Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ জুলাই, ২০২৬ ০৬:০২ অপরাহ্ণ

ক্যারিয়ার নির্বাচন: আমি কে, কী হতে চাই?

নাসিমা ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে একটি স্বপ্ন লালন করে আসছে, বড় হয়ে সে নার্সিং পড়ে মানুষের সেবা করবে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তার মা-বাবা তাকে নার্সিং পড়াতে কোনোভাবেই রাজি নন। তারা নার্সিং পেশাকে ভিন্ন চোখে দেখেন। মা-বাবার মতামতের ভিত্তিতে সে একটি বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স করে চাকরি খুঁজতে থাকে। এ যোগ্যতা নিয়ে কোন পেশায় যাবে, তা নির্ধারণ করতে পারে না। তার মনে সেই লালিত স্বপ্ন উঁকি দেয়। বার বার চেষ্টা করেও কোনো চাকরি পায়নি। 

সায়মন স্কুলে পড়তেই বাড়িতে ইলেক্ট্রনিক জিনিস নিয়ে ব্যস্ত থাকত বাড়ির টিভি, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা নিজে নিজে সারাতে পারত। তার প্রবল ইচ্ছা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিষয়ে পড়ালেখা করবে; কিন্তু তার বাবা-মার ইচ্ছা তাকে ডাক্তারি পড়াবেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর মা-বাবার ইচ্ছায় সে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়। কোনোভাবেই সে ডাক্তারি পড়ায় মন বসাতে পারে না। কয়েকবার ড্রপ দিয়ে সে আট বছরে এমবিবিএস পাস করে। এভাবে আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের চাপে নিজের ক্যারিয়ার গঠনে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া সঠিক ক্যারিয়ার নির্বাচন করতে না পেরে জীবনকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো ক্যারিয়ার নির্বাচন। কারণ একটি পেশা শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি একজন মানুষের পরিচয়, জীবনযাপন, মানসিক তৃপ্তি এবং সমাজে অবদানের ক্ষেত্র তৈরি করে; কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষার্থী নিজের প্রকৃত আগ্রহ ও সক্ষমতা না বুঝেই শুধু সামাজিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা কিংবা অন্যের সাফল্য দেখে ক্যারিয়ার নির্বাচন করে ফেলে। ফলে অনেক সময় তারা এমন একটি পথে এগিয়ে যায়, যেখানে যোগ্যতা থাকলেও আনন্দ ও আত্মতৃপ্তির অভাব থেকে যায়। 

ক্যারিয়ার নির্বাচনের আগে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিজেকে জানা। যে ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে জানে না, নিজেকে চেনে না, তার পক্ষে নিজের জন্য সঠিক পথ নির্বাচন করা কঠিন। পৃথিবীর সফল মানুষের জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষা করেননি, নিজেদের শক্তি, দুর্বলতা, আগ্রহ ও লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করেছেন। তাই একজন শিক্ষার্থীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘আমি কী হতে চাই?’ এর আগে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ‘আমি আসলে কে?’

প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘কোন কাজ করতে গিয়ে আমি সময়ের কথা ভুলে যাই?’

মানুষ সাধারণত সেই কাজেই বেশি ভালো করতে পারে, যে কাজে তার প্রকৃত আগ্রহ রয়েছে। কেউ হয়তো সমস্যার সমাধান করতে ভালোবাসে, কেউ নতুন কিছু তৈরি করতে পছন্দ করে, কেউ মানুষের সঙ্গে কাজ করতে আনন্দ পায়, আবার কেউ গবেষণা বা সৃজনশীল কাজে আগ্রহী। নিজের স্বাভাবিক আগ্রহ বোঝা ক্যারিয়ার নির্বাচনের প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ‘আমার স্বাভাবিক দক্ষতা বা শক্তির জায়গা কোথায়?’

