বৌদ্ধ সহজিয়া মতের সমবায়ে গড়ে উঠেছে একটি মিশ্রমত যার নাম নাথপন্থ। দেহতাত্ত্বিক সাধনাই এদের লক্ষ্য। (নাথপন্থ এবং সহজিয়া) এ দুটো সম্প্রদায়ের লোক একসময় ইসলাম ও বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়, কিন্তু পুরনো বিশ্বাস-সংস্কার বর্জন করা সম্ভব হয়নি বলেই ইসলাম ও বৈষ্ণব ধর্মের আওতায় থেকেও এরা পুরনো প্রথায় ধর্ম সাধনা করে চলে, তার ফলেই হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বাউল মতের উদ্ভব। তাই হিন্দু গুরুর মুসলিম সাগরেদ বা মুসলিম গুরুর হিন্দু সাগরেদ গ্রহণে কোন বাধা নেই। তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও শরিয়তী ইসলামের বেড়া ভেঙে নিজের মনের মত করে পথ তৈরি করে নিয়েছে। এজন্য তারা বলে,

“কালী কৃষ্ণ গড খোদা

কোন নামে নাহি বাধা।

মন কালী কৃষ্ণ গড খোদা বলো রে।” (বাউলতত্ত্ব পৃঃ ৫৩-৫৪)।


বাউলদের ঘোষণা আমরা বাউল, আমাদের ধর্ম আলাদা। আমরা না-মুসলমান, না-হিন্দু। আমাদের নবী "সাঁইজি লালন শাহ। তাঁর গান আমাদের ধর্মীয় শ্লোক। সাঁইজির মাজার আমাদের তীর্থভূমি। আমাদের গুরুই আমাদের রাসুল। আমরা আলাদা একটি জাতি, আমাদের কালেমাও আলাদা –"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লালন রাসুলুল্লাহ।(নাউজুবিল্লাহ) 

[দ্রঃ সুধীর চক্রবর্তী, ব্রাত্য লোকায়ত লালন, ২য় সংস্করণ, আগস্ট ১৯৯৮ পৃঃ ৪-৯৫]

বাউল সাধনায় গুরুশ্রেষ্ঠকে ‘সাঁই’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সাঁই তাদের বলে মাসিকের তিনদিন পরের রক্ত পান করে,আর আছে কাঁই বাবা যারা রজ:শ্রাবের প্রথম তিন দিনের কালো রক্ত পান করে। সাধনসঙ্গিনীকেও গুরু নামে অভিহিত করা হয়। মূলত: সাধনসঙ্গিনীর সক্রিয় সাহায্য ব্যতীত সাধনায় সিদ্ধী লাভ করা যায় না। তাই তাকে ‘চেতন গুরু’ বলা হয়। বাউলরা বিশ্বাস করে গুরুর কোন মৃত্যু নেই। তিনি কেবল দেহরক্ষা করতে পারেন। তিনি চিরঞ্জীবী। বাউলরা মন্দিরে কিংবা মসজিদে যায়না। জুম্মার নামাজ, ঈদ এবং রোযাও পালন করেনা। লালন বলে-

আমি মন্দিরে পুজা দেব পড়ব নামাজ দিলকাবায়

মন্দির মসজিদে যেতে বলো না আমায়।।

তারা তাদের সঙ্গিনীকে জায়নামাজ নামে অভিহিত করে। বাউলরা মৃতদেহকে পোড়ায়না। এদের জানাজাও হয়না। হিন্দু মুসলমান নামের সব বাউলদের মধ্যেই এই রীতি। এরা সামাজিক বিবাহ বন্ধনকেও অস্বীকার করে। নারী-পুরুষের একত্রে অবাধ মেলামেশা এবং বসবাসকে দর্শন হিসেবে অনুসরণ করে। (বা.বা: পৃঃ ১৫-১৭)

বাউল সাধনা মূলত: একটি আধ্যাত্বসাধনা, তবে যৌনাচার এই সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ। ডঃ আহমদ শরীফের ভাষায় কামাচার বা মিথুনাত্মক যোগসাধনাই বাউল পদ্ধতি। বাউল সাধনায় পরকীয়া প্রেম এবং গাঁজা সেবন প্রচলিত। বাউলরা বিশ্বাস করে যে, কুমারী মেয়ের রজ:পান করলে শরীরে রোগ প্রতিরোধক তৈরী হয়। তাই বাউলদের মধ্যে রজ:পান একটি সাধারন ঘটনা। এছাড়া, তারা রোগমুক্তির জন্য স্বীয় মুত্র ও স্তনদুগ্ধ পান করে। সর্বরোগ থেকে মুক্তির জন্য তারা মল, মুত্র, রজ: ও বীর্য মিশ্রণে প্রেমভাজা নামক একপ্রকার পদার্থ তৈরি করে তা ভক্ষণ করে। একজন বাউলের একাধিক সেবাদাসী থাকে। এদের অধিকাংশই কমবয়সী মেয়ে। (বা.বা: পৃ ৩৫০, ৩৮২)

এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বাউল সম্প্রদায় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকায়, অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলিমও ধর্মবিবর্জিত বিকৃত যৌনাচারী মুসলিম নামধারী শয়তান বাউলদেরকে সূফী-সাধকের মর্যাদায় বসিয়ে থাকে। মূলত: বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত এসব বাউলরা তাদের বিকৃত ও কুৎসিত জীবনাচারণকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখার জন্য বিভিন্ন গানে "মোকাম, "মঞ্জিল, "আল্লাহ, "রাসূল, "আয়নল হক, "আদম-হাওয়া, "মুহাম্মদ-খাদিজাসহ বিভিন্ন আরবী পরিভাষা, আরবী হরফ ও বাংলা শব্দ প্রতীকরূপে ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করেছে। এদেশে বহুল প্রচলিত একটি লালন সঙ্গীত হলো,

“বাড়ির পাশে আরশি নগর--সেথা এক পড়শী বসত করে,

আমি একদিনও না দেখিলাম তারে”

এই গানটিকে আমাদের সমাজে খুবই উচ্চমানের আধ্যাতিক গান মনে করা হলেও, এটি নিছক যৌনাচারমূলক গান, যাতে আরশিনগর, পড়শী শব্দগুলো প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের বিকৃত জীবনাচারকে গোপন রাখার উদ্দেশ্যে। (বা.বা: পৃঃ ৩৬৮-৩৬৯)

এককথায় বাউল একটি ভ্রান্ত মত ও পথ অন্ধবিশ্বাস।

মন্তব্য করুন

ব্লগ