Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ জুন, ২০২৬ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

হিজরি সনের উৎপত্তি ও তাৎপর্য ...

মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। পৃথিবীর সকল হারানো সম্পদ একদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব হলেও চলে যাওয়া সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই ইসলাম সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং সময়ের যথাযথ ব্যবহারকে সফল জীবনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।’ (সূরা আল-আসর : ১-২)।
সময়ের এই গুরুত্ব উপলব্ধি করেই ইসলাম একটি স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেছে, যা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বর্ষপঞ্জির নাম হিজরি সন। হিজরি সন কেবল দিন-মাস-বছরের হিসাব রাখার মাধ্যম নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও সভ্যতার উত্থানের এক জীবন্ত দলিল।
হিজরি সনের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
হিজরি সনের সূচনা ইসলামের ইতিহাসের এক মহান ও যুগান্তকারী ঘটনাকে কেন্দ্র করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত মানব ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপ লাভ করেছে। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর খেলাফতকালে প্রশাসনিক প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর হিজরতকে ইসলামী সনের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ইতিহাসবিদ ইমাম তাবারী (রহ.) উল্লেখ করেন যে, সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতকেই ইসলামী বর্ষপঞ্জির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন (তারীখ আত-তাবারী, খ- ২)।
হিজরত, আত্মত্যাগ ও পরিবর্তনের প্রতীক : হিজরত শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়; বরং এটি ছিল ঈমান, আদর্শ ও সত্যের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের স্বার্থে জন্মভূমি, সম্পদ ও আত্মীয়স্বজন ত্যাগ করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে, তারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী।’ (সূরা আল-বাকারা: ২১৮)। এই হিজরতের ফলেই মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম আদর্শ রাষ্ট্র। সেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং মানবিক মর্যাদার এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়, যা আজও বিশ্বমানবতার জন্য অনুসরণীয়।
হিজরি সন ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা : ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও ইবাদত হিজরি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। রমজানের রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, আশুরার রোজা, আরাফার দিবস, যাকাতের হিসাব এবং ইদ্দতের সময়কাল—সবকিছুই হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তা মানুষের এবং হজের সময় নির্ধারণের মাধ্যম।’ (সূরা আল-বাকারা: ১৮৯)। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ করো।’ (সহীহ বুখারি)। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের সময়-ব্যবস্থা মূলত চান্দ্র বর্ষপঞ্জির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং হিজরি সন মুসলিম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুসলিম আত্মপরিচয় রক্ষায় হিজরি সনের ভূমিকা : বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মুসলমানরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পরিচয় সংকটের মুখোমুখি। আজ অনেক মুসলমান ইংরেজি সাল-তারিখ সম্পর্কে সচেতন হলেও হিজরি মাসগুলোর নাম এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। হিজরি সন মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা একটি বিশ্বজনীন মুসলিম উম্মাহর অংশ। আমাদের ইতিহাস ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় : হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। এজন্য পরিবার, মসজিদ, মাদরাসা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজরি সনের প্রচলন বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি নথিপত্রে হিজরি তারিখ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। পাশাপাশি সন্তানদের ইসলামী ইতিহাস ও হিজরতের শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। হিজরি নববর্ষকে আনন্দ-উল্লাসের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মসমালোচনা, তাওবা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুন সংকল্প গ্রহণের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
হিজরি সন কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আদর্শ ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ত্যাগ ছাড়া সফলতা আসে না, সংগ্রাম ছাড়া পরিবর্তন আসে না এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া প্রকৃত বিজয় অর্জিত হয় না। নতুন হিজরি বছর আমাদের জীবনে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, নৈতিকতা ও দ্বীনি চেতনার নতুন জাগরণ সৃষ্টি করুক। হিজরতের মহান শিক্ষা ধারণ করে আমরা যদি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায় ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে হিজরি সনের প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