সহকারী অধ্যাপক
১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ
স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে -মোঃ মুজিবুর রহমান
স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে
(স্বপ্ন, সাধনা, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের পথে একটি ইসলামী জীবনদর্শন)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নই মানুষকে আগামী দিনের কথা ভাবতে শেখায়, নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আশাবাদী থাকতে সাহায্য করে। স্বপ্নহীন জীবন অনেকটা দিকনির্দেশনাহীন যাত্রার মতো। তবে শুধু স্বপ্ন দেখলেই জীবনে সাফল্য আসে না; স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন জ্ঞান, শ্রম, অধ্যবসায়, সততা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং সঠিক কর্মপরিকল্পনা। আর একজন মুমিনের জীবনে এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় ঈমান, তাকওয়া, ইবাদত, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা। তাই ইসলামী দৃষ্টিতে সুন্দর স্বপ্ন হলো এমন স্বপ্ন, যা মানুষকে নিজের কল্যাণের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, দেশ ও সমগ্র মানবতার কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
স্বপ্ন মানুষের অন্তরে আশার আলো জ্বালায়। অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি সুন্দর স্বপ্ন মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেয়। জীবনের পথে বাধা আসবে, দুঃখ আসবে, ব্যর্থতা আসবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়; বরং অনেক সময় ব্যর্থতা নতুন করে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করে। যে মানুষ ভুল থেকে শিক্ষা নেয়, নিজের দুর্বলতা সংশোধন করে এবং আবার চেষ্টা করার সাহস রাখে, সে একদিন তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। তাই জীবনের কোনো সাময়িক ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত পরাজয় মনে করা উচিত নয়।
তবে স্বপ্নের সঙ্গে কর্মের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কর্মহীন স্বপ্ন কেবল কল্পনা হয়ে থাকে। একজন কৃষক যদি ভালো ফসলের স্বপ্ন দেখেন কিন্তু জমিতে বীজ না বোনেন, জমির যত্ন না নেন এবং প্রয়োজনীয় শ্রম না দেন, তাহলে তাঁর স্বপ্ন বাস্তব ফল দেবে না। একইভাবে একজন শিক্ষার্থী যদি বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে কিন্তু নিয়মিত পড়াশোনা না করে, সময়ের মূল্য না বোঝে এবং চরিত্র গঠনের চেষ্টা না করে, তবে তার স্বপ্ন পূরণ হওয়া কঠিন। তাই স্বপ্নকে সফল করতে হলে স্বপ্নের সঙ্গে শ্রমকে যুক্ত করতে হবে।
জীবনের সাফল্যের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হলো অধ্যবসায়। একটি বীজ মাটির নিচে দীর্ঘ সময় নীরবে অবস্থান করে। বৃষ্টি, রোদ, মাটি ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তা অঙ্কুরিত হয় এবং একসময় বৃক্ষে পরিণত হয়। মানুষের স্বপ্নও তেমন। তাৎক্ষণিক ফল না পেলেও ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। আজকের সামান্য পরিশ্রম হয়তো সঙ্গে সঙ্গে সাফল্য এনে দেবে না, কিন্তু নিয়মিত ও সৎ প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য শক্ত ভিত তৈরি করে।
ইসলাম মানুষকে কর্মবিমুখ হতে শেখায় না। বরং সৎকর্ম, দায়িত্বশীলতা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তা-ই তার জন্য।” — (সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩৯)। এই আয়াত মানুষের প্রচেষ্টা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন মুমিন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবেন, কিন্তু সেই তাওয়াক্কুল কখনো অলসতার অজুহাত হবে না। সে নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবে, সঠিক পথে কাজ করবে এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে সমর্পণ করবে।
তাওয়াক্কুল হলো চেষ্টা বাদ দেওয়া নয়; বরং চেষ্টা করার পর আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা। একজন কৃষক জমি চাষ করবেন, বীজ বপন করবেন, সেচ দেবেন এবং ফসলের যত্ন নেবেন। এরপর তিনি আল্লাহর কাছে ভালো ফলের আশা করবেন। একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করবে, শিক্ষক ও অভিভাবকের পরামর্শ নেবে, নিজের সময়কে সুশৃঙ্খল করবে এবং তারপর আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে। এটাই সঠিক তাওয়াক্কুলের বাস্তব রূপ।
জীবনে হতাশার মুহূর্তও আসে। কখনো মানুষের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, কখনো প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না, কখনো প্রিয় কোনো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। এমন সময় একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।” — (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩)। এই বাণী মুমিনের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালায়। যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। তাই হতাশ হয়ে থেমে না থেকে ভুল সংশোধন করে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।
স্বপ্নের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন কোনো স্বপ্ন মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না, যার বাস্তবায়নের পথে মিথ্যা, প্রতারণা, অন্যায়, দুর্নীতি, জুলুম বা মানুষের অধিকার হরণ করতে হয়। অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতি অর্জন যদি মানুষের নৈতিকতা নষ্ট করে দেয়, তবে সেই অর্জন প্রকৃত সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো এমন জীবন গড়ে তোলা, যেখানে জ্ঞান আছে কিন্তু অহংকার নেই, সম্পদ আছে কিন্তু কৃপণতা নেই, ক্ষমতা আছে কিন্তু জুলুম নেই এবং সাফল্য আছে কিন্তু মানুষের প্রতি অবজ্ঞা নেই।
