Loading..

ব্লগ

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৯:১৯ পূর্বাহ্ণ

রবীন্দ্রনাথের মতোই পাঁচ নাম্বার বাড়ির তিন ভাই পড়তেন জোব্বা।অবনীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে ধুতি,লুংগি পড়তেন।

ঠাকুরবাড়ির বাবুদের সাজগোজ ও মন-মরজি।


কথায় আছে না "মেজাজটাই তো আসল রাজা।" কলকাত্তাইয়া বাবুরা রাজাগজা না হলেও তাদের মেজাজটা ছিল একেবারে রাজাদের মতন।একশ টাকার নোট পুড়িয়ে সিগারেট লহোয়া,গোলাপজল,আতর দিয়ে জলশৌচ,মুক্তাভষ্মের চূর্ন দিয়ে পান আরো কত কী!!


ঠাকুরবাড়ির বাবুরাও পিছিয়ে ছিলেন না। গোপীমোহন ঠাকুর লক্ষ টাকার তোড়া নিয়ে ক্যাশে বসতেন।তিনি কোথাও গেলে সেই তোড়া কয়েকজন মিলে বইতো।গোপীমোহন এর ছেলে চন্দ্রকুমারের পত্রিকা পড়ার জন্য প্রতিদিন পা্ঁচজন করে লোক থাকত। যার পত্রিকা পড়া পছন্দ হতো একশো টাকা বখশিশ দিতেন। এছাড়াও তার ছিল খাওয়ার সখ।প্রতিদিন সদর উঠনো সারি ধরে উনুন জ্বালিয়ে দেশি বিদেশী বিভিন্ন দেশের রান্না হতো।একসাথে অনেকগুলো দেশের রান্না হতে দেখে অনেকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন।এছাড়া ও রাস্তা দিয়ে কোন বিদেশী গেলে তাকে ধরে এনে ভারতীয় পোষাক পরাতেন ও ভারতীয় খাবার খাওয়াতেন।এরপর তাকে বহুমূল্য কোন উপহার দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন।যাবার সময় কোন সাহেব করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি ভারতীয় প্রথায় নমস্কার জানাতেন।


কল্যানাক্ষ বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন,"ভারতীয়তা চন্দ্রকুমারের নেশার মতো ছিল।যদিও ইংরেজমহলে তার প্রভাব অসামান্য ছিল।"


রান্না ছাড়াও চন্দ্রকুমারের ছিল দাবার নেশা।ভালো দাবাড়ুও ছিলেন তিনি।ছোটলাট সেসময় প্রতিদিন দাবা খেলতে আসতেন চন্দ্রকুমারের বাড়ি।বারবারই হেরে যেতেন।১৮২৯-৩০ সালে চন্দ্রকুমার বিরাট আকারে দাবা খেলার আয়োজন করেন।সারা ভারতবর্ষ থেকে দাবাড়ু তাতে উপস্থিত হয়।চারমাস ধরে খেলা হয়েছিল।যাবার সময় প্রত্যেককেই চন্দ্রকুমার হাতির দাঁতের তৈরি দাবার ছক ও ঘুঁটি ও নানা জিনিসপত্র উপহার দিয়েছিলেন।রংপুরের মহারাণীর ও একবার দাবা খেলতে চন্দ্রকুমার কে তার মহলে নিমন্ত্রন করলেন।তবে তারা কেউ কারো মুখ দেখলেন না।কারণ রাণী থাকেন পর্দার আড়ালে৷তিন দিন ধরে খেলা চললো।কেউ জিতলেন ও না,হারলেন ও না৷চন্দ্রকুমার রাণীর বুদ্ধিমত্তার খুব প্রশংসা করলেন।তারা ভাইবোন পাতলেন।রাণী চন্দ্রকুমারকে উপহার দিলেন পঁচিশ থালা মিষ্টি ও এক হাজার টাকা ও চন্দ্রকুমার বোনকে দিলেন একশো থালা মিষ্টি ও পাঁচ হাজার টাকা।হরিমোহন ঠাকুরের ছিল লক্ষ জপমালা।সেই জপমালার প্রতিটি জপ সোনার প্রবাল পাথর বসানো ছিল। হরিমোহন ঠাকুর অলৌকিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন।একবার দিনাজপুরে এক মহিলার অলৌকিতায় বিশ্বাস করে তাকে বিশাল জমি দান করেছিলেন।গোপিমোহন ঠাকুর স্ত্রীকে রুপার পালংক বানিয়ে উপহার দিয়েছিলেন।


