Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ জুন, ২০২৬ ০৭:১৬ পূর্বাহ্ণ

মিসওয়াকের ফজিলত, বরকত ও উপকারিতা

ইসলাম ধর্মে মিসওয়াক করার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি সুন্নাতই নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং শারীরিক ও মানসিক অফুরন্ত কল্যাণ।


নিচে মিসওয়াকের ফজিলত, বরকত ও উপকারিতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:


## 🕋 মিসওয়াকের ফজিলত ও বরকত

হাদিস শরিফে মিসওয়াকের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সর্বদা মিসওয়াক করতেন এবং উম্মতকে এর জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছেন।

 * **আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ:** মিসওয়াক করার সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

   > "মিসওয়াক হলো মুখের পবিত্রতার মাধ্যম এবং রবের সন্তুষ্টি লাভের উপায়।" (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫)

   > 

 * **নামাজের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি:** মিসওয়াক করে নামাজ আদায় করলে সাধারণ নামাজের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে:

   > "মিসওয়াক করে যে নামাজ পড়া হয়, তা মিসওয়াক ছাড়া নামাজের চেয়ে সায়েন্টিফিক বা আধ্যাত্মিক দিক থেকে ৭০ গুণ শ্রেষ্ঠ।" (বায়হাকি)

   > 

 * **নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অন্যতম প্রিয় সুন্নাত:** রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্তেও মিসওয়াক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে তিনি প্রত্যেক ওজুর সময় মিসওয়াক করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক করে দিতেন।

 * **মৃত্যুর সময় কলমা নসিব হওয়া:** ওলামায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন, নিয়মিত মিসওয়াক করার একটি বিশেষ বরকত হলো—মৃত্যুর সময় ঈমানের সাথে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা এবং কালিমা নসিব হওয়া সহজ হয়।

 * **ফেরেশতাদের সন্তুষ্টি:** মিসওয়াক করলে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়, ফলে ইবাদতের সময় আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা খুশি হন এবং ইবাদতকারীর জন্য দোয়া করেন।

## 🩺 মিসওয়াকের শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, গাছের ডাল (বিশেষ করে নিম বা পিলু গাছ) দিয়ে মিসওয়াক করার কার্যকারিতা প্লাস্টিকের ব্রাশের চেয়ে অনেক বেশি।

 * **দাঁত ও মাড়ি শক্ত করে:** মিসওয়াক করলে দাঁতের মাড়ি মজবুত হয় এবং মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বা পুঁজ পড়া বন্ধ হয়।

 * **মুখের দুর্গন্ধ দূর করে:** এটি মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে প্রাকৃতিক সুগন্ধ ও সতেজতা তৈরি করে।

 * **দাঁতের ক্ষয় ও পাথর (Tartar) রোধ করে:** মিসওয়াকের প্রাকৃতিক রস দাঁতের এনামেল রক্ষা করে এবং দাঁতে হলুদ বা কালো দাগ পড়তে দেয় না।

 * **হজমশক্তি বৃদ্ধি করে:** মিসওয়াক করার সময় মুখ থেকে যে লালা নির্গত হয়, তা পাকস্থলীর কার্যকারিতা বাড়াতে এবং খাবার দ্রুত হজম করতে সাহায্য করে।

 * **মাথার ব্যথায় উপশম:** নিয়মিত মিসওয়াক করলে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো উদ্দীপিত হয়, যা মাথা ব্যথা কমাতে এবং দৃষ্টিশক্তি প্রখর করতে সাহায্য করে।

 * **কণ্ঠস্বর পরিষ্কার করে:** এটি মুখের জড়তা দূর করে এবং কণ্ঠস্বরকে স্পষ্ট ও সুন্দর করতে সাহায্য করে।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর সুন্নাত ও ফিকহের আলোকেই মিসওয়াক করার সঠিক নিয়ম এবং সুন্নাত সময়গুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

