সহকারী অধ্যাপক
৩০ জুন, ২০২৬ ০৯:৪৭ অপরাহ্ণ
চন্দ্র-সূর্যের আনুগত্য - মোঃ মুজিবুর রহমান
চন্দ্র-সূর্যের আনুগত্য
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
আকাশজোড়া সূর্য ওঠে নির্ধারিত সেই ক্ষণে,
একটুও সে দেরি করে না যুগের পর যুগ গুণে।
পূর্ব দিগন্ত আলোকিত করে কর্মমুখর ভোর,
রবের হুকুম মানতে গিয়ে ক্লান্তি জানে না সে ঘোর।
চাঁদও আসে আপন কক্ষপথে নিঃশব্দ শোভাযাত্রায়,
অন্ধকারে স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দেয় বিশ্বজগতের গাত্রায়।
ক্ষয়-বৃদ্ধির বিধান মেনে ঘোরে অবিরাম,
এক মুহূর্তও ভোলে না সে প্রভুর অমল নাম।
দিনের পরে রাত আসে, রাতের পরে দিন,
অবিচল সেই নিয়মে নেই কোনো অবহেলন।
ঋতুর পরে ঋতু আসে আপন নির্ধারিত কালে,
সৃষ্টিজগৎ তাসবীহ গায় নীরব ভাষার ছলে।
মেঘ উড়ে যায় আদেশ পেয়ে দূর সমুদ্র-পানে,
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে শুকনো মাঠের টানে।
বাতাস বয়ে প্রাণ জাগায় অগণিত প্রাণীতে,
সবই চলে মহান রবের নির্ধারিত বিধিতে।
নদী জানে সাগরপথ, থামে না কোনো ক্ষণে,
পাহাড় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেয় প্রভুর মহিমাগুণে।
ফুলের হাসি, ফলের ঘ্রাণ, শস্যের সোনার ঢেউ,
সবাই যেন বলে উঠে—"আমাদের রব এক, আর কেউ নয়।"
পাখির কূজন ভোরের বেলা, মৌমাছির গুঞ্জন,
সবই যেন বন্দনা করে মহান সৃষ্টিকর্তার গুণ।
ক্ষুদ্র পিঁপড়া, বিশাল হাতি, নীল সাগরের তিমি,
প্রত্যেক প্রাণই পালন করে আপন দায়িত্ব ভূমি।
তখন আমি মানুষ হয়ে দাঁড়াই নীরব মনে,
নিজেকেই প্রশ্ন করি অন্তরের গভীর কোণে—
চন্দ্র-সূর্য যদি পারে পালন করতে বিধান,
আমি কেন হারাই পথে, ভুলি প্রভুর আহ্বান?
আমাকেই তো দিয়েছেন তিনি জ্ঞান-বিবেকের আলো,
সত্য-মিথ্যা চিনবার শক্তি, উত্তম পথের পালো।
আমাকেই তো শিখিয়েছেন ন্যায়ের পথে চলা,
তবু কেন অন্যায়ের কাছে দিই বিবেকটা বেচা?
আমার মুখে কত যে কথা, কত অকারণ রাগ,
অহংকারে ঢেকে ফেলি হৃদয়ের শুভ ফাগ।
লোভের টানে ভুলে যাই কত মানুষের হক,
নিজের লাভেই ব্যস্ত থাকি, সংকুচিত সব লোক।
চন্দ্র তো নেয় না কারো হক, সূর্য করে না ছল,
নদী কখনো মাপে না জল স্বার্থের দাঁড়িপাল্লায় চল।
গাছ ফল দেয় নীরব মনে, চায় না কোনো দাম,
মানুষ হয়েও আমি কেন চাই শুধু নিজের নাম?