অপরদিকে কানাইলাল ঠাকুর ছিলেন আবার অন্য মেজাজের মানুষ।কথায় কথায় ডুয়েল লড়তে বলতেন।একবার দ্বারকানাথের বাড়িতে দূর্গাপুজো দেখতে গিয়ে তার ভৃত্যকে শাসন করার কারনে তিনি দ্বারকানাথের ভাগ্নে চন্দ্রকুমার মুখার্জিকে ডুয়েল লড়তে চ্যালেঞ্জ করেন।শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের মধ্যস্থতায় ডুয়েল হয় নি।


এবার আসা যাক জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কথায়।বাবুয়ানা মেজাজে দ্বারকানাথ ছিলেন ষোলআনার কাছে আঠারোআনা।একবার ব্যবসায় প্রচুর লাভ করে তিনি এত খুশি হয়েছিলেন যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীকে এক লাখ টাকার হীরে,মুক্তো বসানো খেলনা উপহার দেন।এছাড়া বেলগাছিয়ার ভিলায় প্রায়ই তিনি আসর বসাতেন এবং প্রচুর উপহার দিতেন।এতে হাজার হাজার টাকা খরচ হতো।প্যারিসে দিয়ে দ্বারকানাথ একবার এক পার্টিতে পুরো মহল কাশ্মীরী শালে জড়িয়েছিলেন এবং আমন্ত্রিত সকলে কাশ্মীরী শাল নিজ হাতে জড়িয়ে দিয়েছিলেন।দ্বারকানাথ যদিও জাত ব্যবসায়ী ছিলেন তবুও তার দয়ামায়ার কোন অভাব ছিল না। 


একবার এক ধনী পরিবারের ঋনের দায়ে বাড়ি বিক্রি হয়ে হয়ে গেল।বাড়িটি যেদিন বিক্রি হবে দ্বারকানাথ সেদিন বাড়িতে এলেন।সেখানে এসে তার কানে এলো একটি শিশু বলছে,"মা এরা কারা? এরা আমাদের বাড়িতে কি করছে? মা বললেন,"এরা আমাদের বাড়ি কিনতে এসেছেন বাছা।শিশুটি বললো,মা,তাহলে আমরা কোথায় যাব?" মা বললেন,"ভগবান আছেন,তিনি আমাদের আশ্র‍য় দেবেন।দ্বারকানাথ তার এক কর্মচারীর থেকে শুনলেন শিশুটি বাড়ির মালিকের ছেলে।তিনি তখন শিশুটিকে ডেকে বললেন,"তোমাদের কোথাও যেতে হবে না।এই বাড়িতে তোমরাই থাকবে।"

