Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ জুলাই, ২০২৪ ০৪:৩২ অপরাহ্ণ

রাণী রাসমণির সংক্ষিপ্ত জীবনী

রাণী রাসমণির সংক্ষিপ্ত জীবনী

 

বিশ্ব সংসারে অপূর্ব কৃতকর্মের জন্য যে সমস্ত মহামহীয়সী নারী অমরত্ব লাভ করেছেন তাদের মধ্যে রাসমণি অন্যতম। তিনি একদিকে ছিলেন দয়াময়ী এবং অন্যদিকে ছিলেন ঈশ্বরপ্রেমী। তিনি অসহায় মানুষদের জন্য সেবা করতেন এবং মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি তার স্বামীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তিনি কালি ভক্ত ছিলেন। তিনি এবং তার স্বামী দরিদ্র মানুষের সেবায় অনেক অবদান রেখে গেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির।

 

জন্ম : বাংলা ১২০০ সনের (১৭৯৩ খ্রি.) ১১ আশ্বিন বুধবার কলকাতার উত্তরে গঙ্গার পূর্বতীরে হালিশহরের নিকটে কোরনা নামক গ্রামে রাণী রাসমণি জন্মগ্রহণ করেন।

 

পিতামাতার পরিচয়: রাণী রাসমণির পিতার নাম হরেকৃষ্ণ দাস। মাতার নাম রামপ্রিয়া দাসী। গৃহনির্মাণ ও কৃষিকার্যাদি ছিল তার বাবার পেশা। তার বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তবে তার মাতাপিতা উভয়ে ধর্মপরায়ণ ছিলেন।

 

রাণী রাসমণির বাল্যকাল ও শিক্ষা জীবন: রাসমণির জন্মের পর তার স্নেহময়ী জননী মেয়ের নাম রাখেন রাণী। পরে তার নাম হয় রাসমণি। আরো পরে দুটি নাম একত্র করে গ্রামবাসীদের কাছে রাণী রাসমণি নামে পরিচিত হন। পিতার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না থাকাতে লেখাপড়া খুব বেশি করতে পারেননি রাসমণি।

 

বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন: বাংলা ১২১১ সনের ৮ বৈশাখ জমিদার রাজচন্দ্র দাসের সাথে রাণী রাসমণির বিয়ে হয়। রাণী রাসমণির দাম্পত্য জীবন বেশ সুখের ছিল। তার স্বামী রাজচন্দ্র দাস বিপুল পৈত্রিক সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি ব্যবহারে ছিলেন অমায়িক। সুলক্ষণা স্ত্রীর সাহচর্য পাওয়াতে তিনি বহু নির্মাণ কাজ করেন। তিনি গঙ্গাতীরের ঘাট নির্মাণ করেন। তীর্থযাত্রীদের কল্যাণেও বহু কিছু করেন।

 

সন্তান-সন্ততি: পদ্মমণি, করুণা এবং জগদম্বা নামে তাদের তিনটি কন্যাসন্তান জন্মে। একটি মৃত পুত্রও রাণী রাসমণি প্রসব করেন। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে রাজচন্দ্র দাস সন্ন্যাস রোগে ইহধাম ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি প্রচুর ধন-সম্পত্তি রেখে যান। রাণী রাসমণি তার স্বামীর শ্রাদ্ধে বহু দান-ধ্যান করেন।

 

রাণী রাসমণির জনহিতকর ও ধর্মীয় কাজ: রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্র মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। তিনি বিশাল সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এর ফলে জমিদারির সমস্ত দায়িত্ব পড়ে রাণী রাসমণির উপর। কিন্তু জমিদারির পাশাপাশি তিনি জনকল্যাণ ও ধর্মচর্চা সমানভাবে করে গেছেন। ১২৪৫ সনে রাণী রাসমণি ১,২২,১১৫ টাকা খরচ করে একটি রুপার রথ তৈরি করান। তাতে জগন্নাথ দেবকে বসিয়ে রথযাত্রার দিন পরিবারের লোকজনকে নিয়ে কোলকাতার রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করেন। একবার তিনি পুণ্যভূমি জগন্নাথ ক্ষেত্রে যান। সেখানকার রাস্তাঘাট ছিল জরাজীর্ণ। তীর্থযাত্রীদের চলাফেরা করতে খুবই কষ্ট হতো। রাসমণি জনসাধারণের সুবিধার কথা চিন্তা করে সমস্ত রাস্তা সংস্কার করে দেন। শুধু তাই নয়। ষাট হাজার টাকা ব্যয় করে তিনি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা-এই তিন বিগ্রহের জন্য হীরক খচিত তিনটি মুকুটও তৈরি করিয়ে দেন।

 

রাণী রাসমণি অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো গঙ্গার জলকর বন্ধ করা।

 

