সহকারী শিক্ষক
৩০ জুন, ২০২৬ ০৫:২৬ অপরাহ্ণ
নরহা চৌধুরী বাড়ির অন্যতম দুই নক্ষত্র
মরহুম মাওলানা ওবায়দুল হক চৌধুরী পীর সাহেব আমার শ্রদ্ধেয় পিতা। আমার দাদা উজানীর ক্বারী মরহুম ইয়াকুব আলী চৌধুরী যিনি ক্বারী ইবরাহীম সাহেবের সরাসরি ছাত্র।
**শিক্ষায় পিতা ও দাদার অবদান: একটি প্রেরণাদায়ী বাস্তবতা**
শিক্ষা মানুষের জীবনের ভিত্তি। কিন্তু এই শিক্ষার পেছনে যে নীরব প্রেরণা, ত্যাগ ও অবদান থাকে, তার অন্যতম প্রধান দুই স্তম্ভ হল পিতা ও দাদা। একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠনে, নৈতিকতা নির্মাণে এবং ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে এই দুই প্রজন্মের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর ও স্থায়ী। পরিবারই প্রথম বিদ্যালয়, আর সেই বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক হলেন পিতা ও দাদা।
পিতা সাধারণত পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি সন্তানের পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় বই, খাতা, টিউশন ফি থেকে শুরু করে ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। অনেক সময় নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলস পরিশ্রম করেন। একজন শিক্ষিত পিতা শুধু অর্থ জোগান দেন না, তিনি সন্তানকে সময় ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ববোধ শেখান। পরীক্ষায় ভালো ফল করার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা দেন তিনিই।
অন্যদিকে, দাদার অবদান অনেক সময় সরাসরি দেখা না গেলেও তা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। দাদা পরিবারের ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষা সন্তানের মধ্যে সঞ্চার করেন। তিনি প্রজন্মের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। অনেক পরিবারে দেখা যায়, দাদা নাতিকে প্রথম অক্ষর চেনানো থেকে শুরু করে ধর্মীয় শিক্ষা, গল্পের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা এবং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেখান। তাঁর জীবন অভিজ্ঞতা সন্তানের চিন্তাধারাকে সমৃদ্ধ করে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে পিতা ও দাদার সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতা যদি হয় ভবিষ্যতের পরিকল্পনাকারী, তবে দাদা হলেন অতীতের অভিজ্ঞতার ভান্ডার। এই দুইয়ের মিলনে একজন শিক্ষার্থী সঠিক দিকনির্দেশনা পায়। যেমন, পিতা বলেন কীভাবে পড়াশোনা করে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে, আর দাদা বলেন কীভাবে চরিত্র ভালো রেখে জীবনকে অর্থবহ করা যায়। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় একজন শিক্ষার্থীকে ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
গ্রামীণ সমাজে এই ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে সেখানে শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকে। তখন দাদার উৎসাহ ও পিতার ত্যাগ একত্রে সন্তানের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেয়। দাদা নাতিকে স্কুলে যেতে উৎসাহ দেন, আর পিতা সেই শিক্ষার খরচ বহন করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই অনেক দরিদ্র পরিবার থেকেও মেধাবী শিক্ষার্থী উঠে আসে।
বর্তমান আধুনিক যুগে প্রযুক্তির কারণে পারিবারিক বন্ধন কিছুটা দুর্বল হলেও পিতা ও দাদার ভূমিকা এখনো অপরিবর্তিত। বরং এখন তাদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। কারণ সন্তানরা এখন মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানা ধরনের তথ্যের মুখোমুখি হয়, যার মধ্যে ভালো-মন্দ দুই-ই থাকে। তাই পিতা ও দাদা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা না দেন, তবে শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
একটি সফল শিক্ষাজীবনের পেছনে শুধু বিদ্যালয় বা শিক্ষক নয়, বরং পরিবারের এই দুই স্তম্ভ—পিতা ও দাদা—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের ভালোবাসা, ত্যাগ ও দিকনির্দেশনা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু ডিগ্রিধারী নয়, বরং একজন সৎ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায় যখন তার সঙ্গে পরিবার, বিশেষ করে পিতা ও দাদার অবদান যুক্ত হয়। এই অবদান শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, বরং ভবিষ্যৎ গড়ার শক্তিশালী ভিত্তি।
১৪
২৪ মন্তব্য