সব মানুষের প্রতিভা এক রকম নয়। কেউ গণনা ও বিশ্লেষণে দক্ষ, কেউ নেতৃত্ব দিতে পারে, কেউ সুন্দরভাবে কথা বলতে পারে, কেউ সৃজনশীল চিন্তায় এগিয়ে। অনেক সময় একজন শিক্ষার্থী শুধু নম্বরের ভিত্তিতে নিজের যোগ্যতা বিচার করে; কিন্তু বাস্তবে দক্ষতার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। নিজের শক্তির জায়গা খুঁজে বের করা একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

তৃতীয় প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘আমি কী ধরনের জীবন চাই?’

ক্যারিয়ার শুধু চাকরির নাম নয়; এটি জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি। কেউ গবেষণামূলক জীবন পছন্দ করতে পারে, কেউ মানুষের সেবা করতে চায়, কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায়, আবার কেউ নেতৃত্বের জায়গায় যেতে চায়। তাই শুধু জনপ্রিয় পেশা নয়, নিজের কাঙ্ক্ষিত জীবনধারার সঙ্গেও ক্যারিয়ারকে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

চতুর্থ প্রশ্ন ‘আমি সমাজের কোন সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে চাই?

একটি অর্থবহ ক্যারিয়ার শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য দেয় না, সমাজেও অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করে। একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন রক্ষা করেন, একজন শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করেন, একজন প্রকৌশলী নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেন, একজন উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। নিজের কাজের মাধ্যমে কী পরিবর্তন আনতে চাই এই চিন্তা ক্যারিয়ারকে আরও অর্থবহ করে।

পঞ্চম প্রশ্ন ‘আমি কি শুধু অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই, নাকি নিজের সম্ভাবনা বিকাশ করতে চাই?’

অনেক শিক্ষার্থী বন্ধু, পরিবার বা সমাজের প্রভাবের কারণে এমন পেশা বেছে নেয়, যা তার নিজের স্বপ্নের সঙ্গে মেলে না। পরিবারের পরামর্শ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের সক্ষমতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ জীবনযাপন করতে হবে সেই ব্যক্তিকেই, যে ক্যারিয়ার নির্বাচন করছে।

ষষ্ঠ প্রশ্ন ‘ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এই পেশার প্রয়োজনীয়তা কী থাকবে?’

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক পেশার ধরন পরিবর্তন করছে। তাই একজন আধুনিক শিক্ষার্থীকে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও চিন্তা করতে হবে। কোন দক্ষতাগুলো আগামী দিনে প্রয়োজন হবে তা বোঝা জরুরি।

সপ্তম প্রশ্ন ‘আমি কি শেখার জন্য প্রস্তুত?’

কোনো ক্যারিয়ারই একবার নির্বাচন করলেই শেষ নয়। সফল মানুষ সবসময় নতুন কিছু শেখেন, নিজেদের দক্ষতা উন্নত করেন। তাই একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।

নিজেকে আবিষ্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করা। নিজের সীমাবদ্ধতা জানা মানে পিছিয়ে থাকা নয়। এটা উন্নতির সুযোগ তৈরি করার পথ। যে শিক্ষার্থী জানে কোথায় তার ঘাটতি রয়েছে, সে পরিকল্পনা করে সেই জায়গায় উন্নতি করতে পারে।

ক্যারিয়ার নির্বাচন কোনো তাড়াহুড়ার সিদ্ধান্ত নয়; এটি আত্ম-অনুসন্ধানের একটি প্রক্রিয়া। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু ‘কোন পেশায় বেশি আয় আছে?’ এ প্রশ্নের মধ্যে আটকে না থেকে ভাবতে হবে ‘কোন কাজ আমাকে দক্ষ, আনন্দময় ও অর্থবহ জীবন দেবে?’ কারণ প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন একজন মানুষ নিজের ক্ষমতাকে চিনে সেই ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারে।

‘নিজেকে আবিষ্কার করতে পারা একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় অর্জন; কারণ নিজের পরিচয় জানা মানুষই নিজের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে সুন্দরভাবে নির্মাণ করতে পারে।’

লেখক: সাহেদ আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা কলেজ।

মন্তব্য করুন

ব্লগ