আমার হাতে অর্পিত ছিল আমানতের ভার,
সত্য, ন্যায় আর মানবতার আলোকিত উপহার।
সেই আমানত রক্ষা করতে কতবার হলাম ক্ষীণ,
নিজের ভুলেই হারিয়ে ফেলি অন্তরের রঙিন দিন।
পৃথিবী তো ক্ষণিকেরই এক পরীক্ষার ঘর,
চিরস্থায়ী ঠিকানা নয় এ সুখের ক্ষণভর।
আজ যে শক্তি, আজ যে গৌরব, আজ যে অর্থ-মান,
সবই একদিন ফেলে যেতে হবে নির্জন অজান।
চন্দ্র-সূর্য শেখায় আমায় সময়ের মূল্য কত,
একটি মুহূর্ত নষ্ট করলে ফেরে না সে রত্ন।
প্রতিটি দিনই নতুন সুযোগ সৎকর্ম বুনে যাওয়ার,
অন্ধকারে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে পথ দেখানোর।
যদি কথা বলি, বলি যেন সত্য আর মধুর,
যদি লিখি, লিখি যেন কল্যাণেরই সুর।
যদি শক্তি পাই, দুর্বলের পাশে দাঁড়াই দৃঢ় প্রাণে,
মানুষ হবার অর্থ খুঁজি মানবতার টানে।
যদি ধন পাই, ভাগ করি তা অভাবীরই সাথে,
যদি জ্ঞান পাই, ছড়িয়ে দিই আলোর দীপ হাতে।
যদি নেতৃত্ব আসে কোনোদিন দায়িত্বের ডাকে,
ন্যায়ের পতাকা উঁচু রাখি সত্যের অটল পাকে।
চন্দ্র-সূর্য কাউকে দেখে থামে না পথচলা,
অবিরামই শিক্ষা দেয় কর্তব্যেরই বলা।
মানুষ হয়ে আমিও যেন থেমে না যাই আর,
সৎকর্মে কাটাই জীবনভর প্রতিটি অঙ্গার।
নিজেকে শুধু প্রশ্ন করি প্রতিটি দিনের শেষে—
আজকে আমি কী দিলাম এই পৃথিবীর দেশে?
কারো মুখে ফুটল কি হাসি আমার আচরণে?
কারো হৃদয় জুড়াল কি আমার মধুর বচনে?
আমি কি ছিলাম সত্যবাদী, ছিল কি বিনয় প্রাণে?
ক্ষমা করতে পেরেছি কি অপমানের টানে?
অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছি কি সত্য কথা?
নাকি ভয়ে নীরব থেকেছি হারিয়ে নীতির ব্যথা?
চন্দ্র-সূর্য আজও চলে মহান রবের তরে,
কখনো তারা অবহেলা করে না তাঁর দ্বারে।
সৃষ্টির সেরা মানুষ আমি—এ শুধু মর্যাদা নয়,
এ যে মহাদায়িত্ব, এ যে আমানত অক্ষয়।
এসো তবে জাগাই প্রাণে ঈমানেরই আলো,
সত্য, ন্যায় আর দয়ার পথে চলি নির্ভয় ভালো।
মানুষ যেন মানুষ হয় চরিত্রের মহিমায়,
করুণা, প্রেম আর ন্যায়বোধে জীবন সুধাময়।
চন্দ্র বলে—"সময় মানো, অলসতায় নয় হার,"
সূর্য বলে—"আলো ছড়াও, দূর করো অন্ধকার।"
পৃথিবী বলে—"সৎকর্ম রেখে যেও আমার বুকে,"
আকাশ বলে—"মাথা নত করো স্রষ্টারই সুখে।"
তখন মানুষ উত্তর দিক কর্মের ভাষায় ধীর—
"হে মহান প্রতিপালক, রাখুন আমায় স্থির।
আপনারই দেওয়া জীবন আপনারই পথে কাটে,
সত্য, ন্যায় আর কল্যাণ যেন ফুটে ওঠে হাতে।
চন্দ্র-সূর্য যেমন সদা পালন করে হুকুম,
আমার জীবনও হোক তেমনি আনুগত্যের সুমধুর ধ্বনি।
মানবতার শ্রেষ্ঠ মর্যাদা রক্ষা করি প্রাণে,
