Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উদ্ভূত পরিস্থিতি ও করণীয়

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের তাণ্ডব দেখে আমার বিভিন্ন কলামে লেখা একটি কথা আবারও মনে পড়লো। নতুন কোনো সরকার, মন্ত্রী, শিক্ষাবিষয়ক কোনো অনুষ্ঠানের বক্তা কিংবা এসব বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ কথা বলার সময় সবার আগে একটি কথা বলে থাকেন, আর সেটি হচ্ছে ‘শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।’ আমি বহুবার লিখেছি পান থেকে চুন খসলেই যেখানে শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ সুবিধাবাদী সবাই রাস্তায় নেমে পড়ে, সব কিছু বন্ধ করে দেয়, যা অত্যন্ত সহজ কাজ এবং সাধারণ মানুষের জীবনে অসহনীয় দুর্ভোগ ডেকে আনে, সেখানে ঢেলে সাজাতে গেলে কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সেটি হয়তো তারা কেউ চিন্তা করেন না। আমি অনবরতই লিখে যাচ্ছি যে, শিক্ষার্থী অভিভাবক, শিক্ষক এবং পুরো শিক্ষার যে কি অবস্থা হয়েছে সেটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে, অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ধীরে ধীরে একটি পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীরা যে অবস্থায় পৌঁছেছে তাতে তারা পরীক্ষার মতো ঝামেলায় না গিয়ে অটোপাস পাস করতে চায়। একই কাজ চায় অভিভাবকরাও। আগের সরকার ব্যাপারটি বুঝতে পেরে সব একাডেমিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে পড়াশোনার নাম দিয়ে বিভিন্ন কসরত আর পরীক্ষা না দিয়ে এসব কসরতের খেলার আয়োজন করেছিল। এতে শিক্ষার্থীরা খুশি, অভিভাবকরাও খুশি (দু-চারজন ছাড়া এবং অনেক শিক্ষকও বেশ খুশি ছিল। এই সমাজকে বদলানো যে কত কঠিন সেটি আমরা গভীরভাবে চিন্তা না করে হঠাৎ যদি কোনো কথা বলে ফেলি, সেটি সমস্যাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষা যারা পরিচালনা করেন, তাদের এ বিষয়গুলো এবং ভেতরে জমে থাকা হাজারো সমস্যা ধীরে ধীরে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সতর্কতার সঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। হাত দিতে হবে বিদ্যমান সমস্যাবলিতে, সেখানে হঠাৎ বিশাল কিছু করে ফেলার কথা কিংবা বিপ্লব নিয়ে আসার কথা বলা অনেকটাই বেমানান মনে হয়।

টকশোতে অংশগ্রহণকারী সবাই হঠাৎ করে যখন বলে ফেলেন যে, শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেল সাজাবো, এখানে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবো, কথাটি বলতে লেগেছে কয়েক সেকেন্ড কারণ খুব পপুলার কথা, অথচ সেটি বাস্তবায়ন করতে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় লেগে যাওয়ার কথা। কারণ এর সঙ্গে বহু কিছু জড়িত যার অনেককিছুরই ভাগিদার যিনি বর্তমানের কথাটি বলেছেন তার সৃষ্ট নয়, বা তার তাতে অংশগ্রহণ নেই বা তার একার বা দু-চার দশজনের প্রচেষ্টায় এমনকি শুধু সরকারি প্রচেষ্টায় সেটি করা সম্ভব নয়। শিক্ষার এত সমস্যা এখানে লিখে শেষ করা যাবে না। শিক্ষার্থীরা বই পড়বে না, বই পড়ে না, ক্লাস করবে না, সার্টিফিকেট চাবে। সার্টিফিকেট না দিলে বিদ্যালয়-বোর্ড সব আক্রমণ করবে, জোর করে ছিনিয়ে নেবে। বল বা আইন কোনোটিই প্রয়োগ করা যাবে না। তাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। অধিকাংশ অভিভাবকও তাই চায়। আপনি কিছু শেখাতে যাবেন, বলতে যাবেন উল্টো আপনার ওপর ঝামেলা আছড়ে পড়বে। এই সমাজ একদিনে এ রকম হয়নি। এখন প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকরা শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকদের কিছু বলতে পারেন না, একটু জোর করে কোন কাজ করাতে পারেন না। একটু উচ্চ স্বরে কথা বলতে গেলেই দলবলসহ স্কুল-কলেজ আক্রমণ, প্রতিষ্ঠান প্রধানকে অপদস্থ করা, গায়ে হাত তোলাসহ সবকিছুই চলছে, চলছে না শুধু পড়াশোনা। এই পরিস্থিতি আমরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করব আমাদের কথা হবে সেগুলো নিয়ে কিন্তু সেটি কোনো আলোচনাতেই আসে না।

চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের সৃজনশীল প্রশ্নে নাকি ৬ ও ৭ নম্বর সিলেবাসের বাইর থেকে করা হয়েছে এবং প্রশ্ন দুটিতে নাকি সমস্যা আছে; কিন্তু কি সমস্যা, তা কোথাও দেখার সুযোগ হলো না। তবে কিছু শিক্ষক প্রশ্নপত্র সিলেবাস থেকে করা হয়েছে বলছেন, খুবই বেসিক এবং ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন করা হয়েছে। যারা শুধু কয়েক বছরের প্রশ্নপত্র ঘাটাঘাটি করে পরীক্ষার উত্তর বা প্রস্তুতি নিয়ে থাকে তাদের জন্য সমস্যা। যেমন গত বছর এসএসসির গণিত পরীক্ষায় যে সমস্যাটি হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছেন, প্রশ্নটি বুয়েট বা কুয়েটের সিলেবাসে করা। এমনিতেই তো শিক্ষার্থীরা নাচুনে বুড়ি তার ওপর পড়েছে ঢোলের বারি।

প্রচণ্ড বর্ষায় এবং বন্যায় দেশের বহু স্থান তলিয়ে গেছে, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। এগুলো একত্র করে না পড়া শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। একটি পাবলিক পরীক্ষা তো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরীক্ষা নয় যে, কোনো দুর্ঘটনার কারণে সেই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা বন্ধ রেখে, পরের দিন বা তারও দু-এক দিন পর তা গ্রহণ করা হবে। পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে তো সেটি সম্ভব নয়, কারণ এটি দীর্ঘ এবং কয়েক ধাপের একটি প্রক্রিয়া। তারপরেও সরকার একটি বোর্ডের পরীক্ষা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বন্ধ রেখেছে, সর্বত্র তো সেটি করা সম্ভব নয়। আবার দুটি চারটি বা পাঁচটিই হোক প্রতিষ্ঠান যদি আক্রান্ত হয়, সেখানকার শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়া অত্যন্ত কষ্টকার এটিও ঠিক, তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমরা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম নারী শিক্ষার্থীও কোমরসমান পানির মধ্য দিয়ে গিয়ে পরীক্ষার হলে হাজির হয়েছে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমনিতেই পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জন্য এক ভীতির কারণ, তার ওপর এমন দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা মানে মানসিক চাপের শেষ সীমায় পৌঁছানো। এসব ক্ষেত্রে পাবলিক পরীক্ষা কী হবে, সেটি আমাদের পলিসিতে আগে থেকেই থাকা উচিত। কারণ একটি দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ রাখা যায় না। এ ক্ষেত্রে বিকল্প কি করণীয়, তা আমাদের শিক্ষা বোর্ড কিংবা মন্ত্রণালয় কোথাও হয়তো কিছুই নেই, কারণ এসব বিষয় তো কেউ সেভাবে চিন্তা করেন না। তাদের চিন্তা অন্যত্র।

যেসব প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে বা পানিতে ভিজে গেছে তাদের সমর্থনে ঢাকার শিক্ষার্থীরা সারা দিন বৃষ্টিতে ভিজে এবং লাখ লাখ মানুষ ও পথযাত্রীকে পানিতে ভিজিয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে আন্দোলন করছে বৃষ্টির ভেতর পরীক্ষা নেওয়া হলো কেন, শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে, অটোপাস করাতে হবে– ইত্যাদি যার সবই অযৌক্তিক এবং আবেগতাড়িত। ২০২৪ সালের পর শিক্ষার্থীরা মনে করে তারা যা বলবে, যা করতে চাইবে তাই হবে যেমন জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান আর এটি এক কথা নয়! সেটি ছিল সমগ্র দেশের মানুষের বছরের পর বছর চাপা ক্ষোভের বিস্ফোরণ! সেই ধারায় যখন শিক্ষার্থীরা কোনো কারণ ছাড়াই বা সামান্য কারণে যখনই রাস্তায় নামে তখনই কিছু সুযোগ সন্ধানী বাকি শিক্ষার্থীদের লেলিয়ে দেন ফায়দা লোটার জন্য। এ আরেক কালচার শুরু হয়েছে দেশে। আন্দোলনে নেমেছে অছাত্র, এসএসসি ও স্কুলের শিক্ষার্থীরাও আর কষ্ট ভোগ করেছে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। মনে রাখতে হবে জুলাই আন্দোলনে সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। আর পরীক্ষা দিব না, অটোপাস করাতে হবে, বই পড়বো না, ক্লাস করবো না, প্রশ্ন কঠিন হয়েছে এ দাবি তো সবার হতে পারে না।

