সহকারী শিক্ষক
০৬ জুন, ২০২৬ ০৫:৪২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
আমরা সবাই চাই আমাদের ত্বক ভালো থাকুক। কিন্তু অনকেই আছেন যারা কেমিক্যাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে চান না! ন্যাচারাল ও নিরাপদ উপায়ে ত্বকের যত্ন নিতে চান। তাদের জন্য ভালো খবর হলো, রান্নাঘরেই লুকিয়ে আছে আপনার ত্বকের অনেক সমাধান! আজকে আমরা কথা বলব একদম সাধারণ, ঘরোয়া উপায়ে ত্বকের যত্ন নিয়ে - নরমাল স্কিন হোক, ব্রণ-প্রবণ হোক, কিংবা কালো দাগের সমস্যা হোক। সাথে থাকছে অ্যালকালাইন ওয়াটারের কথাও, যেটা ঘরেই বানানো যায় নানান উপায়ে।
চলুন শুরু করি!
নরমাল স্কিন মানে এই না যে যত্নের দরকার নেই। বরং নিয়মিত যত্ন না নিলে এই ত্বকও রুক্ষ বা নিস্তেজ হয়ে যেতে পারে।
প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে তুলোয় একটু কাঁচা দুধ নিয়ে মুখ মুছে নিন। এটা ত্বকের ময়লা পরিষ্কার করে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখে। কাঁচা দুধে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বককে মসৃণ রাখতে সাহায্য করে।
সপ্তাহে ২ দিন এই মাস্ক ব্যবহার করলে ত্বক নরম ও উজ্জ্বল থাকবে।
সকালে মুখ ধোয়ার পরে একটা বরফের টুকরো পরিষ্কার কাপড়ে মুড়িয়ে মুখে কয়েক সেকেন্ড মুখে আলতো করে ঘষুন। এতে ত্বকের রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়, পোরস ছোট দেখায় এবং মুখ সতেজ লাগে।
অ্যালোভেরা পাতা কেটে ভেতরের জেলটুকু বের করে ফ্রিজে রাখুন। রাতে মুখ ধোয়ার পরে হালকা করে লাগিয়ে নিন। হালকা টেক্সচারের কারণে নরমাল স্কিনে দারুণ কাজ করে।
ব্রণ হলে আমরা অনেক সময় নানান কিছু ঘষতে থাকি - এটা আসলে উল্টো ক্ষতি করে। তাই সঠিক পদ্ধতি জানলে মাত্র ৭ দিনেইও ব্রণ দূর করা যায়। ব্রণ-প্রবণ ত্বকের যত্নে দরকার মৃদু কিন্তু কার্যকর উপায়।
কাঁচা মধুতে প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ আছে। পরিষ্কার মুখে একটু মধু লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে নিন। প্রতিদিন বা একদিন পরপর ব্যবহার করতে পারেন।
টিপস: হলুদ বেশি দিলে ত্বক হলুদ হয়ে যেতে পারে, তাই পরিমাণ কম রাখুন।
ফার্মেসিতে পাওয়া যায়। একটা তুলো দিয়ে সরাসরি ব্রণের উপরে লাগান। সারা মুখে না মেখে শুধু ব্রণের জায়গায় দিন।
১ চামচ অ্যাপল সিডার ভিনেগার।
৩ চামচ পানি মিশিয়ে পাতলা করুন।
তুলো দিয়ে মুখে লাগান।
এটা ত্বকের pH ব্যালেন্স করতে সাহায্য করে। তবে প্রথমবার ব্যবহারের আগে গালে একটু লাগিয়ে দেখুন
ঘরোয়া যত্নের চেয়ে বড় কাজ হলো ব্রণে হাত না দেওয়া। হাতের ব্যাকটেরিয়া ব্রণ আরও বাড়িয়ে দেয়। তোয়ালে আলাদা রাখুন, বালিশের কভার সপ্তাহে একবার বদলান।
ব্রণ চলে গেলেও দাগ থেকে যায় আর এটা অনেকের জন্যই বড় সমস্যা। ধৈর্য ধরে নিয়মিত ব্যবহার করলে এই দাগগুলো হালকা হয়। ব্রণের কালো দাগ দূর করার কিছু কার্যকর পদ্বতি নিচে দেওয়া হলো-
আলুর রস
কাঁচা আলু কুরিয়ে রস বের করুন। তুলো দিয়ে দাগের জায়গায় লাগান, ১৫-২০ মিনিট রেখে ধুয়ে নিন। আলুতে থাকা এনজাইম দাগ হালকা করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ব্যবহার করতে পারেন।
লেবুর রস ও মধুর মিশ্র
