Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ জুন, ২০২৬ ০১:০৪ অপরাহ্ণ

মায়াজালের খতিয়ান ও একজন শিক্ষকের উত্তরলিপি

শব্দচিত্র: মায়াজালের খতিয়ান ও একজন শিক্ষকের উত্তরলিপি
মুফিদুল আলম
কক্সবাজার
২২ জুন ২০২৬

এক. মোহিনী মায়ার উপাখ্যান
জীবন কোনো জ্যামিতির সরল উপপাদ্য নয়; জীবন এক বহমান নদী। তার স্রোত কখনো শান্ত, কখনো উন্মত্ত; কখনো আলোয় ঝলমল, কখনো কুয়াশায় আচ্ছন্ন। সেই নদীর একেবারে উজানে, তারুণ্যের প্রথম প্রহরে, যখন হাতে প্রথমবারের মতো চক ধরা শিখলাম, যখন কৃষ্ণবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে একঝাঁক নিষ্পাপ চোখের দিকে তাকালাম, তখন চারপাশের পৃথিবী যেন এক অদ্ভুত মায়াজালে ঢেকে গেল।
ওটা শুধু একটি চাকরি ছিল না; ছিল বিশ্বাস, দায়িত্ব এবং এক অনির্বচনীয় আহ্বান। প্রতিদিন ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করা, কাঁচা হাতের অক্ষরে লেখা খাতায় লাল কালির দাগ টেনে দেওয়া, কোনো জটিল বিষয় বুঝিয়ে দেওয়ার পর শিক্ষার্থীর চোখে হঠাৎ জ্বলে ওঠা বোধের আলো—এইসব ক্ষুদ্র মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর তৃপ্তি।
সে এক অদ্ভুত মোহ।
রাষ্ট্রের চাকচিক্য, সমাজের বৈষয়িক সাফল্য কিংবা অর্থকরী পেশার হাতছানি তখন তুচ্ছ মনে হতো। মনে হতো, এই যে একজোড়া বিস্ময়ভরা চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে জ্ঞানতৃষ্ণা নিয়ে, এদের ছেড়ে অন্য কোনো পথে যাওয়া মানে নিজের আত্মার সঙ্গেই প্রতারণা করা।
মায়ার সেই জাল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম, অথচ অবিশ্বাস্যভাবে দৃঢ়। তার বন্ধন ছিন্ন করে অন্য কোনো জীবনের কথা ভাবার সাহসই জন্মায়নি। কারণ আমরা জীবিকার সন্ধানে নামিনি; নেমেছিলাম এক মহান ব্রত উদযাপনে। মানুষ গড়ার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলাম।

দুই. কালস্রোত ও মোহভঙ্গের গোধূলি
কিন্তু সময় বড় নির্দয়। সে কোনো আদর্শের জন্য অপেক্ষা করে না।
শরৎ-বসন্তের আবর্তনে ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো একদিন অজান্তেই ঝরে যায়। দীর্ঘ তেইশ-চব্বিশ বছরের পথচলার পর যখন আয়নায় মাথার রূপালি চুলগুলো চোখে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে সেই মোহের রঙিন আবরণ।
মধ্যবয়সের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বুঝতে শিখি—সমাজ শিক্ষকদের সম্মান দিতে জানে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জানে না। প্রশংসার মালা গাঁথতে জানে, কিন্তু জীবনের অনিশ্চয়তার ভার কাঁধে তুলে নিতে চায় না।
চারপাশে যখন দেখি সমবয়সীরা জীবনের বৈষয়িক অঙ্কগুলো সহজেই মিলিয়ে ফেলেছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করেছেন, নিরাপত্তার প্রাচীর নির্মাণ করেছেন; তখন নিজের জীর্ণ পকেটের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা জন্ম নেয়।
মোহভঙ্গের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো—এটি খুব দেরিতে আসে।
যখন সম্বিৎ ফিরে আসে, তখন বয়স নামের অদৃশ্য প্রাচীর সামনে এসে দাঁড়ায়। নতুন করে শুরু করার দরজাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সম্ভাবনাগুলো তখন অতীতের মতোই দূরে সরে যায়।
পেছনে ফেরার পথ থাকে না; সামনে এগোনোর সুযোগও সীমিত হয়ে আসে।

তিন. শেষ হাতুড়ি ও নীরব ক্রন্দন
তবু ব্যক্তিগত বঞ্চনার হিসাবই সবচেয়ে বড় নয়।
সবচেয়ে বেশি ব্যথা লাগে তখন, যখন দেখি—যে শিক্ষক সারাজীবন শ্রেণিকক্ষের পবিত্র আদালতে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার বিচারক হয়ে থেকেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকেই দাঁড়াতে হয় অবহেলার কাঠগড়ায়।
অবসরের পর ক্লান্ত পায়ে অফিসের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে নিজের প্রাপ্য বেতনের অংশটুকুর জন্য অপেক্ষা করা, চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা, অর্থকষ্টে নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া—এই দৃশ্যগুলো কেবল কোনো ব্যক্তির নয়; এগুলো একটি সমাজের বিবেকের আয়না।
সেখানে জ্ঞানপুত্রদের সালাম থাকে, কৃতজ্ঞতার বাক্য থাকে, কিন্তু পেটের ক্ষুধা মেটে না; রোগের যন্ত্রণা কমে না।

অবশেষে একদিন অনিষ্পন্ন আবেদনের রিসিভ কপির দিকে তাকিয়ে তিনি না ফেরার দেশে গমন করেন।
আবেদন গ্রহণকারী অফিস ও হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