### ⏱️ মিসওয়াক করার সুন্নাত সময় ও ক্ষেত্রসমূহ

ইসলামে নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তে মিসওয়াক করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং তা সুন্নাত ও মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হয়:

১. **ওজু করার সময়:** ওজুর কুলি করার পূর্বে মিসওয়াক করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

২. **নামাজে দাঁড়ানোর আগে:** প্রত্যেক ফরয ও নফল নামাজের ইবাদতে মগ্ন হওয়ার আগে মিসওয়াক করা উত্তম।

৩. **ঘুম থেকে ওঠার পর:** রাতে বা দিনে ঘুমানোর পর জেগে উঠে মুখ পরিষ্কার করতে মিসওয়াক করা সুন্নাত।

৪. **ঘুমাতে যাওয়ার আগে:** বিছানায় যাওয়ার পূর্বে মিসওয়াক করা অত্যন্ত বরকতময়।

৫. **পবিত্র কুরআন ও হাদিস পাঠের আগে:** তিলাওয়াত বা দ্বীনি আলোচনার আগে মুখের পবিত্রতার জন্য মিসওয়াক করা উচিত।

৬. **ঘরে প্রবেশ করার সময়:** বাইর থেকে ঘরে ফিরে পরিবারের কাছে যাওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রথম যে কাজটি করতেন তা হলো মিসওয়াক।

৭. **মুখের দুর্গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তন হলে:** দীর্ঘক্ষণ কথা না বলা বা অন্য কোনো কারণে মুখে দুর্গন্ধ বা আঠালো ভাব তৈরি হলে।

৮. **মৃত্যুর পূর্বে (অন্তিম মুহূর্তে):** মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তেও মিসওয়াক করা সুন্নাত।

### 🪵 মিসওয়াক করার সঠিক নিয়ম

মিসওয়াক থেকে পূর্ণ সুন্নাত সওয়াব এবং শারীরিক উপকারিতা পেতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত:

 * **মিসওয়াক ধরার নিয়ম:** ডান হাত দিয়ে মিসওয়াক ধরতে হবে। নিয়ম হলো—ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল (ছোট আঙুল) মিসওয়াকের নিচে, মধ্যমা ও তর্জনী আঙুল ওপরে এবং বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে মিসওয়াকের গোড়ার দিক নিচে চেপে ধরা।

 * **ঘষার দিক ও পদ্ধতি:** দাঁতের **প্রস্থে (ডানে ও বামে)** মিসওয়াক করতে হবে, লম্বালম্বি (ওপর-নিচে) নয়। ওপর-নিচে ঘষলে মাড়ির ক্ষতি হতে পারে।

 * **শুরুর স্থান:** প্রথমে মুখের ভেতরের ডানদিকের ওপরের দাঁত, তারপর বামদিকের ওপরের দাঁত। এরপর ডানদিকের নিচের দাঁত এবং সবশেষে বামদিকের নিচের দাঁত মিসওয়াক করতে হবে। এভাবে অন্তত **তিনবার** করা সুন্নাত।

 * **জিহ্বা পরিষ্কার:** দাঁত মাজা শেষ হলে জিহ্বার ওপর এবং তালুতেও হালকাভাবে মিসওয়াক ঘষে পরিষ্কার করতে হবে।

 * **মিসওয়াকের দৈর্ঘ্য ও নরম করা:** মিসওয়াকটি লম্বায় এক বিঘত (হাতের বুড়ো আঙুল থেকে কনিষ্ঠ আঙুলের দূরত্ব) হওয়া ভালো এবং তা যেন অতিরিক্ত শক্ত বা নরম না হয়। ব্যবহারের আগে এর অগ্রভাগ চিবিয়ে তুলতুলে (ব্রাশের মতো) করে নিতে হবে।

 * **ধৌত করা ও রাখা:** মিসওয়াক ব্যবহারের আগে ও পরে পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। কাজ শেষে মিসওয়াকটি শুইয়ে না রেখে খাড়া করে (উলম্বভাবে) রাখা সুন্নাত।


মন্তব্য করুন

ব্লগ