Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ জুন, ২০২৬ ০১:১৫ অপরাহ্ণ

দাম্পত্যের ভিত্তি-একপাক্ষিক নয়,পারস্পরিক🔹

🔹দাম্পত্যের ভিত্তি-একপাক্ষিক নয়,পারস্পরিক🔹

ভালোবাসা তখনই সুন্দর,যখন তা উভয় হৃদয়ে সমান মর্যাদা পায়। আর বিশ্বাস তখনই পবিত্র,যখন উভয়েই তাকে আমানত মনে করে রক্ষা করে।একপাক্ষিক ত্যাগ দিয়ে একটি সম্পর্ককে কিছুদিন টিকিয়ে রাখা যায়,একপাক্ষিক ভালোবাসা দিয়ে একটি সুস্থ দাম্পত্য গড়ে তোলা যায় না।

দাম্পত্য জীবন আল্লাহর একটি মহান নিয়ামত। কুরআন একে কেবল বৈবাহিক সম্পর্ক হিসেবে পরিচয় দেয়নি, বরং "মাওয়াদ্দাহ" (গভীর ভালোবাসা) এবং "রাহমাহ" (দয়া-মমতা)-র ওপর প্রতিষ্ঠিত এক প্রশান্তির নিবাস হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই সম্পর্কের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পরস্পরের জন্য নিরাপদ আশ্রয়,নির্ভরতার ঠিকানা এবং বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

বাস্তবতার আয়নায় আমরা ভিন্ন  চিত্র দেখি।

অনেক স্ত্রী আছেন, যারা স্বামীকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন।তাঁর সুখকে নিজের সুখ মনে করেন,তাঁর কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করেন।সংসার টিকিয়ে রাখতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন,নিজের অভিমান গোপন করেন,শত অবহেলা সহ্য করেন।স্বামীর সম্মান রক্ষার জন্য নিজের চোখের জলও মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেন।তিনি মনে করেন—"আজ না হয় কাল, আমার ভালোবাসা তাকে বদলে দেবে।"

কিন্তু সব গল্পের সমাপ্তি এমন হয় না।

কখনো কখনো সেই সীমাহীন ভালোবাসাই কিছু মানুষের কাছে অভ্যাসে পরিণত হয়। তারা ভাবতে শুরু করে—

"সে তো আমাকে ছেড়ে যাবে না।"

"যা-ই করি, সে ক্ষমা করে দেবে।"

"আমার জন্য এত কিছু করেছে, এখনো করবে।"

এভাবেই ভালোবাসার মর্যাদা ধীরে ধীরে কমে যায়,আর ভালোবাসার মানুষটি অবহেলার ভারে নিরবে ভেঙে পড়তে থাকেন।

এখানে কয়েকটি  প্রশ্ন জন্ম নেয়—

ভালোবাসা কি সবকিছু সহ্য করার নাম?

বিশ্বাস কি নিজের মর্যাদা বিসর্জন দেওয়ার নাম?

ধৈর্য কি অন্যায়কে স্থায়ীভাবে মেনে নেওয়ার নাম?


ইসলাম এসব প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত ভারসাম্যের সঙ্গে দিয়েছে।

ইসলাম স্বামীকে পরিবারের কর্ণধার করেছে, শাসক নয়।স্ত্রীকে অনুগত হতে বলেছে,কিন্তু অপমানিত হতে নয়। ধৈর্যের শিক্ষা দিয়েছে, জুলুমকে বৈধতা দেয়নি।ক্ষমার কথা বলেছে, খিয়ানতকে প্রশ্রয় দেয়নি। সংসার রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে,আত্মমর্যাদা ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়নি।

দাম্পত্যে একপাক্ষিক ভালোবাসা একটি মহৎ গুণ হতে পারে, কিন্তু সেটিকে যদি অপর পক্ষ দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তাহলে সেখানে শুধু একটি মানুষ নয়—আল্লাহর দেওয়া একটি পবিত্র আমানতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একটি সম্পর্ক তখনই সুস্থ থাকে, যখন ভালোবাসা উভয়ের, সম্মান উভয়ের, দায়িত্ব উভয়ের এবং জবাবদিহিতাও উভয়ের হয়।

একটি পাখি কখনো একটি ডানায় উড়তে পারে না।

একটি নৌকা একটি বৈঠা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।

একটি বৃক্ষ শুধু শিকড়ে বেঁচে থাকতে পারে না; তাকে শাখা-প্রশাখা, পাতা ও আলো—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

ঠিক তেমনি,একটি দাম্পত্যও শুধু একজনের ত্যাগ,একজনের কান্না,একজনের ধৈর্য কিংবা একজনের ভালোবাসার ওপর টিকে থাকতে পারে না। একজন যদি প্রতিদিন সম্পর্কটিকে নির্মাণ করেন, আর অন্যজন প্রতিদিন সেটিকে ভেঙে দেন,তবে একসময় সবচেয়ে শক্ত ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

আজ আমাদের সমাজে দুটি ভুল ধারণা পাশাপাশি চলছে।

একদল মনে করে—ভালোবাসা মানেই সবকিছু সহ্য করা।

আরেকদল মনে করে—সামান্য মতবিরোধ হলেই সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া।

ইসলাম এই দুই চরমপন্থার কোনোটিই সমর্থন করে না।

ইসলাম বলে—প্রথমে কথা বলো।

বোঝাও।

ক্ষমা করো।

সংশোধনের সুযোগ দাও।

প্রয়োজনে পরিবার ও সালিশের সহায়তা নাও।

বারবার দোয়া করো।

কিন্তু যদি দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা, অবিশ্বস্ততা, অপমান, নির্যাতন বা প্রকাশ্য অবাধ্যতা চলতেই থাকে এবং সংশোধনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে একজন মানুষকে সারাজীবন সেই জুলুমের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকারও নির্দেশ ইসলাম দেয়নি।

সবচেয়ে বড় কথা,দাম্পত্যে ভালোবাসা দাবি করার আগে ভালোবাসার যোগ্য মানুষ হওয়া জরুরি।

বিশ্বাস চাওয়ার আগে বিশ্বাসযোগ্য হওয়া জরুরি।

সম্মান পাওয়ার আগে সম্মান দিতে শেখা জরুরি।

কারণ যে স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসাকে দুর্বলতা মনে করেন, কিংবা যে স্ত্রী স্বামীর আন্তরিকতাকে অবহেলা করেন—তারা শুধু একজন মানুষকেই কষ্ট দেন ন, তারা আল্লাহর সামনে করা পবিত্র অঙ্গীকারের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করেন।

একপাক্ষিক ভালোবাসা সম্পর্কের সূচনা করতে পারে,দ্বিপাক্ষিক ভালোবাসাই তাকে স্থায়িত্ব দেয়।একপাক্ষিক বিশ্বাস চরিত্রের সৌন্দর্য প্রকাশ করে,দ্বিপাক্ষিক বিশ্বাসই একটি পরিবারকে নিরাপদ রাখে।

ভালোবাসা কখনো পাপের আশ্রয় হতে পারে না। যে ভালোবাসা মানুষকে তওবা,সংশোধন ও তাকওয়ার পথে ডাকে,সেটিই ইবাদত। আর যে ভালোবাসা সীমালঙ্ঘনকে নিরাপদ করে তোলে, সেটি ভালোবাসা নয়—আল্লাহর অর্পিত আমানতের প্রতি অবিচার এবং খেয়ানত।


ফারজানা পারভীন 

২৯/০৬/২০২৬ ইংরেজি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