একবার ইংরেজ সরকার গঙ্গায় মাছ ধরার জন্য জেলেদের ওপর কর আরোপ করেন। নিরুপায় জেলেরা তখন রাসমণির শরণাপন্ন হন। রাসমণি সরকারকে দশ হাজার টাকা কর দিয়ে মুসুড়ি থেকে মেটিয়া বুরুজ পর্যন্ত সমস্ত গঙ্গা জমা নেন এবং রশি টানিয়ে জাহাজ ও নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেন । এতে সরকার আপত্তি তোলেন। উত্তরে রাসমণি বলেন যে, নদীতে জাহাজ চললে মাছ অন্যত্র চলে যাবে। এতে জেলেদের ক্ষতি হবে। ফলে সরকার রাণী রাসমণিকে তাঁর টাকা ফেরৎ দেন এবং জলকর তুলে নেন।

 

 

রাণী তাঁর প্রজাদের সন্তানের ন্যায় প্রতিপালন করতেন। তিনি প্রজাদের উন্নতিকল্পে একলক্ষ টাকা খরচ করে 'টোনার খাল' খনন করান। ফলে মধুমতী নদীর সঙ্গে নবগঙ্গার সংযোগ সাধিত হয়। এছাড়া সোনাই, বেলিয়া ঘাটা ও ভবানীপুরে বাজার স্থাপন এবং কালীঘাট নির্মাণ তাঁর অনন্য কীর্তি।

 

রাণী রাসমণি জগন্নাথ দেবের রথ এবং তার মুকুট তৈরিতে লক্ষাধিক টাকা ব্যায় করেন। জেলেদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে তিনি জলকর রহিতকরণের যথাযথ যাবস্থা করেন। তিনি তার প্রজাদেরকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তিনি নীলকরের শোষণ থেকে জনগণকে রক্ষা করেন। নিজ খরচে তিনি ১ লক্ষ টাকা ব্যয় করে 'টোনার খাল' খনন করিয়ে মধুমতী নদীর সাথে নবগঙ্গার সংযোগ সাধন করেন। সোনাই, বেলিয়াঘাটা, ভবানীপুরে বাজার স্থাপন এবং কালীঘাট নির্মাণ করে তিনি প্রভূত যশের অধিকারী হন। রাণীর সর্বশেষ্ঠ কীর্তি দক্ষিণেশ্বরে মন্দির স্থাপন। তিনি নিজে অধিকাংশ সময়ে ঈশ্বরের সাধনায় রত থাকতেন।

 

মন্দির প্রতিষ্ঠা: ১২৫৪ বঙ্গাব্দ। রাণী একদিন বিশ্বেশ্বর দর্শনের জন্য কাশীধামে যাওয়া স্থির করেন। যাবার পূর্বরাত্রে মা কালী তাঁকে স্বপ্নে বলেন, "কাশী যাওয়ার আবশ্যকতা নেই, গঙ্গার তীরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা ও ভোগের ব্যবস্থা কর। আমি ঐ মূর্তিকে আশ্রয় করে আবির্ভূত হয়ে তোমার নিকট নিত্য পূজা গ্রহণ করবো।" মায়ের আদেশ পেয়ে রাসমণি গঙ্গার তীরে জমি কিনে মন্দির নির্মাণ করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের অগ্রজ রামকুমারকে পুরোহিত নিয়োগ করা হয়। রাণী প্রতিদিন মন্দিরে মা কালীর পূজা দিতেন। রামকুমারের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণ পুরোহিতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঐ মন্দির আজ দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির নামে খ্যাত। এখানেই রামকৃষ্ণের সাথে সাক্ষাৎ হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের।

 

‡kl Rxeb I প্রয়াণ: ১৮৬১ সালের ১৯-শে ফেব্রুয়ারি, কালীঘাটের বাড়িতে রানী রাসমণি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পরে তার মৃতদেহ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে, চন্দনকাঠে দাহ করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৬৮ বছর। রানীমার সাধারণ মানুষের প্রতি দয়া-মায়া থাকার জন্য তিনি 'লোকমাতা' সম্মান লাভ করেন। তার মৃত্যুর পর ভারতসরকার তার স্মৃতি রক্ষার্থে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেন।

 

রাণী রাসমণির জীবনী থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষা লাভ করতে পারি যে, মানুষের জন্মের চেয়ে কর্মই বড়ো। জন্ম যেখানেই হোক কর্মের দ্বারা মানুষ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। সুতরাং কর্মের 'অবসরে ধর্মচর্চায় মন দিতে হবে। তাতে দেহ মন শুদ্ধ হয়, পবিত্র হয়। এভাবে ধর্মচর্চা ও জনসেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারলে জীবন সার্থক হয়।

 

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন লেখকের লেখা রাণী রাসমণিজীবনী ও অন্তর্জাল।

মন্তব্য করুন

ব্লগ