পরে তিনি ধনী ব্যক্তিটিকে ঋন থেকে বাঁচাতে সাহায্য৷ করেন।


দ্বারকানাথের পালিতা মা ছিলেন অলকাসুন্দরী।তার জীবনদশায় প্রতিদিন একজন ব্রাহ্মণ সকালে ঊষাকীর্তন শুনিয়ে তার ঘুম ভাঙাতো।অলকাসুন্দরীর মৃত্যুর পর দ্বারকানাথ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন,"বাকি জীবন স্বচ্ছন্দে কাটাতে আপনার কত টাকা প্র‍য়োজন?" ব্রাহ্মণ বললেন,"বাবুমশায়,আপনার একদিনের উপার্জনই আমার সারাজীবনে স্বচ্ছন্দে কাটানোর পক্ষে যথেষ্ট।"দ্বারকানাথ সেদিন আপিসপাড়ায় এক্টি বাড়ি বিক্রি করে প্রচুর টাকা পেয়েছিলেন।তিনি সেই টাকা দিয়ে একটি চৈতন্যদেবের মন্দির নির্মান করালেন এবং সেই ব্রাহ্মণকে মাসিক দক্ষিনাসহ সেখানে নিযুক্ত করলেন।দেবেন্দ্রনাথ ও প্রথম জীবনে প্রচন্ড বিলাসী ও খরুচে ছিলেন।বাজারে গেলে যত ফুল,মিষ্টি পেতেন সব কিনে আনতেন।গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রায়ই বন্ধুদের নিয়ে পিনিসে করে ঘুরতে যেতেন।পিনিসে বাজি লাগিয়ে তাসের আসর বসাতেন৷নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর তো ষোল আনা বাবার মতো ছিল।তিনি প্রায়ই হাজার হাজার টাকা বাকি করতেন।তার বাকির হিসাব রাখার জন্য আলাদা লোক রাখা হয়েছিল।দ্বারকানাথের ভাই রমানাথ ঠাকুর ছিলেন ইউনিয়ন ব্যাংক এর কোষাধ্যক্ষ ও অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ মানুষ।সারাবাড়িতে পান থেকে চুন খসা পছন্দ করতেন না।সবসময় হাতে ট্যাঁক ঘড়ি রাখতেন।একটা ছবিও যাতে সরে সে জন্য ও তিনি লোক রেখেছিলেন।তার প্রতিটি কাজের জন্য আগে লোক নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়াতেন।


 ঠাকুরবাড়ির বাবুরা এভাবেই নানাভাবে তাদের মেজাজ মর্জির মাধ্যমে তাদের স্থান করে নিয়েছেন পুরনো কোলকাতার রোজনামচায়৷


পুরনো দিনের বাবুয়ানা ও বাঙালিয়ানা বোঝাত একই জিনিস।বাংলায় দীর্ঘদিনের মুসলিম শাসনের ফলে বাঙালি বাবুদের সাজগোজে অবশ্যই তার একটা প্রভাব ছিল।সম্ভ্রান্ত ঘরের পুরুষেরা শুধু জরিদার ধুতি,পাঞ্জাবি নয়,সাথে খিড়কিদার পাগড়ি,আচকান,কামিজ,চুড়িদার পাজামা,তাজ,সদরি,কোর্তা,শেরোয়ানি, পরতো।আর বুকপকেটে শোভাবর্ধক হিসেবে থাকতো সুগন্ধি রুপাল,কারুকাজ করা আতরের কৌটা।মাথায় থাকতো চুড়িদার পাগড়ি,কানে দুল,হাতে বালা,গলায় মালা।আবার বিশেষ অনুষ্ঠানে হাতির দাঁতের উপর কারুকার্যময় নেকলেশ যা পুরো বুক,গলা ঢেকে রাখতো তা পরতো।


তবে ঠাকুরবাড়ির বাবুদের সাজ অবশ্য এরকম ছিল না।তারা সিম্পল এর ভেতর গর্জিয়াস পোশাকই বেশি পছন্দ করতেন।দ্বারকানাথের পিতা রামলোচন ঠাকুর যখন সন্ধায় হাওয়া খেতে বেরুতেন তখন লম্বা,কোর্তা,দোপাট্টা,তাজ পরতেন।ঠাকুরবাড়ির পুরুষেরা বাইরে ধুতি পরে যেতেন না।আদর্শ মুসলমানি পোষাকের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল ঠাকুরবাড়িতে৷পুরুষেরা পড়তেন পায়জামা ও পিরহান।উপরে চাদর।তবে উৎসবের দিন অবশ্যই ধুতি পড়তএ হত।


খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তার "রবীন্দ্রকথা" গ্রন্থে লিখেছেন," সেসময় ধুতির সহিত দোবজা না থাকিলে পরিচ্ছদ ভদ্রচিত হইত না।সেইরুপ পায়জামা,জোব্বার উপর লাল মখমলের টুপি ও শুড়তোলা নাগরা অপরিহার্য ছিল।মহর্ষির পরিবারের পুরুষেরা সাধারণত ধুতি পরিতেন না তবে উৎসবে তা অপরিহার্য ছিল।"