কাগজে-কলমে অনেক বিচার হয়, কিন্তু মানুষের বিবেকের আদালতে বিচার হয় খুব কম।
এক জীবনের ত্যাগের বিনিময়ে যখন শেষ প্রহরে প্রাপ্তি হয় কেবল উদাসীনতা, তখন বুঝতে পারি—সমাজের সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়, কৃতজ্ঞতার অভাব।

চার. ষোল আনার হিসাব ও একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস
জীবনের উত্তরবেলায় দাঁড়িয়ে যখন খতিয়ান মেলাতে বসি, তখন মাঝে মাঝে মনে হয়—হয়তো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো এক মায়ার পেছনেই ব্যয় করে ফেলেছি।
মনের গভীরে নেমে আসে একাকীত্বের দীর্ঘ ছায়া।
যে আদর্শকে একদিন মুক্তি ভেবেছিলাম, কখনো কখনো তাকেই শৃঙ্খল বলে মনে হয়। প্রশাসনিক অবহেলার হাতুড়ির শব্দ, অবসরের পর অফিসের বারান্দায় ক্লান্ত পায়ের প্রতিধ্বনি, অসমাপ্ত প্রত্যাশার দীর্ঘশ্বাস—সব মিলিয়ে ভেতরে শুরু হয় এক অদৃশ্য যুদ্ধ।
এ যুদ্ধ আদর্শবাদী মানুষটির সঙ্গে বাস্তববাদী মানুষটির।
একজন বলে—জীবন সার্থক।
অন্যজন প্রশ্ন তোলে—কিসের বিনিময়ে?
এই দ্বন্দ্ব, এই আত্মদহন, এই নিঃসঙ্গতা—অনেক শিক্ষকই নীরবে বয়ে বেড়ান। সমাজ যাদের ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ বলে সম্মানিত করে, তাদের অনেককেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একাই লড়তে হয়।

পাঁচ. ধ্বংসস্তূপে বেঁচে থাকা সুপ্ত বীজ
তবু কি এই জীবন ব্যর্থ?
সাহিত্যের আয়নায় দাঁড়িয়ে তাকালে উত্তরটি ভিন্ন হয়ে ওঠে।
হয়তো বৈষয়িক হিসাবের খাতায় অঙ্ক মেলেনি; কিন্তু মানুষের জীবনে যে অদৃশ্য বীজ বপন করা হয়েছে, তার মূল্য নির্ধারণের সাধ্য কোনো রাজকোষের নেই।
আজ দেশের নানা প্রান্তে কত শিক্ষার্থী কত বড় দায়িত্বে নিয়োজিত। কেউ চিকিৎসক হয়ে জীবন বাঁচাচ্ছেন, কেউ কৃষিবিদ হয়ে মাটির বুক থেকে সমৃদ্ধি তুলে আনছেন, কেউ প্রশাসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক হয়ে আবার নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলছেন।
তাদের সাফল্যের ইতিহাসে হয়তো শিক্ষকের নাম লেখা থাকে না; কিন্তু তাদের মেরুদণ্ডের ভেতরে শিক্ষকের অদৃশ্য স্পর্শ রয়ে যায়।
বয়স আবেদনপত্র জমা দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু জীবনবোধ কেড়ে নিতে পারে না। সময় সুযোগ সীমিত করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীলতার আকাশ সংকুচিত করতে পারে না।
যে মানুষ নিজের বেদনা, প্রাপ্তি, অপূর্ণতা ও উপলব্ধিকে এত গভীর ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন, তার কলম কখনো নিঃশেষ হয় না।
প্রশাসকের হাতুড়ি হয়তো সম্মানকে আঘাত করেছে; কিন্তু কলমের শব্দ এখনও জীবিত। সেই শব্দ বেঁচে থাকবে, যতদিন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের গল্প বেঁচে থাকবে।

উপসংহার
শিক্ষকতার মায়াজালে জড়িয়ে পড়া কোনো ভুল ছিল না; সেটি ছিল এক নির্মল হৃদয়ের মানবিক আর্তি, এক মহৎ বিশ্বাসের প্রকাশ।
রাষ্ট্র কিংবা সমাজ যদি সেই ঋণ স্বীকার করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটি তাদের দেউলিয়াত্ব; শিক্ষকের নয়।
অবসরের পর অফিসের বারান্দায় ঘুরে বেড়ানো, প্রাপ্য পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা কিংবা অবহেলার বোঝা বহন করা—এসব কোনো মানুষের মর্যাদাকে খাটো করতে পারে না। কারণ একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নন; তিনি মানুষের ভেতর আলো জ্বালানোর কারিগর।
জীবনের সব হিসাব খাতার পাতায় মেলে না। কিছু হিসাব থেকে যায় কৃষ্ণবোর্ডের ধুলোর মধ্যে, কিছু জমা থাকে অগণিত শিক্ষার্থীর কৃতজ্ঞ হৃদয়ে, আর কিছু রয়ে যায় সময়ের কাছে অমীমাংসিত ঋণ হয়ে।
হতাশার মেঘ যতই ঘন হোক, নিজের ভেতরের শিক্ষককে বাঁচিয়ে রাখাই শেষ সত্য। কারণ জীবন হয়তো বৈষয়িক দিক থেকে ঠকিয়েছে, কিন্তু আত্মিক দিক থেকে দিয়েছে এক বিরল উচ্চতা—যেখানে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সব আদালতকে তুচ্ছ মনে হয়, আর মনে হয়—
আজকের এই অবহেলাও একদিন সাহিত্য হয়ে ফিরে আসবে।
--

মন্তব্য করুন

ব্লগ