Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ মার্চ, ২০২৪ ০১:৪০ পূর্বাহ্ণ

সাদা রঙের শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল

#জাতীয় ফুল শাপলা#


 শাপলা (Nymphaeaceae) পুষ্প বৃক্ষ পরিবারের এক প্রকার জলজ উদ্ভিদ। এ পরিবারভূক্ত সকল উদ্ভিদই শাপলা নামে পরিচিত। সাদা শাপলাফুল বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। এই ফুল সাধারণত ভারত উপমহাদেশে দেখা যায়। হাওড়-বিল ও দিঘিতে এটি বেশি ফোটে।


আবাসস্থলঃ


এই উদ্ভিদ প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড ও মায়ানমারে এই ফুল পুকুর ও বাগান সাজাতে খুব জনপ্রিয়। সাদা শাপলা বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইয়েমেন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার প্রভৃতি দেশের পুকুর ও হ্রদে দেখা যায়। এই ফুল পাপুয়া নিউগিনি এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায়ও দেখা যায়। এই ফুল যেমন দেখা যায় চাষের জমিতে, তেমনই হয় বন্য এলাকায়। কাটা ধান ক্ষেতের জমে থাকা অল্প পানিতেএই ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়। বিশ্বে এই উদ্ভিদের প্রায় ৩৫টি প্রজাতি পাওয়া গেছে।


নামকরণঃ


বাংলায় বলা হয় শাপলা। ইংরেজিতে শাপলাকে বলা হয় “Water Lily”, White Water Lily, White Lotus.

অন্যান্য ভাষায়: থারো আংগৌবা (মনিপুরী), வெள்ளாம்பல் ভেলাম্বাল (তামিল), कुमुद কুমুদ (সংস্কৃত), শালুক (বাংলা), নিরাম্বল (মালয়ালম ভাষা), কান্নাইদিলি (কান্নাদা), নাল (আসামি ভাষা)। বাংলায় নীল শাপলা ফুলকে শালুক বা নীলকমল, লাল শাপলাফুলকে রক্তকমল বলা হয়। চট্টগ্রামে এই ফুল কে অঁলাফুল বলা হয়।


বর্ণনাঃ


শাপলা ফুল ভোর বেলা ফোটে এবং দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে পাঁপড়ি বুজে যায়। সরাসরি কাণ্ড ও মূলের সাথে যুক্ত থাকে। শাপলার পাতা আর ফুলের কাণ্ড বা ডাটি বা পুস্পদণ্ড পানির নিচে মূলের সাথে যুক্ত থাকে। আর এই মূল যুক্ত থাকে মাটির সঙ্গে এবং পাতা পানির উপর ভেসে থাকে। মূল থেকেই নতুন পাতার জন্ম নেয়। পাতাগুলো গোল এবং সবুজ রঙের হয় কিন্তু নিচের দিকে কালো রঙ। ভাসমান পাতাগুলোর চারদিক ধারালো হয়। পাতার সাইজ ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার এবং এদের ব্যাপ্তি প্রায় ০.৯ থেকে ১.৮ মি। শাপলা ফুল নানা রঙের দেখা যায় যেমনঃ গোলাপী, সাদা, নীল, বেগুনি ইত্যাদি। এই ফুলে ৪ থেকে ৫ টি বৃতি থাকে ও ১৩ থেকে ১৫ টি পাপড়িথাকে। ফুলগুলো দেখতে তারার মত মনে হয়। কাপের সমান বৃতিগুলো ১১-১৪ সেমি হয়ে থাকে। প্রায় বছরের সব সময় শাপলা ফুটতে দেখা যায় তবে বর্ষা ও শরৎ এই উদ্ভিদ জন্মানোর শ্রেষ্ঠ সময়।


প্রকারভেদঃ

শাপলা ফুল অনেক রঙের হলেও কেবল সাদা শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের পয়সা, টাকা, দলিলপত্রে জাতীয় ফুল শাপলা বা এর জলছাপ আঁকা থাকে।

এই ফুল শ্রীলংকারও জাতীয় ফুল। শ্রীলংকায় এই ফুল Nil Mānel নীল মাহানেল নামে পরিচিত। শ্রীলংকার ভাষায় নীল থেকে এই ফুলকে ইংরেজিতে অনেক সময় blue lotus বলা হয়। শ্রীলংকায় বিভিন্ন পুকুর ও প্রাকৃতিক হ্রদে এই ফুল ফোটে। এই জলজ উদ্ভিদের ফুলের বিবরণ বেশ কিছু প্রাচীন বই যেমন - সংস্কৃত, পালি ও শ্রীলংকান ভাষার সাহিত্যে প্রাচীনকাল থেকে "কুভালয়া", "ইন্ধিয়ারা", নীলুপ্পালা, নীলথপালা, নীলুফুল নামে পাওয়া গেছে যা শ্রেষ্ঠতা, শৃংখলা, পবিত্রতার প্রতীক। শ্রীলংকার বুদ্ধদের দৃঢ় বিশ্বাস গৌতম বুদ্ধের পায়ের ছাপে পাওয়া ১০৮ টি শুভ চিহ্নের মাঝে একটি ছিল এই শাপলা ফুল।


