Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ জুলাই, ২০২৬ ০৬:১২ পূর্বাহ্ণ

সর্বোত্তম সৃষ্টি: চিরস্থায়ী পুরস্কার - মোঃ মুজিবুর রহমান


সর্বোত্তম সৃষ্টি: চিরস্থায়ী পুরস্কার

(সূরা আত-তীন:৪–৬)

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

স্রষ্টা যখন মানুষ গড়েন
অপরূপ এক শিল্পে,
মাটির মাঝে প্রাণের আলো
ফুটে ওঠে অনুপম রূপে।

কত বিস্ময় দেহের ভাঁজে,
কত রহস্য মনে,
জ্ঞান, বিবেক, প্রেম আর মায়া—
রেখেছেন কত সনে।

দুটি চোখে দেখার শক্তি,
দুটি কানে ধ্বনি,
একটি হৃদয় সত্য বোঝার,
একটি মুখে বাণী।

ভাবতে দিলেন, বুঝতে দিলেন,
করতে দিলেন বিচার,
হকের পথে চলার তরে
খুলে দিলেন দ্বার।

বললেন তিনি—
"
পৃথিবীতে এসো,
ন্যায়ের পথে চলো;
আমার দেওয়া নেয়ামতের
শুকরিয়া তুমি বলো।"

কিন্তু মানুষ ভুলে যায়
কত সহজে সব,
ক্ষণিক সুখের মোহে ডুবে
ভুলে যায় তার রব।

ক্ষমতার নেশা, ধনের গর্ব,
অহংকারের ডালি,
দুনিয়ারই রঙিন মেলায়
হারায় জীবনের কালি।

যে বিবেক ছিল আলোর প্রদীপ,
ধীরে ধীরে নিভে যায়,
সত্যের ডাকে সাড়া না দিয়ে
মিথ্যার দলে মিলায়।

যে হৃদয় ছিল কোমল একদিন,
হয়ে ওঠে কঠিন,
করুণা শুকায়, দয়া হারায়,
অন্ধ হয় অন্তরচিন।

তখন মানুষ নামেই মানুষ,
আচরণে নয়;
নিজের হাতে নিজের মর্যাদা
নিজেই করে ক্ষয়।

যে উচ্চতায় ছিল তার স্থান,
সেখান থেকে নেমে
নিজেরই কর্মে পৌঁছে যায় সে
অবনতির ভীষণ ক্ষেমে।

কেউ বলেন—
এ জীবনের শেষ প্রহরে
শক্তি যখন ক্ষয়,
স্মৃতি মুছে, দেহ নুয়ে পড়ে,
চলার সামর্থ্য নয়।

কেউ বলেন—
অবাধ্য প্রাণের শেষ ঠিকানা
জাহান্নামের তল,
অকৃতজ্ঞতার কঠিন শাস্তি,
ন্যায়বিচারের ফল।

অর্থ ভিন্ন হলেও সবার মাঝে
একই শিক্ষা রয়—
রবের দেওয়া শ্রেষ্ঠ মর্যাদা
হারিও না যেন কভু।

কিন্তু আশা নিভে যায় না,
রহমতের দ্বার খোলা;
যারা ঈমানে জীবন সাজায়,
তাদের ভাগ্য ভোলা?

যারা সত্যকে ভালোবেসে
সৎকর্মে দিন কাটায়,
অন্ধকারের প্রতিটি পথে
আলোর প্রদীপ জ্বালায়।

যারা গোপনে দান করে,
লোকদেখানো নয়,
মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ায়,
সান্ত্বনা দিয়ে কয়—

"ধৈর্য ধরো,
রব আছেন,
তিনি দেখেন সব;
অশ্রুবিন্দুও হারায় না
করুণাময়ের রব।"

যারা নামাজে মাথা নোয়ায়,
সিজদায় খোঁজে নূর,
হৃদয় ভরে স্মরণ করে
দয়াময়ের সুর।

যারা পাপে লজ্জা পায়,
ফিরে আসে তাওবায়,
রাতের নীরব কান্নাধ্বনি
আকাশ ছুঁয়ে যায়।

যারা বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে গিয়েও
ভালোবাসে দীন,
অক্ষম হলেও হৃদয়জুড়ে
জাগে ঈমানের ঋণ।

হাত কাঁপে,
পা আর চলে না,
চোখের আলো ক্ষীণ;
তবু অন্তরে জাগে যে আলো,
তা থাকে অমলিন।

করতে পারে না আগের মতো
অসংখ্য সৎকাজ,
তবু রবের অশেষ দয়ায়
থামে না প্রতিদান আজ।

যে পথে ছিল অবিচল সে,
যে আমলে ছিল স্থির,
রহমতের সেই লিখনখানায়
রয় তার অক্ষয় নীর।

রোগে শয্যা,
দূর সফরে,
ক্লান্ত শরীর যখন,
তবুও রবের হুকুমে লেখা হয়
পূর্বের নেক আমল তখন।