১/২ চামচ তাজা লেবুর রস।
১ চামচ মধু মিশিয়ে নিন।
দাগের উপরে লাগান, ১০ মিনিট রেখে ধুয়ে নিন।
সতর্কতা: লেবু লাগানোর পরে রোদে বের হবেন না। বাড়িতে থাকার সময় বা রাতে ব্যবহার করুন।
টমেটোর পেস্ট
টমেটো কুরিয়ে পেস্ট বানিয়ে মুখে লাগান, ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে নিন। টমেটোতে থাকা লাইকোপেন ও ভিটামিন সি দাগ ফিকে করতে কাজ করে।
গোলাপজল ও চন্দনের মিশ্রণ
১ চামচ চন্দন গুঁড়ো।
গোলাপজল মিশিয়ে পেস্ট বানান।
দাগের জায়গায় লাগিয়ে শুকাতে দিন, তারপর ধুয়ে নিন।
চন্দনের মিষ্টি গন্ধও আছে, মাস্কটা বেশ আরামদায়ক।
সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন
দাগ হালকা করতে চাইলে রোদ থেকে রক্ষা করাটা সবচেয়ে জরুরি। রোদে গেলে দাগ আরও গাঢ় হয়। ঘরে তৈরি সানস্ক্রিন না হলেও অন্তত ছাতা বা ওড়না ব্যবহার করুন।
অ্যালকালাইন ওয়াটার মানে এমন পানি যার pH মান স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, সাধারণত ৭.৫ থেকে ৯-এর মধ্যে। সাধারণ পানির pH ৭।
অনেকে বলেন অ্যালকালাইন পানি শরীর ও ত্বককে ভেতর থেকে সতেজ রাখে। শরীরে অ্যাসিডিটি কম থাকলে ত্বকেও তার ছাপ পড়ে,এজন্য ত্বক বেশি উজ্জ্বল ও হাইড্রেটেড দেখায়।
সুখবর হলো: অ্যালকালাইন পানি কিনতে হয় না, ঘরেই বানানো যায়!
অ্যালকালাইন পানি বিভিন্ন ধরননের হয়ে থাকে। ফলের স্লাইসের অ্যালকালাইন পানি বানানো যায়, সবজির স্লাইস দিয়েও বানানো যায়, বিভিন্ন বীজ জাতীয় জিনিস যেমন- চিয়া সীড, মেথী, জিরা।
অদ্ভুত শোনালেও লেবু pH-এ অ্যাসিডিক হলেও শরীরে গেলে অ্যালকালাইন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
বানানোর উপায়:
১ গ্লাস কুসুম গরম পানিতে (২৫০ মিলি) অর্ধেক লেবুর রস মেশান।
সকালে খালি পেটে পান করুন।
কার জন্য ভালো: যারা নতুন শুরু করছেন, বা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান তাদের জন্য এটা অনেক কার্যকর।
একটি কাচেঁর জগে ১ লিটার পানিতে ৩-৪ পিস শসা, ৫-৬ টা পুদিনা পাতা, গাজর ২ পিস স্লাইস করে দিন।
৪-৬ ঘণ্টা ঢেকে রাখুন, ফ্রিজেও রাখতে পারেন।
সারাদিন ধরে পান করুন।
কার জন্য ভালো: যাদের ত্বক শুষ্ক বা নিস্তেজ লাগে, এই অ্যলকালাইন পানি ত্বককে হাইড্রেটেড রাখতে দারুণ কার্যকর।
এটা আমাদের রান্নাঘরের পরিচিত মশলা দিয়েই বানানো যায়।
বানানোর উপায়:
১ চামচ ধনিয়া বীজ নিন।
১ চামচ জিরা নিন।
১ লিটার পানিতে সারারাত ভিজিয়ে রাখুন
সকালে ছেঁকে পান করুন।
কার জন্য ভালো: যাদের পেটের সমস্যা আছে বা হজম দুর্বল, আর পেট ঠিক থাকলে ত্বকও ভালো থাকে।
১ মুঠো তাজা পুদিনা পাতা নিন।
১ লিটার পানিতে ৪-৫ ঘণ্টা রাখুন।
ঠান্ডা করে পান করুন।
কার জন্য ভালো: গরমের দিনে সবচেয়ে মজাদার! যাদের ব্রণ হয় এবং ঘেমে ত্বক তেলতেলে লাগে তাদের জন্য চমৎকার।
কমলার স্লাইস + পুদিনা পাতা ১ মুঠো এক জগ কাচেঁর জগে পানির সাথে মিশিয়ে নিন।
তরমুজের টুকরো + লেবু ২ স্লাইস পানিতে মিশিয়ে নিন।
আপেলের স্লাইস + দারুচিনি ১-২ টুকরো পানির সাথে দিয়ে দিন।
উপরের যেকোনো একটা কম্বো ১ লিটার পানিতে দিয়ে ৬-৮ ঘণ্টা রাখুন।
কার জন্য ভালো: যারা সাদা পানি খেতে বিরক্ত লাগে, তাদের পানি খাওয়ার অভ্যাস তৈরিতে দারুণ কাজ করে।