ইতিহাসঃ

শাপলার পরিবার বা গোত্র হল Nymphaea। এটি একটি গ্রিক শব্দের অনুবাদ। গ্রীক দার্শনিক প্লেটোও এরিস্টটল-এর এক শিষ্য থিউফ্রাস্টাস বলেছেন, এই উদ্ভিদ প্রায় ৩০০ খৃস্টপূর্ব পুরানো। তিনি আরো বলেছেন প্রাচীন গ্রীকে জল দেবীদের এই ফুল উৎসর্গ করে উপাসনা করার রীতি ছিল। প্রাচীন মিশরে, হাজার বছর ধরে Nymphaea caerulea (এখন যা Nymphaea nouchali/ caerulea এ হারিয়ে গেছে), নীল শাপলা ফুল, সাদা শাপলা ফুলের প্রতি অনুরাগী ছিল। মানুষ এই ফুল খেত, আঁকত এবং শ্রদ্ধা করত। কথিত আছে ভারতে হিন্দুদের সর্প দেবী মনসা পূজায় শাপলা ফুল দেয়া হয়।


 উৎপত্তিস্হলঃ


এ ফুলের উৎপত্তি হয়েছে উত্তর ও মধ্য আফ্রিকা থেকে। ধারনা করা হয়, এই ফুল প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্ব পুরোনো। মিশরের নীল নদের ধারে এটি পাওয়া গিয়েছিলো।


প্রাচীন কালে আদিবাসীরা এটি তাদের আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করতো। থাইল্যান্ড ও মায়ানমারে বিভিন্ন পুকুর গুলো এই শাপলা ফুল দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে।


শাপলার ব্যবহারঃ


বহু আগে থেকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আফ্রিকার অনেকেই তাদের স্থানীয় বুনো শাপলার মোথা খেয়ে থাকে আর এই মোথা বা কন্দে জলীয় উপাদান রয়েছে (২০.৪%)।


শাপলার বীজে জলীয় উপাদান কম থাকে (৪.১৮%)। তবে বীজে অনেক ফ্যাট থাকে। আফ্রিকার অনেকেই শাপলা চাষ করে থাকে খাওয়ার জন্য।


শাপলার এই কন্দ বিভিন্ন দেশে সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয় এমনকি সালাদেও ব্যবহার করা হয়। শাপলার এই মোথা ভেষজ চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।


অনেকেই শাপলার বোঁটা নারকেল দিয়ে খেয়ে থাকেন এতে অনেক সুস্বাদু হয়। এটি ব্যাপকভাবে বিভিন্ন জায়গায় খাওয়া হয়। তবে সবজি হিসেবে সাধারণত সাদা শপলাই খাওয়া হয়। লাল বা নীল রঙের যে শাপলা হয়, তা সবজি হিসেবে খাওয়া হয় না।


শাপলার পুষ্টিগুণঃ


শাপলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম। প্রতি ১০০ গ্রাম শাপলার লতায় মধ্যে রয়েছে-


খনিজ পদার্থ – ১.৩ গ্রামআঁশ রয়েছে – ১.১ গ্রামক্যালোরি-প্রোটিন রয়েছে – ৩.১ গ্রামশর্করা রয়েছে – ৩১.৭ গ্রামক্যালসিয়াম রয়েছে – ৭৬ মিলিগ্রামএছাড়াও শাপলাতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন-বি ১, ভিটামিন-বি ৭, ফসফরাস।


বলা হয় যে, আলুর থেকেও সাতগুন বেশি ক্যালসিয়াম রয়েছে শাপলাতে।


শাপলার পুষ্টিগুণের উপকারিতাঃ


আঁশঃ

ফাইবার বা আঁশ আমাদের শরীরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।


কারণ ফাইবার হজম করতে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে।পেট দীর্ঘ সময় ভরা রাখতে সাহায্য করে।

শাপলা ফাইবারের একটি ভালো উৎস।


প্রোটিনঃ

আমাদের শরীরের ত্বক, চুল, নখ, হাড়কে সচল রাখতে প্রোটিন প্রয়োজন।


দেহের ক্ষয় পূরণ, বৃদ্ধি সাধন, নতুন চোষ গঠন এই সব কাজ করে প্রোটিন। এই সব কার্য সম্পাদনে শাপলার ভুমিকা রয়েছে।


ক্যালসিয়ামঃ

শরীরের হাড় এবং দাঁত মজবুত করতে ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।


এছাড়াও মাংসপেশি গঠন, শরীরের বিকাশে সহায়তা করে ক্যালসিয়াম। শাপলায় ভালো পরিমানে ক্যালসিয়াম রয়েছে।


ভিটামিন সিঃ

এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। শরীরের বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে ভিটামিন সি।

দেহের ইমিউন সিস্টেমকে সবল করতে ভিটামিন-সি অত্যন্ত কার্যকরী ভুমিকা পালন করে থাকে।


ভিটামিন বি ১ঃ

গ্লুকোজ বিপাকের জন্য অনেক প্রয়োজনীয়তা একটি উপাদান হচ্ছে ভিটামিন-বি ১।

এছাড়াও এটি পেশী, স্নায়ু এবং হার্টের কার্যক্রমে সহায়ক ভুমিকা পালন করে।


ভিটামিন বি ৭ঃ

ভিটামিন বি ৭, যা বায়োটিন নামে পরিচিত, এটি জলীয় দ্রবণীয় ভিটামিন যা শরীরের বিপাক এবং কার্যক্ষমতার জন্য অত্যাবশ্যক।


ফসফরাসঃ

আমাদের দেহের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পাদন করে ফসফরাস। আর এই শাপলা ফসফরাসের কার্যকারিতায় ভুমিকা রাখে।



মন্তব্য করুন