Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ জুলাই, ২০২৬ ০৮:০৭ অপরাহ্ণ

স্পেসড রিপিটেশন: পড়া সহজে মনে রাখবেন যেভাবে

পরীক্ষার আগের রাতে বই খুলে বসে রাফি বুঝতে পারল, গত এক মাসে যা পড়েছিল তার অর্ধেকই মাথা থেকে উধাও। সূত্রগুলো গুলিয়ে যাচ্ছে, ইতিহাসের সাল-তারিখ মিলছে না, ইংরেজি শব্দগুলোও মনে পড়ছে না।

হতাশ হয়ে সে বলল, ‘এত পড়েও যদি মনে না থাকে, তাহলে লাভ কী?’

রাফির মতো দশায় অনেকেই পড়ে। আসলে এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কিংবা চাকরির প্রস্তুতিতে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শেষ মুহূর্তে অনেক কিছু একসঙ্গে মুখস্থ করার চেষ্টা করে। কিন্তু পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখা যায়, যা মুখস্থ করেছিল তার অনেকটাই মনে নেই।

মজার ব্যাপার হলো, সমস্যা আমাদের স্মৃতিশক্তিতে নয়, সমস্যা পড়ার পদ্ধতিতে।

বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির (বিসিইউ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা-গবেষকরা অনেক দিন ধরেই বলছেন, একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে যাওয়ার চেয়ে ছোট ছোট বিরতিতে একই বিষয় কয়েকবার পড়া অনেক বেশি কার্যকর। এই পদ্ধতির নাম স্পেসড রিপিটেশন।

ভুলে যাওয়া আসলে স্বাভাবিক

ধরে নিলাম, আমাদের কারো সঙ্গে নতুন একজন মানুষের পরিচয় হলো। কিন্তু একবার দেখা হওয়ার পর যদি আর কখনো তার সঙ্গে যোগাযোগ না হয়, কয়েক দিন পরই হয়তো নামটা ভুলে যাব।

তবে যদি পরদিন আবার দেখা হয়, তারপর কয়েক দিন পর আবার কথা হয়, এরপর আরও কয়েকবার যোগাযোগ হয়—তাহলে সেই নাম সহজে আর ভুলব না।

পড়ালেখার ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে।

বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একবার পড়ে বই বন্ধ করে দিলে আমাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে তথ্য ভুলতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ফরগেটিং কার্ভ’ বা ভুলে যাওয়ার বক্ররেখা।

অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে রাখা তথ্য কমতে থাকে।

তবে ঠিক সময়ে যদি সেই বিষয়টি আবার একটু ঝালিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে তথ্যটি দীর্ঘদিন মনে থাকে।

এটাই স্পেসড রিপিটেশনের মূল ধারণা বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়।

মস্তিষ্ক চায় অনুশীলন

অনেকে মনে করে, বারবার পড়ে গেলে মুখস্থ হয়ে যায়। তবে ব্যাপারটা আসলে এমন নাও হতে পারে।

ধরে নিলাম, আমাদের ঘরের বইয়ের তাক অনেক বড়। সেখানে হাজারো বই রাখা আছে। কিন্তু কোন বই কোথায় আছে, সেটা যদি জানা না থাকে, তাহলে প্রয়োজনের সময় বইটি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

আমাদের মস্তিষ্কও অনেকটা তেমন।

বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারবার তথ্য খুঁজে বের করে অনুশীলনে সহায়তা করে স্পেসড রিপিটেশন। ফলে পরীক্ষার হলে উত্তর মনে করা সহজ হয়। এই অনুশীলনকে বলা হয় ‘অ্যাকটিভ রিকল’।

অর্থাৎ, বই না দেখে নিজের স্মৃতি থেকে উত্তর বের করার চেষ্টা।

ক্লাসের পরই শুরু হোক পুনরাবৃত্তি

অনেকে ভাবে, পরীক্ষার সময় পড়া শুরু করবে। কিন্তু সবচেয়ে ভালো সময় হলো, যেদিন নতুন কিছু শেখা হয় সেই দিন থেকে শুরু করা।