সমস্যা | সবচেয়ে ভালো বিকল্প |
ত্বক শুষ্ক ও নিস্তেজ | শসার পানি |
ব্রণ-প্রবণ ত্বক | পুদিনা পানি |
পেটের সমস্যা + ত্বক ভালো করতে | ধনিয়া-জিরার পানি |
প্রথম শুরু করতে চান | লেবু পানি |
ডিটক্স + ভালো স্বাদ | ফলের ডিটক্স ওয়াটার |
নোট: অ্যলকালাইন পানি প্রথম প্রথম পান করার পর ঘন ঘন ক্ষিদা লাগতে পারে, কিন্তু এটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আস্তে আস্তে এই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। এই অ্যালকালাইন ওয়াটার বয়স্কের ছাপ কমাতেও খুবই কার্যকর। আর ত্বক ভিতর থেকে উজ্জ্বল করে এই পানি। প্রথম প্রথম খেতে খারাপ লাগবে কিন্তু আস্তে আস্তে নরমাল লাগবে।
উজ্জ্বল ত্বক মানে ফর্সা ত্বক না বরং ত্বক উজ্জ্বল মানে হলো ত্বক প্রাণবন্ত, মসৃণ আর স্বাস্থ্যকর দেখানো। ঘরের এই চারটি উপাদান সেই কাজটাই করে, নিয়মিত ব্যবহারে।
চন্দন ত্বক ঠান্ডা রাখে, তেলতেলে ভাব কমায় এবং ধীরে ধীরে ত্বককে উজ্জ্বল করে তোলে।
বানানোর উপায়:
সপ্তাহে ২-৩ দিন ব্যবহার করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফরক বোঝা যায়।
মুলতানি মাটি ত্বকের অতিরিক্ত তেল শুষে নেয়, পোরস পরিষ্কার করে এবং ত্বককে উজ্জ্বল ও তরতাজা দেখায়।
বানানোর উপায়:
টিপস: শুষ্ক ত্বক হলে গোলাপজলের বদলে দুধ মিশিয়ে নিন, ত্বক কম শুষ্ক লাগবে।
বেসন আমাদের রান্নাঘরের পুরোনো বন্ধু। এটা মৃদু স্ক্রাবার হিসেবে কাজ করে আর মরা কোষ সরিয়ে ত্বককে উজ্জ্বল করে তোলে।
বানানোর উপায়:
সপ্তাহে ২ দিন ব্যবহার করুন। বেশি ঘষবেন না, আস্তে করুন।
হলুদে থাকা কারকিউমিন ত্বকের দাগ কমায় এবং প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনে। এটা আমাদের দেশে হাজার বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে -কারণ আছে!
বানানোর উপায়:
টিপস: হলুদ একটু দাগ লাগাতে পারে, তাই রাতে ব্যবহার করা ভালো। হলুদ লাগিয়ে রোদে যাবেননা, কারণ ত্বক কালো হয়ে যেতে পারে।
একটা জরুরি কথা
ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো নিয়মিত মেনে চললে ত্বক সত্যিই উজ্জ্বল হয় আর এটা সত্যিই সম্ভব। তবে একটু সময় লাগে, রাতারাতি ফল আসে না। Consistency-ই আসল চাবিকাঠি। প্রতিদিন বা সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে করলে ২-৪ সপ্তাহের মধ্যে পার্থক্য চোখে পড়বে।
তবে কিছু কিছু সমস্যা আছে যেখানে শুধু ঘরোয়া পদ্ধতিতে কাজ হয় না, সেক্ষেত্রে একজন ডার্মাটোলজিস্ট বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ:
ব্রণের গর্ত (Acne Scars): গভীর গর্ত ঘরোয়া উপায়ে পুরোপুরি যায় না, এর জন্য লেজার বা মাইক্রোনিডলিং ধরনের ট্রিটমেন্ট লাগতে পারে।
ত্বক টানটান করা ও Fine Lines: ত্বকের গভীরে কোলাজেন তৈরি করতে হলে কখনো কখনো চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্য লাগে।
ঘরোয়া যত্ন ভালো রাখার জন্য, চিকিৎসা সারানোর জন্য এই দুটো আলাদা বিষয়। দুটোর জায়গা আলাদা।
ঘরোয়া যত্ন মানে রাতারাতি ফল পাওয়া না। এটা একটা অভ্যাস, নিয়মিত করলে ধীরে ধীরে তফাৎ বোঝা যায়। একটু সময় আর রান্নাঘরের সাধারণ উপকরণ দিয়েই অনেকটা ত্বকের যত্ন করা সম্ভব।
ভালো থাকুন, আর আপনার ত্বককেও ভালো রাখুন!
৫
৫ মন্তব্য