প্রধান শিক্ষক
২৩ জুন, ২০২৬ ০৫:৪২ অপরাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক
বাংলা ভাষার প্রবাদ-প্রবচনগুলো শুধু ভাষার অলংকার নয়, এগুলো বাঙালির জীবনযাত্রা, অভিজ্ঞতা, রসবোধ ও লোকজ জ্ঞানের এক অমূল্য ভাণ্ডার। বহুল প্রচলিত একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রবাদ হলো— “ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর” অথবা “নামে তালপুকুর, ঘটি ডোবে না।” ব্যবহারিক অর্থে প্রবাদটির তাৎপর্য প্রায় সকলেরই জানা। বাহ্যিক চাকচিক্য বা নামের আড়ম্বর থাকলেও বাস্তবে যখন তার সামান্য যোগ্যতা বা উপযুক্ততাও থাকে না, তখন এই প্রবাদ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এর আক্ষরিক বা শাব্দিক অর্থ কী? বিশেষত, ‘তালপুকুর’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ কী? এ প্রশ্নটি খুব একটা আলোচিত হয় না।
অভিধানের ব্যাখ্যা : ‘তালপুকুর’ কি তালগাছঘেরা পুকুর?
বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান-এ ‘তাল’ শব্দের প্রথম অর্থের অধীনে ‘তালপুকুর’ শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে— “যে পুকুরের তীরে অনেক তালগাছ আছে।” অর্থাৎ, অভিধান অনুযায়ী তালপুকুর মানে তালগাছবেষ্টিত পুকুর।
অবশ্য এ অর্থটি গ্রহণ করতে গিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। যদি তালগাছের আধিক্যের কারণে পুকুরের নাম ‘তালপুকুর’ হয়ে থাকে, তাহলে আমগাছঘেরা পুকুরের নাম ‘আমপুকুর’, জামগাছঘেরা পুকুরের নাম ‘জামপুকুর’ বা ‘আমদিঘি’, ‘জামদিঘি’ ইত্যাদি শব্দ কেন বাংলা ভাষায় প্রচলিত হলো না? স্থাননাম হিসেবে বিচ্ছিন্নভাবে এমন নাম পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সাধারণ বিশেষ্য হিসেবে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার প্রায় অনুপস্থিত। ফলে ‘তালপুকুর’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে নতুনভাবে ভাবার অবকাশ থেকেই যায়।
‘তাল’ শব্দের আরেক অর্থ : গভীরতার একক
একই অভিধানে ‘তাল’ শব্দের আরেকটি অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে— “এক বিঘত বা অর্ধহস্ত পরিমাণ মাপ।” উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করা হয়েছে—
“চৌদ্দ তাল জলের মধ্যে ময়না আসন করিল।”
— মানিক রাজার গান
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখযোগ্য। মানিক রাজার গান মূলত রংপুর ও বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের ভাষায় রচিত একটি লোকগীতি-ধারা। ফলে সেখানে ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ নির্ধারণে সেই অঞ্চলের লোকভাষা ও প্রাচীন ব্যবহারকে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।“ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর” : প্রবাদের আক্ষরিক অর্থ
এই প্রেক্ষাপটে প্রবাদের আক্ষরিক অর্থ নতুনভাবে ধরা দেয়।
‘তালপুকুর’ যদি এমন একটি পুকুরকে বোঝায়, যার অন্তত এক ‘তাল’ গভীরতা রয়েছে, তাহলে “ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর”— কথাটির সরল অর্থ দাঁড়ায়—
যে পুকুরে একটি ঘটি ডোবানোর মতোও পানি নেই, সেই পুকুরেরই নাম রাখা হয়েছে ‘তালপুকুর’।
অর্থাৎ, নামের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার কোনো সামঞ্জস্য নেই। গভীরতার দাবিদার পুকুর বাস্তবে এতটাই অগভীর যে সেখানে একটি সাধারণ ঘটি পর্যন্ত ডোবে না। এখান থেকেই প্রবাদের ব্যঙ্গাত্মক তাৎপর্যের উদ্ভব— বাহ্যিক নাম বা পরিচয়ের সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার বিস্তর ফারাক।
সাহিত্যেও ‘তালপুকুর’ ও ‘তালদিঘি’
বাংলা সাহিত্যে ‘তালপুকুর’ ও ‘তালদিঘি’ শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়। কাজী নজরুল ইসলামের “লিচুচোর” কবিতায় ‘তালপুকুর’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে” কবিতায় ‘তালদিঘি’ শব্দের উপস্থিতি দেখা যায়। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী এগুলোকে তালগাছবেষ্টিত জলাশয় বলেই ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু লোকভাষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এ শব্দগুলোর মধ্যে গভীরতা বা আয়তনের ধারণাও নিহিত থাকতে পারে। অবশ্য এ বিষয়ে আরও ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
লোকভাষা বনাম অভিধান
ভাষার ইতিহাসে বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অভিধান কোনো শব্দের একটি প্রচলিত অর্থকে গ্রহণ করেছে, কিন্তু আঞ্চলিক বা প্রাচীন ব্যবহারে সেই শব্দের আরও ভিন্ন অর্থ রয়ে গেছে। লোকভাষা অনেক সময় অভিধানের চেয়েও প্রাচীন অর্থের স্মৃতি বহন করে। ‘তালপুকুর’ শব্দের ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনটি ঘটেছে। ‘তাল’ শব্দটি হয়তো প্রথমে গভীরতা বা পরিমাপবোধক অর্থে ব্যবহৃত হতো, পরে তালগাছ-সংক্রান্ত অর্থের প্রভাবেই ‘তালপুকুর’ শব্দের ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হয়েছে।
শেষকথা
“ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর”— এই বহুল ব্যবহৃত প্রবাদটি শুধু সামাজিক ব্যঙ্গ নয়, এর মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ পরিমাপ-পদ্ধতি ও ভাষার ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় অধ্যায়।
বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘তালপুকুর’-এর অর্থ “তালগাছঘেরা পুকুর” হিসেবে দেওয়া হলেও, উত্তরবঙ্গের লোকভাষা ও লোকসাহিত্যের আলোকে ‘তাল’ শব্দের গভীরতাসূচক অর্থ বিবেচনায় নিলে ‘তালপুকুর’-এর আরেকটি ব্যাখ্যা সামনে আসে— অন্তত এক ‘তাল’ গভীরতার পুকুর।
সুতরাং, ‘তালপুকুর’ শব্দের প্রকৃত ব্যুৎপত্তি ও অর্থ নিয়ে আরও অনুসন্ধান ও গবেষণার অবকাশ রয়েছে। কারণ ভাষা কেবল অভিধানের পৃষ্ঠায় আবদ্ধ নয়; মানুষের মুখে মুখে, লোকগানে, প্রবাদে, আঞ্চলিক ব্যবহারে এবং শতাব্দীপ্রাচীন স্মৃতিতে তার বহুস্তরীয় অর্থ ও ইতিহাস বেঁচে থাকে। আর সেই ইতিহাসের অনুসন্ধানই ভাষাচর্চার অন্যতম আনন্দ।
১
১ মন্তব্য