সহকারী শিক্ষক
২৮ জুলাই, ২০২৬ ১১:১৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
FLN বা Foundational Literacy and Numeracy (মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান): প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি
বর্তমান বিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিশুকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে পড়তে, লিখতে এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় গাণিতিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাপী Foundational Literacy and Numeracy (FLN) বা মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানকে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশও নতুন শিক্ষাক্রম ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রমে FLN-কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
FLN কী?
Foundational Literacy (মৌলিক সাক্ষরতা) হলো এমন দক্ষতা, যার মাধ্যমে একটি শিশু নিজের ভাষায় সাবলীলভাবে পড়তে, পড়ে বুঝতে, লিখতে এবং নিজের চিন্তা-ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে।
Foundational Numeracy (মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান) হলো সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা, সংখ্যা তুলনা, যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের মতো মৌলিক গাণিতিক দক্ষতা অর্জন এবং দৈনন্দিন জীবনের সহজ গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারার সক্ষমতা।
FLN কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য FLN অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত যদি কোনো শিশু পড়ে বুঝতে এবং মৌলিক গণিত করতে না শেখে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণির পাঠ আয়ত্ত করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের Global Learning Poverty বিশ্লেষণেও এই বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
SDG-এর সঙ্গে FLN-এর সম্পর্ক
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDG)-এর ৪ নম্বর লক্ষ্য হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর সূচক ৪.১.১ (SDG 4.1.1)-এ শিক্ষার্থীদের মৌলিক পাঠদক্ষতা ও গণিত দক্ষতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিটি শিশুর মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান নিশ্চিত করাই এই বৈশ্বিক লক্ষ্যের অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় FLN
বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP-4)-এর মাধ্যমে FLN বাস্তবায়নে কাজ করছে। এছাড়া জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১ (পরিমার্জিত)-এ যোগ্যতাভিত্তিক (Competency-based) শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো—তৃতীয় শ্রেণি শেষে প্রতিটি শিশু যেন মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান (FLN) অর্জন করতে পারে। কারণ এই ভিত্তি সুদৃঢ় হলে পরবর্তী শ্রেণির শিক্ষা গ্রহণ অনেক সহজ ও ফলপ্রসূ হয়।
FLN-এর লক্ষ্য (৩-২-১)
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় FLN-এর লক্ষ্যকে সংক্ষেপে "৩-২-১" হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর অর্থ হলো—
৩ — তৃতীয় শ্রেণি শেষ হওয়ার আগেই প্রতিটি শিশু মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান অর্জন করবে।
২ — শিশু দুটি মৌলিক দক্ষতা, অর্থাৎ মৌলিক সাক্ষরতা (Literacy) এবং মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান (Numeracy) অর্জন করবে।
১ — এই দুটি দক্ষতার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর আজীবন শিক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে।
FLN বাস্তবায়নে শিক্ষকের ভূমিকা
FLN অর্জনে একজন শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক—
শিশুকেন্দ্রিক ও আনন্দময় পরিবেশে পাঠদান করবেন।
খেলাভিত্তিক (Play-based Learning) ও কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষণ কৌশল ব্যবহার করবেন।
প্রতিটি শিশুর শেখার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করবেন।
পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা প্রদান করবেন।
অভিভাবকদের শেখার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করবেন।
বাস্তব উদাহরণ, গল্প, ছবি, ছড়া ও শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করে শেখাকে আনন্দদায়ক করবেন।
FLN বাস্তবায়িত হলে কী হবে?
FLN সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে—
প্রতিটি শিশু সাবলীলভাবে পড়তে ও পড়ে বুঝতে পারবে।
নিজের ভাষায় সুন্দরভাবে লিখতে ও ভাব প্রকাশ করতে পারবে।
দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে পারবে।
আত্মবিশ্বাসী ও আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে উঠবে।
মানসম্মত শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় হবে এবং SDG-৪ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপসংহার
FLN কোনো আলাদা বিষয় নয়; এটি প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও জীবনের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে প্রাথমিক স্তরে অর্জিত মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের ওপর। তাই শিক্ষক, অভিভাবক, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৃতীয় শ্রেণির মধ্যেই প্রতিটি শিশুর FLN অর্জন নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। এর মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১ (পরিমার্জিত), PEDP-4 এবং SDG-4.1.1-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি একটি দক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
১৪
২৪ মন্তব্য