কী অপরূপ সেই দয়া,
কী অপার অনুগ্রহ!
মানুষ থামে,
রবের দান
থামে না এক মুহূর্তও।

এমন প্রতিদান,
যার নেই শেষ,
নেই কোনো অবসান;
সময়ের স্রোত ফুরিয়ে গেলেও
ফুরায় না সম্মান।

না তাতে ক্ষয়,
না তাতে ভয়,
না বিচ্ছেদের রাত;
চিরসুখের জান্নাতজুড়ে
অবিরাম নেয়ামত।

হে মানুষ,
মনে রেখো আজ,
জন্ম তোমার বৃথা নয়;
সর্বোত্তম রূপের মর্যাদা
রক্ষা করাই পরিচয়।

দেহের সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী,
ঈমান থাকে চির;
সৎকর্মই মানুষের জীবনে
রেখে যায় আলোর নীড়।

তাই অহংকার নয়,
কৃতজ্ঞ হও,
রবের পথে চলো;
প্রতিটি নিশ্বাস,
প্রতিটি ক্ষণ
সত্যের প্রদীপ জ্বালো।

যে রব তোমায় গড়েছেন
সর্বোত্তম রূপে,
তাঁরই ডাকে ফিরো আবার
ভালোবাসার স্রোতে।

যেন শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে
ভয় না জাগে প্রাণে,
বরং হাসিমুখে শুনতে পাও
রহমতেরই গানে—

**"এসো আমার বান্দা,
আজ সকল ক্লান্তি শেষ;
তোমার ঈমান, তোমার সৎকর্ম—
হারায়নি কখনো রেশ।

আমি রেখেছি সবই গণে,
ফেলিনি কিছু দূরে;
নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার আজ
তোমারই জন্য সুরে।

চিরশান্তির জান্নাতভূমি
খুলে দিলাম দ্বার;
আমার সন্তুষ্টিই আজ
তোমার শ্রেষ্ঠ উপহার।"**

***

সর্বোত্তম সৃষ্টি, নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার

সৃষ্টির প্রভাতবেলায় যখন
নিস্তব্ধ ধরার বুকে,
করুণাময়ের সৃজন-ছোঁয়ায়
জাগল জীবন সুখে।

মাটির কণায় প্রাণের শিখা,
শিরায় রক্তধারা,
অতুল রূপে মানুষ তখন
পেল স্রষ্টার স্নেহসারা।

চোখে দিলেন দেখার আলো,
কানে শুনার গান,
হৃদয়ভরা প্রেম-বিবেক,
মুখে সত্যের বাণ।

জ্ঞান দিলেন, বিচার দিলেন,
চিন্তার অফুরান;
অসংখ্য নেয়ামত সাজিয়ে দিলেন
অপরূপ দানখান।

বললেন তিনি—
"
এ পৃথিবী ক্ষণিক পথ,
চিরবাস নয় কভু;
সত্যের পথে চলতে শিখো,
ভুলো না তোমার রব।"

মানুষ তবু কত সহজে
ভুলে যায় সে ডাক,
মায়ার মেলায় হারিয়ে ফেলে
জীবনের আসল হাক।

ধনের মোহে, মানের নেশায়,
অহংকারের ঘোর,
সামান্য সুখের লোভে মানুষ
হারায় অন্তরজ্যোতি ভোর।

যে বিবেক ছিল আলোর মিনার,
ধীরে ধীরে ম্লান,
অন্যায়কে ন্যায় ভেবে নেয়,
হারায় সত্যজ্ঞান।

যে হৃদয়ে ছিল করুণা,
ছিল দয়ার ঢেউ,
স্বার্থের আগুন জ্বলে উঠে
শুকিয়ে ফেলে সে-ই।

এভাবেই মানুষ কখনো
নিজের হাতে নিজে,
সর্বোত্তম সেই মর্যাদাটুকু
হারায় দুঃখবীজে।

কেউ বলেন—
জীবনের শেষে আসে
বার্ধক্যের দিন,
চোখের আলো ঝাপসা হয়ে
ম্লান হয় জ্ঞানচিন।

শক্তি ক্ষয়ে, স্মৃতি ফিকে,
কাঁপে দুটি হাত,
চলার পথে থমকে থাকে
জীবনেরই রথ।

কেউ বলেন—
অবাধ্য প্রাণের শেষ ঠিকানা
অধঃপতনের দ্বার,
অকৃতজ্ঞতার কঠিন শাস্তি—
অগ্নির অন্ধকার।

অর্থে কিছু ভিন্নতা থাক,
শিক্ষা একই রয়—
রবের দেওয়া শ্রেষ্ঠ মর্যাদা
অবহেলায় হারিও না কভু।

কিন্তু দয়ার সাগর যিনি,
তাঁর রহমত বিশাল;
আশার প্রদীপ নিভতে দেন না,
খুলে রাখেন কাল।

যারা ঈমান হৃদয়ে ধারণ করে,
সৎকর্ম যাদের প্রাণ,
তাদের জন্য চিরদিন জাগে
অনন্ত কল্যাণ।

যারা নামাজে দাঁড়িয়ে বলে—
"
তুমিই আমার রব",
সিজদার মাটিতে অশ্রু ঝরে
ভালোবাসার সব।

