সিনিয়র শিক্ষক
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:৪৯ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
**বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ না হওয়ার পিছনে কারন/ যুক্তি:
##প্রভাবশালী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দের জাতীয়করণে বিরোধিতা:
##সংগঠনের সংখ্যার আধিক্য ও সমন্বয়হীনতা।
##সংগঠনের কর্তাব্যক্তি প্রায় সবাই অবসরপ্রাপ্ত।
##আমলাদের বিরোধিতা।
##নীতিনির্ধারকদের সাধারণ শিক্ষকদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকা।
##লোকাল রাজনীতিবিদদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ ও প্রভাব।
##সমন্বিতভাবে দাবি উপস্থাপন করতে না পারা।
=এবার বিশ্লেষণে যাওয়া যাক==
**প্রভাবশালী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দের বিরোধিতা:
বিভাগীয় শহরগুলোতে ক্ষেত্রবিশেষ জেলা শহরে অবস্থিত নামিদামি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকবৃন্দ আর্থিক দিক দিয়ে এত বেশি স্বচ্ছল যা ধারণার অতিত। জাতীয়করণ হলে তারা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (বলে রাখা ভালো তাদের বেতন যে খুব বেশি তা নয় কিন্তু। তাদের ইনকামের অনেকগুলো খাত আছে। বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, তারা এক দিক থেকে আরেক দিক ঘুরলেই টাকা।) এরপর তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে সারা জীবন একই প্রতিষ্ঠানে আরামে চাকরি করছেন। বদলির কোন সম্ভাবনা নাই। এখানে বলে রাখা ভালো এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তারা সবাই মারাত্মক প্রভাবশালী ব্যক্তি বর্গের( যেমন মন্ত্রী, এমপি, সচিব, উপসচিব, ডিসি, এসপি, বিচারপতি, মেয়র, শিল্পপতি ইত্যাদি) আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বোন,শ্যালক -শালিকা, কাছের, লোক দূরের লোক ইত্যাদি। এতগুলো সুযোগ-সুবিধা কেউ কি হারাতে চায়? সুতরাং জাতীয়করণ নয়।
**সংগঠনের সংখ্যার আধিক্য ও সমন্বয়হীনতা:
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত এতগুলো সংগঠন অন্য কোন পেশায় নেই। সংগঠন একাধিক থাকতে পারে, তার একটা সীমারেখা এবং পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমাকে পদ দেয়া হয়নি সুতরাং আমি একটা সংগঠন খুলে দিলাম। এভাবে বিভাজিত হতে হতে মূল দাবি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আর এই সুযোগটাই ব্যবহার করছেন রাজনীতিবিদ ও আমলাগন। খুব বেশি হইচই করলে, শিক্ষক নেতাদের চায়ের দাওয়াত দিয়ে, এই করছি, সেই করছি বলে আন্দোলনে পানি ঢেলে দিচ্ছেন। নেতাগণ খুশিতে গদগদ হয়ে ভাব নিচ্ছেন আমার অমুকের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, হ্যান হয়েছে ত্যান হয়েছ ইত্যাদি।
**সংগঠনের ব্যক্তিবর্গ প্রায় সবাই অবসরপ্রাপ্ত:
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কখনোই জাতীয়করণ চাইতে পারে না। বরং জাতীয়করণ না হলেই তাদের সুবিধা। পদ-পদবি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করা যায়। এছাড়াও পদ-পদবী ব্যবহার করে যা করা যায়, তাই করছে। আমি নিজে যেটা পায়নি, সেটা অন্য কেউ পাক, এই মানসিকতার লোক বর্তমানে বিরল। সুতরাং তাদের নেতৃত্বে জাতীয়করণ অসম্ভব।
**আমলাদের বিরোধিতা:
আমাদের দেশের বড় বড় আমলা বৃন্দের অধিকাংশের পরিবারের লোকজন আত্মীয়-স্বজন সবাই খ্যাতনামা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং তারা বর্তমানে প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বৈধভাবে বিভিন্ন উপায় পেয়ে থাকেন। তারা খুব আরাম-আয়েশে জীবন-যাপন করছে। জাতীয়করণ হলে এদের বহুবিধ সমস্যা দেখা দিবে। যেমন-