ধরি, আজ পদার্থবিজ্ঞানে নিউটনের সূত্র পড়েছি। বাসায় ফিরে পাঁচ-দশ মিনিট সময় নিয়ে নিজের ভাষায় বিষয়টি লিখলাম। চাইলে ছোট ছোট নোট বা ফ্ল্যাশকার্ডও বানাতে পারি।

পরদিন বই না দেখে নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করব। তিন দিন পর আবার একবার ঝালিয়ে নেব। এক সপ্তাহ পর আবার পরীক্ষা করব, ঠিক কতটা মনে আছে।

দেখা যাবে, বিষয়টি বেশ ভালোভাবে মাথার মধ্যে গেঁথে গেছে।

২-৩-৫-৭ পদ্ধতি কী

বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেসড রিপিটেশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌশলগুলোর একটি হলো ২-৩-৫-৭ পদ্ধতি। এখানে একই বিষয় নির্দিষ্ট বিরতিতে কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করা হয়। বিষয়টি এখানে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো।

ধরি, পরীক্ষা ৩০ আগস্ট।

তাহলে পরিকল্পনা হতে পারে এভাবে—২৯ আগস্ট শেষবার ঝালিয়ে নেওয়া। ২৭ আগস্ট আবার পড়া। ২৪ আগস্ট আরেকবার অনুশীলন করা। ১৯ আগস্ট পুনরায় পড়া। ১২ আগস্ট প্রথম বড় রিভিশন দেওয়া।

অর্থাৎ, পরীক্ষার আগের দিন থেকে উল্টো হিসাব করে ২, ৩, ৫ ও ৭ দিনের ব্যবধানে পড়ার পরিকল্পনা করা। যেহেতু পরীক্ষার কয়েক মাস আগেই রুটিন পাওয়া যায়। সুতরাং খুব সহজেই এই পরিকল্পনা সাজানো সম্ভব।

ফলে একদিনে একসঙ্গে অনেক কিছু পড়তে হয় না।

শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক হাসান তৌফিক বলেন, আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী কোচিং, স্কুল, কলেজ, প্রাইভেট মিলিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটায়। ফলে শেষ সময়ে রাত জেগে পড়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

কিন্তু গবেষণা বলছে, এক রাতে দশ ঘণ্টা পড়ার চেয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন অল্প অল্প করে পুনরাবৃত্তি করলে অনেকদিন মনে থাকে। এতে পরীক্ষার আগে মানসিক চাপও কমে।

কীভাবে শুরু করব

এই পদ্ধতি খুব কঠিন কিছু নয়। শুরুতে প্রতিটি অধ্যায়ের জন্য ছোট ছোট ফ্ল্যাশকার্ড বানাতে হবে। মোবাইলে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখা যেতে পারে। অথবা একটি ডায়েরিতে লিখে রাখতে হবে, কোন বিষয় কবে আবার পড়ব।

এরপর পড়ার সময় বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করব। যেটা মনে করতে পারব না, কেবল সেটাই আবার দেখব। এতে সময় বাঁচবে, আবার ভালোভাবে শেখাও হবে।

কেবল বেশি পড়লেই হবে না, বুদ্ধি করে পড়তে হবে

পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য সব সময় বেশি সময় পড়তে হবে বিষয়টা এমন নয়। বরং কীভাবে পড়ছি, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আজ শিখছি, সেটি আগামীকাল, তিন দিন পর, এক সপ্তাহ পর আবার একটু মনে করার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে পরীক্ষার হলে উত্তর মনে করতে খুব বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।

https://bangla.thedailystar.net/ghas-phool/news-3938921?fbclid=IwY2xjawS0oANleHRuA2FlbQIxMABicmlkETJJOTF4WlVuSnVIM1ZUbzg4c3J0YwZhcHBfaWQQMjIyMDM5MTc4ODIwMDg5MgABHsWJtd7TPt8oJhwPXjs9wC8UX9qU9R1UIJ4vgK2LW5v9DFj-JmrJ4yViBVM7_aem_7Hc3iOktwLqspcc8JJFxIQ





মন্তব্য করুন

ব্লগ