সহকারী অধ্যাপক
০৪ জুলাই, ২০২৬ ০৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
হাতির বাহিনীর পরাজয় - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
হাতির বাহিনীর পরাজয়
(সূরা আল-ফীলের ভাবানুসারে একটি মহাকাব্যিক কাব্য)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
ইতিহাসের ধূসর পৃষ্ঠায়
জ্বলজ্বলে এক দিন,
অহংকারের গর্জন থেমে
উঠেছিল সত্যের ঋণ।
মরুর বুকে রৌদ্র জ্বলে,
আকাশ আগুনরঙা,
বালুর ঢেউয়ে দুলে বেড়ায়
অহমিকার ঢঙা।
দূর দিগন্তে ধুলোর মেঘ,
ভূমি কাঁপে ভারে,
যুদ্ধহাতির পদধ্বনি
প্রকম্পিত সংসারে।
শক্তির নেশায় মত্ত তারা,
অস্ত্রে সজ্জিত দল,
ভাবল বুঝি পৃথিবীজোড়া
তাদেরই সম্বল।
সামনে আছে পবিত্র ঘর,
ইবাদতের স্থান,
যেথায় যুগে যুগে ওঠে
একত্ববাদের গান।
সেই ঘরটিকে ভেঙে দিতে
এল দুর্বার বাহিনী,
ভাবল—বলই শেষ পরিচয়,
বলেই জয়গান ধ্বনি।
কিন্তু আছেন জগতের রব,
সকল শক্তির মূল,
মানুষ যত হিসাব কষে,
তাঁরই হাতে ফুল।
তিনি দেখেন অন্তরজুড়ে
গোপন সব পরিকল্পনা,
অন্যায় যখন সীমা ছাড়ায়
শুরু হয় বিচারগাথা।
কোথায় গেল সে দাম্ভিকতা?
কোথায় গর্জনভরা?
ক্ষণেই যেন মুছে গেল
সব অহংকার ধরা।
ষড়যন্ত্রের অট্টালিকা
ভেঙে পড়ল শেষে,
মিথ্যা শক্তির রঙিন স্বপ্ন
হারাল নিজের দেশে।
ঠিক তখনই আকাশজুড়ে
অদ্ভুত এক দৃশ্য,
ডানার শব্দে কেঁপে উঠল
মরুর নীরব বিশ্ব।
ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষুদ্র পাখি
এলো দূর আকাশ পেরিয়ে,
রবের আদেশ বক্ষে নিয়ে
ভয়কে দিল হারিয়ে।
নেই তাদের হাতে তরবারি,
নেই কোনো রথবাহন,
তবু তাদের ডানায় লেখা
আসমানি আহ্বান।
ক্ষুদ্র ঠোঁটে ক্ষুদ্র কঙ্কর,
তবু কত মহাশক্তি!
রবের হুকুম যার সহচর,
তাঁরই থাকে ভক্তি।
একের পরে এক ঝরে পড়ে
পোড়ামাটির দানা,
অহংকারের প্রাসাদ ভেঙে
হলো ধূলিসম জানা।
লোহা ভাঙে, ঢালও ভাঙে,
ভাঙে শক্তির মায়া,
রবের সামনে মুছে যায় সব
মানবগর্বের ছায়া।
হাতির দল আর সেনাপতি,
সাহসী সব বীর,
মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলল
গর্বের অন্ধ নীর।
যারা এসেছিল জয় করতে
অন্যায়ের অহমে,
তারাই শেষে হারিয়ে গেল
নিজেদেরই ভ্রমে।
মাঠের বুকে পড়ে রইল
ভাঙা স্বপ্নখানি,
যেন শুকনো শস্যপাতা
ঝড়ে উড়ে যায় জানি।
যেমন ক্ষেতে ফসল কাটার
পরে থাকে খড়,
তেমনি হলো তাদের পরিণাম,
শেষ হলো সব জড়।
শক্তি যদি ন্যায়হীন হয়,
স্থায়ী নয় তার মান,
অত্যাচারের উচ্চ প্রাচীর
ভাঙে এক নিমিষে প্রাণ।
ক্ষমতা নয় চূড়ান্ত সত্য,
সত্য মহান সদা,
ন্যায়ের পথেই টিকে থাকে
সভ্যতারই ধ্বজা।
যে হৃদয়ে বিনয় থাকে,
সেই হৃদয় ধন্য,
অহংকারে ভরা প্রাণে
শান্তি থাকে না অন্য।
পাখি ছিল ক্ষুদ্র বটে,
আদেশ ছিল মহান,
রবের ইচ্ছায় ক্ষুদ্রও পারে
লিখতে বিজয়গান।
এই শিক্ষা আজও জাগায়
মানুষের বিবেক,
অন্যায় দেখে নীরব থেকো না,
সত্যই হোক টেক।
কাবার ঘর রক্ষা করেছিলেন