আপনার সন্তুষ্টিই হোক জীবনের শেষ গানে।
যেদিন শেষ সূর্যাস্ত হবে আমার এ জীবনে,
যেন বলতে পারি শান্ত হৃদয়, নির্ভীক অন্তরমনে—
"যতটুকু শক্তি দিয়েছিলেন, ততটুকুই করেছি সাধ,
আপনারই সন্তুষ্টি ছিল আমার সকল সাধ।
চন্দ্র-সূর্য সাক্ষী থাকুক, আকাশ-জমিনও জানুক,
সৃষ্টির সেরা হওয়ার অর্থ কর্মেই যেন মানুক।
ইবাদত, ন্যায়, দয়া, প্রেমে হোক জীবনের জয়—
প্রভুর আনুগত্যেই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।"
***
চন্দ্র-সূর্যের আনুগত্য
পূবের আকাশ রাঙিয়ে দিয়ে সূর্য ওঠে হেসে,
কর্মের ডাক শোনায় সে যে প্রতিটি পরিবেশে।
বলে—"সময় অমূল্য ধন, হারিও না হেলায়,
কল্যাণেরই বীজ বপন করো প্রতিটি বেলায়।"
চাঁদ বলে—"শীতল হও, ক্ষমার আলো বিলাও,
অন্ধকারে পথহারা প্রাণে আশার প্রদীপ জ্বালাও।
আলো যতই ক্ষীণ হোক না, তবু নিভে যেও না,
সত্যের পথে অবিচল থেকে অন্যায়ে নত হয়ো না।"
তারারা সব জ্বলে উঠে নীল গগনের বুকে,
যেন লিখে যায় আনুগত্য অগণিত অক্ষর মেখে।
প্রত্যেকটি দীপ্ত বিন্দু একেকটি শিক্ষা দেয়,
ছোট্ট কাজও মহান হয়ে মানবহৃদয় ছুঁয়ে যায়।
পাহাড় বলে—"অটল থেকো সত্যের দৃঢ় পথে,
ঝড় এলে ভেঙে পড়ো না কোনো ভয় বা শঙ্কাতে।
ধৈর্যের চূড়া যত উঁচু, তত গভীর শিকড়,
ধৈর্যধারী মানুষই পায় সফলতারই ঘর।"
নদী বলে—"চলতে শেখো থেমে থেকো না আর,
চলার মাঝেই জীবনের সব সৌন্দর্যের দ্বার।
নিজেকে শুধু নিজের মাঝে আটকে রেখো না,
সাগরের মতো উদার হতে কখনো ভুলো না।"
বৃক্ষ বলে—"দিতে শেখো, এটাই জীবনের গান,
ফল আর ছায়া বিলিয়ে দিই, নেই কোনো অভিমান।
পাথর ছুঁড়ে মারলেও আমি ফলই দিই হাতে,
উত্তম চরিত্র এমনই হয় প্রতিটি প্রভাতে।"
মাটি বলে—"বিনয় শেখো, অহংকারে নয়,
আমার বুকেই রাজা-ভিখারি সবার শেষ আশ্রয়।
যে যত বড় মনে করে আপন পরিচয়,
শেষে সবার পরিচয় শুধু কর্মেরই পরিচয়।"
সমুদ্র বলে—"গভীর হও জ্ঞান আর প্রজ্ঞায়,
অল্প জেনে অহংকারে ভেসো না মিথ্যায়।
নীরবতার মাঝেও লুকায় অসীম শক্তির ধারা,
শান্ত হৃদয়েই জাগে সত্যের নির্মল জ্যোৎস্নাপাড়া।"
আমি তখন নত নয়নে ভাবি আপন প্রাণ,
কতটুকু পূরণ করেছি স্রষ্টা-দেওয়া দান?
কতটুকু করেছি ন্যায়ের পথে অবিচল গমন?
কতটুকু করেছি মানুষের কল্যাণে জীবন?
শুধু নিজের সুখের তরে কাটালে যদি কাল,
মানবজন্ম পাবে কি তার সত্যিকারই ফল?
যে হাতে পারত মুছতে কারো চোখের জলের রেখা,
সে হাত যদি আঘাত দেয়, তবে কী রইল দেখা?
যে মুখ হতে ফুটতে পারত আশার মধুর বাণী,
সেই মুখ যদি ছড়ায় শুধু বিদ্বেষেরই টানি—
তবে সে মুখের সৌন্দর্য আর কিসে হবে ধন্য?