দ্বারকানাথের পোষাকের ব্যাপারে তার পোট্রের্ট দেখেই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।এছাড়া ভারতীয় সংগ্রহালয়ে তার সোনার নকশায় বাঁধানো হাতির দাঁতের বাজুবন্ধ আছে।দিগম্বরী দেবীর দুল ও আছে।দুটো গয়নাতেই মুঘল গয়নারীতির ছাপ রয়েছে।তা থেকে বোঝা যায়  ঠাকুরবাড়ির গয়নায় মুঘল ছাপ স্পষ্ট ছিল।সে সময় সোনায় বাঁধানো হাতির দাঁতের গয়না পরার চল খুব বেশি ছিল।মহারাজাদের অনুকরণে।তবে দ্বারকানাথের কোন পোট্রের্টে তাকে এ গয়না পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়না। কিন্তু প্রথম জীবনে তিনি এসব গয়না পড়তেন।মুক্তোর মালা,হীরের কন্ঠী সাথে বাহুবন্ধনী এগুলো তার ছিল।


অমৃতময় মুখোপাধ্যায় লিখেছেন,"ন্যাশনাল ম্যাগাজিনে একবার একজন বর্ননা দেন দ্বারকানাথ সম্পর্কে।তিনি দ্বারকানাথ কে অনেকবার দেখেছেন।তিনি বলেন,"তখন তাঁর জীবন মধ্যাহ্ন।শ্যামলা রং,মাঝারি লম্বা তবে চোখগুলো অত্যন্ত জ্বলজ্বলে।চোখের দিকে তাকালে মনে হতো যেন সবসময় তা জ্বলছে।আর তিনি যখন গভীর ভাবনায় ডুবে যেতেন তখন গোঁফে তা দিতেন।"


তখনকার ব্যবসায়ী মহলে প্রচলিত ছিল,


"দোয়ারী ঠাকুরের গোঁফের চাড়া,

লাখ টাকার তোড়া।"


আসলে ঠাকুরবাড়ির ছেলেরাই প্রথম যারা সিম্পলের ভেতর পরিপাটি পোষাকের উপর জোর দিয়েছিলেন।তখনকার দিনে বাবুরা নিজের সম্পদ জাহির করতে যে যত পারে নিজেদের তত গয়নায় মুড়তো।তবে দ্বারকানাথ,দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন আলাদা।দ্বারকানাথ পার্টিতে কি পোষাক পরতেন তার বর্ননা ও আছে সেকালের সংবাদপত্রে।যেবার দ্বারকা লাটপত্নী শ্রীমতী বার্ডকে বেলগাছিয়ার ভিলায় সংবর্ধনা দেন সেদিন তিনি পড়েছিলেন কালো মখমলের কামা,গলায় মোটা স্বর্নের চেন।তাতে লকেটেত মতো ঝুলছিল মহারানি ভিক্টোরিয়া প্রদত্ত স্বর্নপদক।দ্বারকানাথের তিনপুত্র ও ছিলেন সেখানে।তাদের ও জমকালো পোষাকে দেখা যায়।এছাড়া দ্বারকানাথ পোষাকের সাথে মানানসই জুতো পরতেন।প্রতিটি জুতোর দাম গড়ে দু থেকে তিন হাজার টাকা ছিল।তিনি যখন প্রথমবার বিলেতে যান সাথে করে পঁচিশ জোড়া জুতো নিয়ে যান।প্যারিসের পার্টিতে তিনি পরেছিলেন সোনার জরি দেয়া মখমলেত জুতো,তাতে মণিমুক্তোর কাজ।আর পরনে ছিল সোনালী জরিদার পাজামা ও কাশ্মীরী শাল।দ্বারকানাথ এর দ্বিতীয়বার বিলাতে যাবার সময় সাথে কনিষ্ঠপুত্র নগেন্দ্রনাথ ছিলেন।তিনি ছিলেন ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে রুপবান পুরুষ।নগেন্দ্রনাথ লন্ডনে থাকতে বহুমূল্য পোশাকে নিজেকে মুড়ে রাখতেন।তবে পিতাকে যেদিন সমাধিস্থ করা হয় সেদিন নগেন্দ্রনাথ কালো কুর্তা ও কালো পাজামা পরেছিলেন।


অবনীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন,দ্বারকানাথের বৈঠকখানায় দেবেন্দ্রনাথের বিয়ের সাজে পোট্রের্ট ছিল।তখন দেবেন ঠাকুরের বয়স ষোল।ছবিতে দেবেন্দ্রনাথ সলমা চুমকি দেয়া কিংখাবের পোষাক পরে হিরে মুক্তোর গয়নায় মোড়ানো ছিলেন।আর মাথায় ছিল সাদা পাগড়ি। 


প্রথম জীবনে দেবেন্দ্রনাথ যখন অঢেল বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেন তখন নাকি তিনি যখন রাস্তা দিয়ে যেতেন অনেক বাবুরাই তাকে দেখত এবং অনুকরন করতো। এ ব্যাপারে অজিতকুমার চক্রবর্তী লিখেছেন,"তাঁহার কালের কোন প্রাচীন লোকের মুখে শুনিয়াছিলাম যে জগদ্বাত্রী ভাসানোর সময় তিনি যখন বাহির হইতেন,অনেক বাবুই তাঁহার সাজ অনুকরন করিত।"


দেবেন্দ্রনাথ তার আভিজাত্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, তখন পর্যন্ত কোলকাতায় কোন বাবু তা কখনো কল্পনাও করতে পারেন নি।একবার দেবেন্দ্রনাথ নিমন্ত্রন পেলেন শোভাবাজার রাজবাড়ি থেকে।সবাই অপেক্ষা করে আছে প্রিন্স দ্বারকানাথের ছেলের সাজ দেখবে বলে।দেবেন্দ্রনাথ জলসার দিন কোন গয়না না পরে পড়লেন সাদা আচকান,মাথায় দিলেন মোড়াসা পাগড়ি।আর পায়ে পড়লেন দুটো বড় বড় হীরে বসানো জুতো।সভায় এসে যখন সবার সামনে বসলেন তকন পা দুটো বের করে রাখলেন।শোভাবাজারের রাজা বললেন,"দেখ আমরা যা গলায় ঝুলিয়েছি তা তিনি পায়ে রেখেছেন।"


পরবর্তী জীবনে দেবেন্দ্রনাথ ও তার ছেলেরা মোগলাই চাপকান,পেনটেলুন ও জোব্বা পরতেন।রবীন্দ্রনাথ ও সোমেন্দ্রনাথের উপনয়নের পর দেবেন্দ্রনাথ তাদের নিয়ে হিমালয় ভ্রমনে যেতে চাইলেন।ছেলেদের জন্য জরির কাজ করা মখমলের টুপি অর্ডার দিয়ে বানালেন।জোড়াসাঁকোর মতো পাথুরিঘাটার বাবুদের সাজপোশশাক ছিল রুচিশীল।মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর বিপুল সম্পদের মালিক হলেও জাঁকজমক করতেন না।


হিন্দু কলেজে যখন রি ইউনিয়ন হল সেদিনের কথা লিখে গেছেন রাজনারায়ন বসু।তিনি লিখেছেন-

"হিন্দু কলেজের প্রথম সম্মিলন রাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের 'মরকত নিকুঞ্জ' নামের বিশাল উদ্যানে হয়।রাজা যতীন্দ্রমোহন অতি সামান্য বেশ ধরিয়া সকলকে অভ্যর্থনা করিলেন।"