১.আয় কমে যাবে।
২.বদলি জনিত সমস্যায় পড়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বিঘ্ন ঘটবে।
৩. নিজস্ব ব্যয় বেড়ে যাবে।
জেনেশুনে এতগুলো সমস্যা কেউ কি ডেকে আনবে? সুতরাং কোনো অবস্থাতেই জাতীয়করণ নয়।
**সাধারণ শিক্ষক বৃন্দ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা না থাকা:
আমাদের দেশের প্রায় 100% আমলাগণ সরকারি অথবা নামিদামি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছেন। সুতরাং তাদের পক্ষে সাধারণ শিক্ষকদের জীবনযাপন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক। তানরা যেসব শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসেছেন, তাদের অবস্থা সাধারণ শিক্ষকবৃন্দের ধারে কাছেও না। সুতরাং নীতিনির্ধারণে যারা আছেন তাদের শিক্ষকদের জন্য মন কাঁদবে না। তাদের অবস্থার উন্নতি প্রয়োজন, এই ভাবনা তাদের কোনো দিনই আসবে না। সুতরাং আমরা জাতীয়করণ নিয়ে ভাবছি কিন্তু নীতি নির্ধারণীতে সে ভাবনার মত কোন লোক নেই।
**লোকাল রাজনীতিবিদদের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব:
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন ওই এলাকার কোনো প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ অথবা তার অনুসারী। তারা সভাপতি হন শিক্ষার উন্নয়নের জন্য নয়, প্রভাব-প্রতিপত্তি আর নিয়োগ বাণিজ্য করতে। ক্ষেত্রবিশেষে স্কুলের অর্থ আত্মসাৎ করতে। জাতীয়করণ হলে তাদের এক বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। জেনেশুনে এই ক্ষতি কেউ ডেকে আনে সুতরাং রাজনীতিবিদগন ও জাতীয়করণের বিপক্ষে।
**সমন্বিতভাবে দাবি উপস্থাপন করতে না পারা:
দেখা যাচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে এই নেতা ওই নেতা এই করছে, সেই করছে এভাবে হবে না। নেতা বা সংগঠন বেশি থাকুক সমস্যা নেই কিন্তু জাতীয়করণের ক্ষেত্রে সবাইকে এক হয়ে এক সুরে আওয়াজ তুলে দাবি উত্থাপন করতে হবে। আবারও বলছি এটা তখনই সম্ভব যখন চাকরি আছে এমন শিক্ষকগণ নেতৃত্ব দেবেন।
**উল্লেখিত এতগুলো বাধা অতিক্রম করে জাতীয়করণ কতটা কঠিন সেটা আশা করি আপনারা অনুধাবন করতে পারছেন। তাহলে কিভাবে জাতীয়করণ হবে? অবশ্যই সম্ভব। একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, যারা জাতীয়করণের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করবেন, তারা কেউ কিন্তু কোনদিনও জাতীয়করণ চাইবে না। সুতরাং তাদেরকে বাধ্য করতে হবে। বাধ্য কখন হবে? যখন গণজোয়ার সৃষ্টি হবে। সুতরাং প্রত্যেক সংগঠনের সবাই একসাথে গণআন্দোলনের আয়োজন করুন। তাহলেই সম্ভব আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রের শৃঙ্খল ভেঙে জাতীয়করণে বাধ্য করা।
আমার ভাবনাগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। আপনি আপনার জায়গা থেকে অভিমত ব্যক্ত করে জাতীয়করণের দাবি কে শক্তিশালী করতে অবদান রাখবেন এই প্রত্যাশা করি।
**পরিশেষে পরম করুনাময় মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি, আপনারা সবাই ভালো থাকেন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা মোকাবেলায় অবদান রাখার আহ্বান জানিয়ে কলম রাখছি। ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন।
অপূর্ব কুমার বসু (সহকারী শিক্ষক ইংরেজি) করিমুন্নেচ্ছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পিরোজপুর সদর, পিরোজপুর।
জেলা অ্যাম্বাসেডর ICT4E (এটুআই)
সেরা কন্টেন্ট নির্মাতা (শিক্ষক বাতায়ন)
মাষ্টার ট্রেইনার, CA, BTT, Curriculum dissemination (English)
মোবাইল:01725920147
Email: [email protected]
৭৩
১৪৬ মন্তব্য