পাকিস্তান আমলে অর্থবছর ছিল জুলাই টু জুন। বলা হতো যে, বাংলাদেশে জুন-জুলাই মাস থেকে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে। এদেশে যাতে কোনো উন্নয়নকর্ম ঠিকভাবে না চলে, সে জন্য এ ব্যবস্থা। অর্থাৎ কোনো বরাদ্দ দেওয়া হলে সেই কাজ যখন শুরু হবে, তখনই বৃষ্টি বা বন্যা শুরু হয়, ফলে কোনো কাজ ঠিকভাবে এগোয় না, এর মধ্যে প্রকল্পের সময় শেষ হয়ে যায়। কথাটি অযৌক্তিক নয়; কিন্তু স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরেও আমরা সেই অর্থবছরই রেখে দিলাম কেন? একইভাবে শিক্ষাপঞ্জিও পরিবর্তন করলাম না কেন? ফলে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয় একটা অড টাইমে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবং আমাদের সর্বদাই পরিবেশ বিরোধী কাজের দরুণ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আরও ভয়ংকর শক্তি নিয়ে হাজির হয়। অথচ এই সময়ে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ করছি। সব ধরনের পাবলিক পরীক্ষাগুলো যাতে ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী বছরের মার্চের মধ্যে শেষ হয়ে যায় সরকারকে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অত্যন্ত বাস্তবমুখী চিন্তা ও পরিকল্পনা করতে হবে। দ্রুত বা হুটপাট কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শিক্ষার মূল সম্যাগুলোত হাত দিতে হবে।

আমরা এবার দেখলাম প্রায় পনেরো লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ এইচএসসির ফরম পূরণ করেছে অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগেই শিক্ষাপ্রবাহ থেকে ঝড়ে গেছে। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষার্থী ট্রাকিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, এখানে আছে শুধু বড় বড় কথা আর বড় বড় প্রজেক্ট! সঠিক কোনো সংবাদ নেই। শুধু পত্রিকার অবহেলিত সাংবাদিক বা ব্যক্তিগত কোনো বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি বা শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করেন, এমন দু-চারজন কোন এসব কারণ খুঁজে বের করবে তারপর সবাই জানবে। সবাই প্রথমেই বলি দারিদ্রের কারণে ঝরে গেছে। শিক্ষা যখন নিশ্চিত কোনো কর্মসংস্থান, দক্ষতা বা সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন পরিবার দ্রুত আয়কেই বেশি মূল্য দেয়। ফলে, শিক্ষার সাংস্কৃতিক মূল্য ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক হিসাবের কাছে পরাজিত হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত যদিও বেসিক এডুকেশন কিন্তু আমার দেশ কোনটি অনুসরণ করবে এবং কতটুকু পর্যন্ত সব নাগরিককে রাষ্ট্র সেই সুবিধা দেবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। বেসিক এডুকেশন পর্যন্ত শিক্ষা দিতে রাষ্ট্রের যা যা করা প্রয়োজন, সেটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমেই হোক, প্রাইভেটে হোক কিংবা অংশীদারত্বের মাধ্যমে হোক, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। মন্ত্রণালয়ে এর জন্য একটি আলাদা সেল থাকতে হবে।

দেশের প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি যে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ণ করতে পারছে না , বর্তমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আবারও সেটি দেখিয়ে দিল। স্কুল কলেজের পাস কীভাবে হয়? শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে পড়ে, তারা সেখান থেকে সব গাইডলাইন পেয়ে, প্রশ্নের ধারণা পেয়ে যায়। কোচিং করলে সেখানেও সব পেয়ে যায়; কিন্তু কোনো বিষয় সঠিকভাবে বুঝার জন্য যা দরকার সেটি হচ্ছে না। ৬০০ নতুন ক্যাডেট কলেজের আদলে স্কুল-কলেজ বানানোরই বা মাহাত্ম কী সেটিও বুঝি না! সবারই এক চিন্তা। তাতে শিক্ষার যে বারোট বেজে গেছে, সেখান থেকে উদ্ধারের পথ কী? সেই ভাবনায় যেন কেউ নেই। সব সরকারেরই দেখলাম প্রায় একই পদ্ধতি! আমাদের আসলে কি করতে হবে সেটি নির্ধারণ করা দরকার।

লেখক: মাছুম বিল্লাহ, ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক।

সংগ্রহে: মোঃ হাবিবুল্লাহ্

মন্তব্য করুন

ব্লগ