যারা দানের হাত বাড়ায়
অভাবীর দুয়ারে,
হাসিমুখে সেবা করে
মানুষেরই তরে।

যারা সত্যের জন্য হাসে,
মিথ্যার সাথে নয়,
ন্যায়ের পথে দৃঢ় পায়ে
অটল থাকে সদাই।

যারা কষ্টে ধৈর্য ধরে,
সুখে থাকে নত,
প্রতিটি কাজে খোঁজে শুধু
রবের সন্তুষ্টি-মত।

যারা রাতের নির্জনতায়
চোখের জলে ডাকে,
ক্ষমার আশায় কাঁপা কণ্ঠে
রবের দরবারে থাকে।

তাদের জীবন বৃথা নয়,
নয় কোনো ক্ষয়;
প্রতিটি নেক আমলের ফল
রয় অক্ষয়ময়।

বৃদ্ধ হলে হাত কাঁপে যদি,
চলতে না পারে পা,
তবু তাদের আমলখাতায়
থামে না দানের ধারা।

অসুখ যদি গ্রাস করে,
শয্যাশায়ী প্রাণ,
তবুও তাদের পূর্বের সৎকর্ম
লিখে ফেরেশতাগণ।

দূর সফরে ক্লান্ত হলে,
বন্ধ থাকে কাজ,
রহমতের সেই অশেষ কলম
থামে না কোনো আজ।

কারণ রব তো ন্যায়পরায়ণ,
রব পরম দয়ালু;
বান্দার আন্তরিক ইচ্ছাটুকুও
রাখেন বড় ভালো।

তিনি জানেন কে কেমন ছিল,
কেমন তার প্রাণ,
অক্ষমতার ভারে নত
হয়েছে যার প্রাণ।

তাই তো বলেন—
"
হতাশ হয়ো না,
আমার দয়া অশেষ;
যে আমায় ভালোবেসে বাঁচে,
তার নেই সর্বনাশ।"

নিরবচ্ছিন্ন সেই পুরস্কার—
নেই যার অবসান,
নেই সেখানে মৃত্যু-ছায়া,
নেই কোনো অবমান।

নেই ক্লান্তি, নেই অশ্রুধারা,
নেই বিচ্ছেদের ক্ষণ,
শুধু শান্তি, শুধু প্রশান্তি,
চিরসুখের জীবন।

মানুষ তাই,
নিজেকে চেনো,
চেনো নিজের রব;
জীবনখানি ক্ষণিক সফর,
চিরস্থায়ী নয় সব।

দেহের রূপ একদিন যাবে,
যৌবন হবে ক্ষয়,
কিন্তু ঈমান, সৎকর্ম, তাকওয়া—
চিরদিন অক্ষয়।

আজ যে শক্তি, কাল তা থাকবে
এ নিশ্চয়তা কোথায়?
তাই আজই নাও সত্যের পথে
অটল থাকার শপথ হায়।

কৃতজ্ঞ হও প্রতিটি দানে,
প্রতিটি শ্বাসে বল—
"
হে পরম রব,
তোমার রহমত
অশেষ, অফুরন্ত জল।"

সর্বোত্তম রূপে সৃষ্টি হয়ে
হই যেন না হীন,
ঈমান দিয়ে সাজাই জীবন,
সৎকর্ম হোক ঋণ।

যেন শেষ বিকেলের আলোয়
ফুরিয়ে এলে প্রাণ,
শুনতে পাই সে সুমধুর ডাক—
রহমতের আহ্বান—

"এসো আমার প্রিয় বান্দা,
ভয় কোরো না আর;
তোমার ঈমান, তোমার সৎকর্ম
রয়েছে অম্লান ভার।

যা করেছিলে ভালোবেসে,
হারায়নি কিছুই;
আমার কাছে সংরক্ষিত
প্রতিটি অশ্রুবিন্দুই।

আজ তোমার সব অপেক্ষার
শেষ হলো অবশেষ,
নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কারে ভরো
চিরকল্যাণের দেশ।

এখানে নেই বার্ধক্যের ক্ষয়,
নেই অসুখের রাত,
নেই বিচ্ছেদ, নেই অশান্তি,
নেই কোনো আঘাত।

শান্তির বাগান খুলে দিলাম,
এসো স্নিগ্ধ দ্বারে;
আমার সন্তুষ্টি, আমার রহমত
রইল তোমারই তরে।"

তখন মানুষ বুঝে নেবে—
সত্য কখনো হারে না,
রবের পথে করা সৎকর্ম
একদিনও ঝরে না।

যিনি গড়েছেন শ্রেষ্ঠ রূপে,
তাঁরই পথে চলা—
এই তো মানুষের মহিমা,
এই জীবনের বেলা।

ঈমান যার অন্তরে দীপ,
সৎকর্ম যার সাথি,
তারই জন্য চিরদিন জাগে
রহমতের প্রভাতি।

সর্বোত্তম সৃষ্টি মানুষ,
সর্বোচ্চ তার মান—
রবের আনুগত্যেই লুকায়
তার প্রকৃত সম্মান।

মন্তব্য করুন

ব্লগ