মধুর বচনই মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার গণ্য।
জ্ঞান যদি হয় কেবল নিজের গৌরবেরই সিঁড়ি,
তবে সে জ্ঞান আলোক নয়, অন্ধকারেরই ভিড়ি।
যে জ্ঞান মানুষ গড়ে তোলে, সত্যের পথ দেখায়,
সেই জ্ঞানই যুগে যুগে সভ্যতার দীপ জ্বালায়।
শক্তি যদি দুর্বলেরে করে শুধু পরাজিত,
সে শক্তি নয়, অন্যায়ের নির্মম অশুভ নীত।
শক্তি তখনই মহিমান্বিত, যখন ন্যায়ের তরে,
দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ায় সাহস ভরে।
ধন যদি শুধু নিজের ঘরে জমে স্তূপের মতো,
ক্ষুধার্ত মুখে না পৌঁছায়, বৃথাই তার যত।
ভাগ করে নেওয়ার মাঝেই সম্পদের সম্মান,
দানেই ধন পায় মহিমা, পায় সত্য পরিচয়দান।
জীবন এক অর্পিত দান, নয় তো চিরবাস,
প্রতিটি শ্বাস মনে করায় ক্ষণিক এ নিঃশ্বাস।
আজ যে আছি, কাল নাও থাকি এই ধরণীর বুকে,
তাই তো সৎকর্ম রেখে যাই মানবতার সুখে।
চন্দ্র-সূর্য থামবে না কোনো মানুষের তরে,
তাদের গতি অবিরাম প্রভুরই আদেশ ধরে।
কিন্তু মানুষ থেমে যাবে এক নির্ধারিত ক্ষণে,
থাকবে শুধু কর্মগুলো অনন্ত স্মরণে।
তাই এসো আজ প্রতিজ্ঞা করি অন্তরেরই মাঝে,
সত্যের প্রদীপ নিভতে দেব না জীবনের সাজে।
ইবাদতে থাকুক হৃদয়, কর্মে থাকুক ন্যায়,
মানবসেবায় ফুটুক যেন জীবনের পরিচয়।
যেখানে আছে অশিক্ষা, জ্বালাই জ্ঞানের দীপ,
যেখানে আছে বিভেদ, গড়ি ভ্রাতৃত্বের নীড়।
যেখানে আছে অবিচার, বলি সত্য নির্ভয়ে,
যেখানে আছে অন্ধকার, আলো জ্বালি হৃদয়ে।
চন্দ্র শেখাক নম্রতা, সূর্য শেখাক তেজ,
পাহাড় শেখাক দৃঢ়তা, নদী শেখাক বেগ।
বৃক্ষ শেখাক দানশীলতা, মাটি শেখাক লাজ,
এই শিক্ষাতেই গড়ে উঠুক মানবতার সাজ।
হে মহান প্রতিপালক!
আপনি যাঁর নির্দেশে সূর্য ওঠে, চাঁদ চলে,
আপনি যাঁর হুকুমে নদী বয়, ফুল হাসে দোলে—
আমাদেরও দিন এমন হৃদয়, এমন নির্মল প্রাণ,
যেখানে থাকবে আপনার প্রতি অকৃত্রিম সম্মান।
আমাদের কথা হোক সত্যের, কাজ হোক কল্যাণ,
চরিত্র হোক সুবাসিত, নির্মল হোক প্রাণ।
মানুষ হয়ে যেন মানুষই থাকি আমৃত্যু,
আপনার সন্তুষ্টিতেই হোক জীবনের পরিণতি।
যেদিন পৃথিবীর পথ শেষ হবে নীরব সন্ধ্যায়,
চন্দ্র-সূর্য চলবে তখনও তাদের চিরপ্রভায়।
সেদিন যেন বলতে পারি বিনত হৃদয় ভরে—
"হে আমার রব! যতটুকু পেরেছি, চলেছি আপনারই পথে।
আপনি দিয়েছিলেন জীবন, ফিরিয়ে দিলাম তাই,
আপনার সন্তুষ্টির চেয়ে বড় আর কিছু নাই।
চন্দ্র-সূর্য যেমন সদা আপনারই অনুগত,
আমার জীবনও তেমনি হোক আপনারই ইবাদত।"
এই হোক মানুষের শপথ,
এই হোক জীবনের গান,
সৃষ্টির সেরা হওয়ার মানে—
স্রষ্টার পথে অবিচল প্রাণ।
চন্দ্র-সূর্য চলুক যেমন অবিরাম আনুগত্যে,
মানুষ চলুক তেমনি ন্যায়, দয়া আর সত্যে।
কর্মে ফুটুক ঈমানের দীপ, চরিত্রে সৌন্দর্যের পরিচয়—
প্রভুর সন্তুষ্টিই হোক মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়।
১৪
২৪ মন্তব্য