Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৪২ অপরাহ্ণ

হামের টীকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং প্রাণঘাতী রোগ, যা প্রধানত শিশুদের আক্রমণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি, যেখানে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে।


 হামের টিকা শিশুদের জন্য অপরিহার্য, এই টিকা কীভাবে আপনার সন্তানকে সুরক্ষা দেয় এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব কতটুকু তা নিচে তুলে ধরা হলোঃ


হাম কেন একটি গুরুতর রোগ?


হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় নির্গত ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।


হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:


· তীব্র জ্বর

· কাশি ও সর্দি

· চোখ লাল হওয়া (কনজাংকটিভাইটিস)

· মুখের ভেতরে সাদা দাগ (কপ্লিক স্পট)

· শরীরে লালচে র্যাশ, যা মুখ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে


হামের জটিলতা ও ঝুঁকি


হাম শুধু একটি সাধারণ অসুস্থতা নয়; এটি শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে:


· নিউমোনিয়া: হামে আক্রান্ত শিশুদের সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা

· মারাত্মক ডায়রিয়া: যা পানিশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে

· কানের সংক্রমণ: যা স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাস করতে পারে

· মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস): যা মৃগীরোগ বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে

· অন্ধত্ব: হাম শরীরে ভিটামিন এ-এর মজুত মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়, যা থেকে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে

· মারাত্মক অপুষ্টি: হাম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, ফলে শিশু সহজেই অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হয়


বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য হাম আরও বিপজ্জনক।


হামের টিকা: সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ


হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ উপায় হলো টিকা গ্রহণ। বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের বিনামূল্যে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা দেওয়া হয়।


টিকা কতটা কার্যকর?


· এক ডোজ টিকা ৯ মাস বয়সী শিশুদের ৮৫% এবং ১২ মাসের বেশি বয়সী শিশুদের ৯৫% হাম থেকে সুরক্ষা দেয়

· দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুরা প্রায় সারা জীবনের জন্য হামের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকে

· যখন কোনো জনগোষ্ঠীতে ৯৩% এর বেশি টিকাদান হয়, সেখানে সাধারণত হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে না


বাংলাদেশের টিকাদানের সময়সূচী


বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়। দেশে এই টিকা নেওয়ার হার ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ।


বর্তমান প্রেক্ষাপট: কেন হামের প্রকোপ বাড়ছে?


সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৮৮ শতাংশ দুই ডোজ এমআর টিকা পেলেও, এখনো অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।


গুরুতর বিষয় হলো, সম্প্রতি আক্রান্ত শিশুদের ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম, যাদের নিয়মিত টিকাদানের সময়সীমা এখনো আসেনি। ২০২৪ সালে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় এবং টিকাদানের হার কিছু এলাকায় ৬০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।


এ অবস্থায় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের হামের টিকা দেওয়া হবে।


টিকা নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা


অনেক অভিভাবক হামের টিকা নিয়ে নানা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন, যা তাদের সন্তানদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে:


ভ্রান্ত ধারণা ১: "টিকা নিলেও হাম হতে পারে"

সত্য: টিকা নেওয়া শিশুর হাম হলে তা সাধারণত খুবই মৃদু হয় এবং গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করে না। টিকা না নেওয়া শিশুদের তুলনায় টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম।


ভ্রান্ত ধারণা ২: "হাম একটি সাধারণ রোগ, চিন্তার কিছু নেই"

সত্য: হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি, যা নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এবং এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রোববার পর্যন্ত হাম বা হাম-সংশ্লিষ্ট জটিলতায় কমপক্ষে ৪০ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।


ভ্রান্ত ধারণা ৩: "টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিপজ্জনক"

সত্য: হামের টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত কম এবং স্বল্পমেয়াদী, যেমন ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা বা সামান্য জ্বর। গুরুতর এলার্জি প্রতিক্রিয়া (অ্যানাফাইল্যাক্সিস) প্রতি একশত হাজার মানুষে মাত্র একজনের মধ্যে দেখা যায়।


অভিভাবকদের জন্য করণীয়


১. নিশ্চিত করুন আপনার সন্তান সময়মতো সব টিকা পেয়েছে: শিশুর টিকা কার্ড চেক করুন এবং নির্ধারিত সময়ে টিকা দিন।

২. বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করুন: সরকার ঘোষিত বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দিন।

৩. লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকুন: যদি আপনার শিশুর জ্বর, কাশি, সর্দি এবং র্যাশ দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

৪. পুষ্টির দিকে মনোযোগ দিন: শিশুকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার এবং ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ান, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

৫. অন্যদের সচেতন করুন: আপনার প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের হামের টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে জানান।


উপসংহার


হামের টিকা শিশুদের জন্য শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, এটি একান্ত প্রয়োজনীয়। একটি সাধারণ টিকার মাধ্যমে আপনি আপনার সন্তানকে একটি প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে পারেন। বর্তমানে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বাড়ছে, যা আমাদের আরও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করছে।


মনে রাখবেন, টিকা শুধু আপনার সন্তানকে নয়, পুরো সমাজকে সুরক্ষা দেয়। যখন যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ টিকা নেয়, তখন যারা চিকিৎসাগত কারণে টিকা নিতে পারে না (যেমন ক্যান্সার রোগী বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন ব্যক্তি), তারাও সুরক্ষিত থাকে। এটাকেই বলা হয় 'হার্ড ইমিউনিটি' বা জনগোষ্ঠীর অনাক্রম্যতা।


আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে আজই টিকা দিন। স্বাস্থ্যই প্রকৃত সম্পদ।

মন্তব্য করুন

ব্লগ