যিনি বিশ্বপাল,
তাঁরই ইচ্ছায় সূর্য ওঠে,
তাঁরই হাতে কাল।
ইতিহাসের প্রতিটি পাতা
আজও দেয় সে বাণী—
ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের পথেই
মানবজীবন টানে।
তাই হে মানুষ,
গর্বের মুকুট খুলে রাখো,
বিনয়ের আলো পরো;
রবের ডাকে হৃদয় মেলো,
সত্যের পথে চলো।
কারণ—
যে শক্তি সত্যের বিরোধী,
সে শক্তি ক্ষণিক ধূলি;
আর যে হৃদয় রবের প্রতি
নত, সে হৃদয়ই ফুলে ফুলি।
আজও আকাশ বলে নীরব,
আজও মরু জানে,
রবের ইচ্ছার সামনে নত
সব যুগের সব মানে।
এই তো ইতিহাস,
এই তো শিক্ষা,
এই তো অনন্ত বাণী—
অন্যায় যতই প্রবল হোক,
ন্যায়ই থাকে চিরজয়ী।
আর যুগে যুগে মানুষ গাইবে
অটল বিশ্বাসের গান—
রবের আশ্রয় যেথায় থাকে,
সেথায় চিরনিরাপদ প্রাণ।
***
ইতিহাসের সেই অধ্যায়টি
আজও জাগে প্রাণে,
মরুর বুকে লেখা আছে
অমর এক আহ্বানে।
দিগন্তজোড়া বালুকাময়
নিস্তব্ধ প্রান্তরখানি,
সূর্যের আগুন ঝরে পড়ে,
জ্বলে ধরণীখানি।
শুষ্ক হাওয়া বয়ে বেড়ায়,
উড়ে ধুলোর ঢেউ,
নিঃশব্দতার বুকের ভেতর
লুকায় কত ঢেউ।
এই মরুতেই মাথা তুলে
দাঁড়িয়ে পবিত্র ঘর,
যেথায় নত হয় যুগে যুগে
অগণিত মানবশির।
পাথর গাঁথা সরল গৃহ,
তবু মহিমায় মহান,
তারই পানে ফিরেছে যুগে
বিশ্বাসভরা প্রাণ।
নেই সোনালি অলংকার,
নেই রাজমুকুটখানি,
তবু তারই চারপাশ ঘিরে
জাগে প্রেমের বাণী।
মানুষ আসে দূর দেশ হতে
একই ডাকে সাড়া,
এক রবেরই বন্দনাতে
এক হয় ধরা।
কিন্তু দূরে উঠল হঠাৎ
অশনি-সদৃশ রোল,
অহংকারের অন্ধ নেশায়
এল এক বিরাট দল।
হাতির পিঠে সশস্ত্র সেনা,
পতাকা উড়ে যায়,
অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ শুনে
মরু কেঁপে চায়।
লোহার বর্ম দীপ্ত হয়ে
রৌদ্র করে চূর্ণ,
শক্তির নেশায় মানুষের মন
হয়ে ওঠে উন্মত্ত।
ভাবল তারা—বলই সব,
বলেই হবে জয়,
যেখানে শক্তি, সেখানেই নাকি
নত হবে বিশ্বময়।
কিন্তু তারা বুঝল না তো
একটি গভীর কথা—
স্রষ্টার বিধান ছাপিয়ে যেতে
পারে না কোনো প্রথা।
যে ঘর গড়ে বিশ্বাসের দীপ,
করুণারই ছায়া,
অন্যায় হাতে সে ঘর ভাঙা
কখনো কি হয় হায়?
অহংকারের চোখে তখন
সত্য ছিল না ধরা,
নিজের শক্তির মোহে পড়ে
হারাল দিশাহারা।
আকাশ ছিল নীরব তখন,
নীরব মরুর বালি,
কিন্তু নীরবতার গভীর তলে
জাগে বিধানের ডালি।
রবের দৃষ্টি সর্বত্র বিরাজে,
গোপন কিছু নয়,
মানুষ যত ছকই আঁকে,
শেষ সিদ্ধান্ত তাঁরই হয়।
ষড়যন্ত্রের জটিল জাল
যতই বোনা হোক,
সত্যের সামনে মিথ্যার প্রাসাদ
ক্ষণে ভেঙে লোক।
শক্তির চেয়ে সত্য বড়,
ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়,
যেখানে অন্যায় মাথা তোলে,
সেখানে বিচার চায়।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে
হাতির বিশাল সারি,
মরুর বুকে কাঁপন তোলে
তাদের পদধ্বনি ভারী।
তবু কোথাও ভয়ের চেয়ে
বেশি ছিল বিশ্বাস,
অদৃশ্য হাতে রক্ষিত হবে
পবিত্র সেই নিবাস।
মানুষ দেখে বাহিরখানা,
রব দেখেন অন্তর,
