প্রভাষক
৩১ মে, ২০২৪ ০৮:৫৫ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
আজ ৩১শে মে।
ভারতবর্ষের ধর্মীয় ইতিহাসে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে মে এক ঐতিহাসিক দিন। এই বিশেষ দিনটিই দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের প্রতিষ্ঠাদিবস। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কালীসাধনা করতেন এই মন্দিরে।
১৮৪৭ সালে কলকাতার রানি রাসমণিদেবী অন্নপূর্ণার পুজো দেবেন বলে কাশীতে তীর্থযাত্রার আয়োজন করেন। ২৪টি নৌকা আত্মীয়স্বজন, দাসদাসী সবকিছু প্রস্তুত। যাত্রার ঠিক আগের দিন রাতে রানি দেবী কালীর স্বপ্নাদেশ পান যে তার কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গঙ্গাতীরেই একটি মন্দিরে কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা করলে দেবী সেই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েই পূজা গ্রহণ করবেন।”
স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী রানি রাসমণি তাঁর কাশী যাত্রা স্থগিত রেখে গঙ্গার তীরে মা কালীর মন্দির নির্মাণ কার্যে অবতীর্ণ হন। অবশেষে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ২০ একরের প্লটটি জন হেস্টি নামে এক ইংরেজের কাছ থেকে কেনেন রানি রাসমনি। তখন এটাকে সবাই বলত– ‘সাহেবান বাগিচা’।
আদপে এটি ছিল কচ্ছপাকার সংখ্যালঘু গোরস্থান। জমিটি দেখতে কচ্ছপের পিঠের মত তাই তন্ত্রমতে স্থানটি শক্তি উপাসনার জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। জমি ক্রয় থেকে শুরু করে মন্দির প্রতিষ্ঠার যাবতীয় কর্মে রানি রাসমণিকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলেন তাঁর তৃতীয় জামাতা মথুরামোহন বিশ্বাস।
১৮৪৭ সালে এই বিরাট মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয়; এবং শেষ হয় ১৮৫৫ সালে। তখন মোট খরচ হয়েছিল ৯ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা, যার মধ্যে শুধু উদ্বোধনের দিনই খরচ হয়েছিল ২ লক্ষ টাকা। ১০০ ফুটেরও বেশি উঁচু এই নবরত্ন মন্দিরের গর্ভগৃহে সহস্র পাপড়ির রৌপ্য-পদ্মের উপর শায়িত শিবের বুকে দেবী কালী দাঁড়িয়ে আছে। একটিমাত্র পাথর থেকেই তৈরি হয়েছে এই দেবীমূর্তি।
তবে মন্দির উদ্বোধন নিয়ে বেশ কিছু জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছিল। শোনা যায়, দক্ষিণেশ্বর মন্দির-উদ্বোধনের নিমন্ত্রণের চিঠি পেয়ে রামকৃষ্ণের দাদা রানির প্রতিনিধিদের বলেন, রানি কৈবর্ত জাতি। তাঁর নিমন্ত্রণ ও দান গ্রহণ করলে তাঁকে ‘একঘরে’ হতে হবে। রানির বিশ্বস্ত কর্মীরা তাঁকে বোঝান রানি কিন্তু কৈবর্ত নন, মাহিষ্য সম্প্রদায়ের। শেষ পর্যন্ত রামকুমার রাজি হন এবং তাঁর ভাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা দিবসের এক দিন আগে দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হন। সারা দেশ থেকে ১ লক্ষেরও বেশী ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত ছিল।
এরপর পদাধর (পরবর্তীতে শ্রীরামকৃষ্ণদেব) এর জ্যেষ্ঠভ্রাতা শ্রী রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে মে (১২৬২ বঙ্গাব্দের ১৮ জ্যৈষ্ঠ), বৃহস্পতিবার স্নানযাত্রার পুণ্য দিনে মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ সমাধা করেন। প্রতিষ্ঠিত হল দক্ষিণেশ্বরের জগৎ বিখ্যাত কালীমন্দির যা 'মা ভবতারিণী মন্দির' রূপেই জগতে পরিচিত। এই মন্দিরে দেবী কালীকে “ভবতারিণী” নামে পূজা করা হয়।
এদিকে মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় গদাধর (রামকৃষ্ণদেব) এর বড় ভাই রামকুমার চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণেশ্বরের প্রসাদ গ্রহণ করলেও গদাধর বাজার থেকে মুড়ি-মুড়কি কিনে খেয়ে, ঝামাপুকুরে ফিরে আসেন। পরে দাদার নির্দেশে পঞ্চবটীতলে নিজের হাতে রান্না করে খেতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ দুপুরে পঞ্চবটীতে পাক করলেও রাত্রে প্রসাদী লুচি খেতেন এবং জগদম্বাকে বলতেন, “মা, আমাকে কৈবতের্র অন্ন খাওয়ালি।” সেইসময় গরিব কাঙালরাও দক্ষিণেশ্বরে খেতে আগ্রহী ছিল না এবং খাওয়ার লোক না জোটায় প্রসাদী অন্ন গরুকে দেওয়া হত বা গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হত। চাকরিতে ঠাকুরের আগ্রহ কখনওই ছিল না। কিন্তু রানির জামাই মথুরবাবু একপ্রকার জোর করেই তাঁকে বিষ্ণুঘরের পূজার দায়িত্ব দিলেন। এবং ভাগ্নে হৃদয়কে দুই ভাইয়ের সাহায্যকারী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। কিছুকাল বাদে ঠাকুরের পুজো দেখে মথুরবাবু শাশুড়ি রাসমণীকে বললেন, “অদ্ভুত পূজক পাওয়া গিয়েছে, দেবী বোধহয় শীঘ্রই জাগ্রতা হয়ে উঠবেন।”
কথামৃত রচয়িতা মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বলেছেন — ১৮৫৮ সালে রানি রাসমণির বরাদ্দের তালিকা অনুযায়ী ঠাকুর ওরফে রামকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় মাইনে পাচ্ছেন মাসিক পাঁচ টাকা। (পরে তা হয় সাত টাকা।) তাঁর ভাগ্নে ‘পরিচারক’ হৃদয় মুখার্জির বেতন সাড়ে তিন টাকা। এঁর বাড়তি দায়িত্ব ছিল ফুল তোলার। এ ছাড়া বরাদ্দ তিন জোড়া কাপড়, যার মূল্য সাড়ে চার টাকা। সেই সঙ্গে প্রতিদিনের খোরাকি হিসেবে সিদ্ধ চাল, ডাল, তামাক, কাঠ।
তথ্যঃ সংগৃহীত
৭১
১৪৫ মন্তব্য