যতীন্দ্রমোহনের যে একটি ছবি পাওয়া যায় তাতে তাকে বিশেষ অলংকারে দেখা যায় না। শুধু গ্লায় একটি নবরত্নের হার।উপেন্দ্রমোহন ঠাকুর ছিলেন খুব শৌখিন মানুষ।অবনীন্দ্রনাথ তাকে মহাশৌখিন বলেছেন।কর্কশ লাগবে বলে তিনি ঢাকাই কাপড়ের পাড় ছিঁড়ে পড়তেন।


যুবক রবীন্দ্রনাথ ও স্বর্নকুমারী দেবী একবার দার্জিলিং বেড়াতে যান।সে সময় তিনি পায়জামা,কোর্তা,মাথায় পাগড়ি পড়েছিলেন।সেখানে তাঁকে দেখে কেউ কেউ লখনৌ থেকে আসা কোন নবাবপুত্র ভেবেছিলেন।


রনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার পিতৃস্মৃতি তে লিখেছেন,"পোষাক পরিচ্ছেদে বাবার রুচি পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন।বাঙালিবাবুর পোশাকে তাকে ভারি সুন্দর লাগতো।বাংলাদেশের বাইরে যখন তিনি বেড়াতে যেতেন, তাঁর পরনে থাকত ট্রাউজার,লম্বা কোট,মাথায় পাগড়ি।এই পাগড়ির আবিষ্কারক ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লোকে একে বলতো "পিরালি পাগড়ি। এর অনেক বছর পর বাবা ঢিলেঢালা জোব্বা পড়তে শুরু করলেন।মাথায় পরতেন মখমলের টুপি।তাঁর পছন্দ ছিল হালকা রং এর পোষাক।তাঁকে যৌবনে যারা দেখেছে তারাই জানে হালকা রং এর পোষাকে তাঁকে কি সুন্দর লাগতো।"


রবীন্দ্রনাথের মতোই পাঁচ নাম্বার বাড়ির তিন ভাই পড়তেন জোব্বা।অবনীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে ধুতি,লুংগি পড়তেন।


রবীন্দ্রনাথ যখন জন্মেছিলেন যখন ঠাকুরবাড়ির বৈভব অনেক্টাই শেষের দিকে।কটকি জুতোর প্রতি দুর্বলতা ছিল রবীন্দ্রনাথের। শিলাইদহে থাকার সময় পদ্মা বোট থেকে জুতো একবার নদীতে পড়ে যায়।রবীন্দ্রনাথ সাথে সাথে পানিতে ঝাপিয়ে পড়েন এবং বহুদূর সাঁতরে তা উদ্ধার করেন। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বৌরা ও নানা ধরনের বাহারি জুতো পরতেন।জ্ঞানদানন্দিনী বিলেত থেকে ফেরার পর মখমলের পাম্প সু পরতে শুরু করেন।পরে কাদম্বরী দেবী ও মৃনালিনী দেবী ও তাকে অনুকরন করেন।মৃনালিনী দেবীর ব্যবহার করা জুতোজোড়া এখনো জোড়াসাঁকো মিউজিয়ামে আছে।


পাথুরিঘাটা থেকে জোড়াসাঁকো দুই বিশিষ্ট পরিবারের মানুষজনের পোষাক পরিচ্ছেদ ও সাজসজ্জায় জড়িয়ে আছে বাংলার যুগ পরিবর্তনের ইতিহাস। এই ইতিহাসচর্চা ছাড়া বাঙালির সমাজ পরিবর্তনের চিত্র অসম্পূর্ন থেকে যাবে। 


তথ্যসূত্রঃ


১/ঠাকুরবাড়ির ভৃত্যমহল ও অন্যান্য,শান্তা শ্রীমানী,পত্রলেখা প্রকাশনী,কোলকাতা,২০২০,(পৃষ্ঠাঃ৫০-৬০,৯৪-৯৬)।


২/পাথুরেঘাটার ঠাকুরেরা (শারদীয় যুগান্তর ১৩৬৫),কল্যানাক্ষ বন্দোপাধ্যায়।


৩/ ঠাকুরবাড়ির কথা, হিরন্ময় বন্দোপাধ্যায়,কোলকাতা,২০০০,(পৃষ্ঠাঃ৭৫-৭৬)


সংগৃহীত