যার হাতে সব সৃষ্টি জগত,
তাঁরই শেষ প্রহর।
আকাশজুড়ে অপেক্ষার
অদৃশ্য এক ক্ষণ,
যেন সৃষ্টির প্রতিটি কণা
শুনছে তাঁরই বচন।
কেউ জানে না, কোন প্রহরে
কী নির্দেশ আসবে,
কোন উপায়ে সত্য আবার
অন্যায়কে হারাবে।
কারণ প্রভুর শক্তির কাছে
বড়-ছোট এক নয়,
তাঁরই ইচ্ছায় ক্ষুদ্র কণাও
মহাশক্তির পরিচয়।
এভাবেই সেই প্রান্তরে
ঘনিয়ে এল ক্ষণ,
যেখানে ইতিহাস লিখবে
অমর এক ঘটন।
মরুর বুকে স্তব্ধ বাতাস,
স্তব্ধ আকাশপথ—
অদৃশ্যভাবে এগিয়ে আসে
বিচারেরই রথ।
শেষ নয় এ কাহিনির,
এ কেবল সূচনা;
সত্যের জয়ে উদ্ভাসিত হবে
পরবর্তী প্রভাতের রচনা।
***
নিস্তব্ধ তখন মরুর বুকে
গভীর প্রতীক্ষার ক্ষণ,
আকাশ যেন নত হয়ে শোনে
রবের গোপন বচন।
সূর্য তখন মধ্যগগনে,
রৌদ্র দগ্ধ ভূমি,
দূর দিগন্তে কাঁপে বাতাস,
স্তব্ধ প্রাণভূমি।
অহংকারে অন্ধ সেনা
এগিয়ে চলে ধীরে,
জয়ের নেশায় ভুলে গেছে
বিচার দিবস নিকটে রে।
হাতির শুঁড়ে যুদ্ধের ডাক,
অস্ত্রে ঝলকে আগুন,
মনে তাদের একটিই কথা—
"আজই হবে জয়গুণ।"
কিন্তু হঠাৎ দিগন্ত জুড়ে
অদ্ভুত আলো জাগে,
অচেনা এক ডানার ধ্বনি
আকাশময় লাগে।
ছোট্ট পাখি, অগণিত দল,
ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে,
যেন মেঘের বুকে লেখা
আদেশ নেমে পড়ে।
নেই তাদের রাজদণ্ড,
নেই কোনো সেনাবাহিনী,
তবু তাদের উড্ডয়নে
কম্পে গর্বিনী ধরণী।
প্রতিটি ডানা সাক্ষী যেন
অসীম শক্তিধার,
রবের হুকুম বহন করে
অদৃশ্য এক জোয়ার।
ক্ষুদ্র ঠোঁটে ক্ষুদ্র কঙ্কর,
তবু কত যে বল!
আদেশ পেলে ক্ষুদ্র কণাও
হয়ে ওঠে অচল।
আকাশ ভরে ডানার ছায়া,
মরু হলো স্তব্ধ,
দাম্ভিক হৃদয় প্রথমবার
হয়ে উঠল নিঃশব্দ।
কোথা থেকে এলো তারা?
কোথায় তাদের ঘর?
মানুষ জানে না সে রহস্য,
জানেন কেবল রব।
তারপর নামে বিচারধারা,
অলৌকিক সেই ক্ষণ,
যেখানে শক্তি থেমে যায়,
জয়ী হয় বিধান।
পোড়ামাটির ক্ষুদ্র কণা
ঝরে পড়ে ধীরে,
তবু তারই আঘাত যেন
বজ্র নামে নীরে।
অস্ত্র ভাঙে, অহং ভাঙে,
ভাঙে মিথ্যা মান,
অন্যায় যত উচ্চ হোক,
স্থায়ী নয় তার প্রাণ।
হাতির গর্জন স্তব্ধ হলো,
থেমে গেল সে রোল,
জয়ের মুকুট ধূলায় মিশে
নিভে গেল সব দোল।
যারা এসেছিল ভাঙতে এসে
পবিত্র বিশ্বাসঘর,
তারাই শেষে বুঝল গিয়ে—
শক্তির ঊর্ধ্বে রব।
যেন ঝড়ে ছিন্ন শস্যপাতা
উড়ে যায় মাঠময়,
তেমনি ভেঙে ছড়িয়ে গেল
অহংকারের পরিচয়।
মরুর বুকে আবার নেমে
নীরব শান্তি এল,
আকাশ যেন সিজদায় নত,
বাতাস দোয়া খেল।
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা
চিরউজ্জ্বল বাণী—
ন্যায়ের রক্ষায় প্রভুর শক্তি
চিরদিন অম্লানই।
শক্তি নয়, সত্যই শেষ,
ক্ষমতা নয় মান,
যে হৃদয়ে রবের ভয়,
সেই হৃদয় মহান।
এই কাহিনি যুগে যুগে
জাগায় দৃঢ় বিশ্বাস,
অন্যায় যত প্রবল হোক,
সত্যেরই হয় বাস।
তাই হে মানব,
অহংকারের মুকুট ফেলো,
বিনয়ের দীপ জ্বালো;
স্রষ্টার পথে দৃঢ় হয়ে
সত্যের পতাকা তুলো।
১৪
২৪ মন্তব্য