একজন মানুষের স্বপ্ন কেবল নিজের জন্য সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নিজের উন্নতির পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথাও ভাবতে হবে। ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায়কে সাহায্য করা, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, অশিক্ষিতকে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া, অসুস্থ মানুষের সেবা করা—এসব কাজ মানুষের জীবনকে মহৎ করে। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা অনেক সময় বড় কোনো সম্পদ অর্জনের চেয়েও মূল্যবান।
ইসলামে মানবকল্যাণের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা সৎকর্মের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।” — (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)। তাই একজন মুসলিমের স্বপ্নের মধ্যে ন্যায়, দয়া, সহমর্মিতা ও মানবসেবার স্থান থাকা উচিত।
শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, কৃষিবিদ, উদ্যোক্তা, প্রশাসক ও সমাজনেতা। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার স্বপ্ন দেখলে চলবে না; তাদের ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্নও দেখতে হবে। শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের নাম নয়; শিক্ষা মানুষের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ ও চরিত্রকে সুন্দর করে।
একজন শিক্ষার্থীর উচিত বই পড়া, শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সময়ের মূল্য বোঝা, নিয়মিত অধ্যয়ন করা এবং নিজের চরিত্রকে উন্নত করা। বিনয়, শৃঙ্খলা, সততা, দায়িত্ববোধ, পরিশ্রম ও সহমর্মিতা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া দরকার। যে শিক্ষা মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে কিন্তু নৈতিকতা সৃষ্টি করে না, সে শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করার পাশাপাশি বিবেকবান ও দায়িত্বশীল করে তোলে।
শিক্ষকের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় শেখান না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা ও চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখেন। শিক্ষকের একটি ভালো কথা, একটি সঠিক পরামর্শ কিংবা একটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং শিক্ষকের সৎ পরামর্শকে জীবনে ধারণ করা।
পরিবারও মানুষের স্বপ্ন গঠনের প্রথম বিদ্যালয়। শিশুরা পরিবারের পরিবেশ থেকে ভালো-মন্দের ধারণা পায়। বাবা-মায়ের আচরণ, কথাবার্তা, মূল্যবোধ ও জীবনযাপন শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই পরিবারে ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, সত্যবাদিতা, পারস্পরিক সম্মান ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা থাকা জরুরি। একজন শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য।
দেশের উন্নতির ক্ষেত্রেও মানুষের স্বপ্নের গুরুত্ব রয়েছে। কৃষক যখন ভালো ফসলের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে কাজ করেন, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও অবদান রাখেন। জেলে নদীতে পরিশ্রম করেন, শ্রমিক কারখানা ও নির্মাণস্থলে ঘাম ঝরান, কারিগর দক্ষ হাতে পণ্য তৈরি করেন, শিক্ষক জ্ঞানের আলো ছড়ান, চিকিৎসক মানুষের সেবা করেন এবং বিজ্ঞানী নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির সন্ধান করেন—প্রত্যেকের স্বপ্ন ও শ্রম মিলেই একটি দেশ এগিয়ে যায়।
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু বড় বড় ভবন, রাস্তা ও সেতু নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিকতার উন্নয়নও দেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই তরুণদের স্বপ্ন হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক, নৈতিক ও দেশকল্যাণমুখী।
তরুণ সমাজ একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের মধ্যে রয়েছে উদ্যম, সৃজনশীলতা, সাহস ও নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা। এই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা গেলে দেশ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি তরুণদের সময় অপচয়, মাদক, অপরাধ, অশ্লীলতা, হিংসা, বিদ্বেষ বা অর্থহীন বিনোদনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে। তাই তরুণদের উচিত জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, ইবাদত ও মানবসেবাকে জীবনের ভিত্তি করা।
স্বপ্নের সঙ্গে সময়ের মূল্যও গভীরভাবে জড়িত। সময় একবার চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। তাই প্রতিটি দিনকে নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যে শিক্ষার্থী আজকের কাজ আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখে, সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। যে ব্যক্তি সময়কে মূল্য দেয়, পরিকল্পনা করে কাজ করে এবং প্রতিদিন নিজেকে কিছুটা উন্নত করার চেষ্টা করে, তার জীবনেই অগ্রগতির সম্ভাবনা বেশি।
নামাজ একজন মুমিনের জীবনে শৃঙ্খলা ও আত্মসংযমের শিক্ষা দেয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষকে সময়ানুবর্তী করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে। কুরআন তিলাওয়াত অন্তরে জ্ঞানের আলো জ্বালায়, জিকির হৃদয়ে প্রশান্তি সৃষ্টি করে এবং দোয়া মানুষকে আল্লাহর সাহায্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তাই একজন মুসলিমের স্বপ্ন ও কর্মজীবনের সঙ্গে ইবাদতের সুন্দর সমন্বয় থাকা উচিত।
স্বপ্ন পূরণের পথে লোভ একটি বড় বাধা। মানুষ যখন সীমাহীন লোভে আক্রান্ত হয়, তখন সে অনেক সময় নৈতিকতা বিসর্জন দিতে শুরু করে। অথচ প্রকৃত সমৃদ্ধি কেবল সম্পদের পরিমাণে নয়; বরং অন্তরের প্রশান্তি, হালাল উপার্জন, নৈতিক জীবন ও আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যেই প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। তাই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে কখনো হারাম ও অন্যায়ের পথ বেছে নেওয়া উচিত নয়।
ক্ষমা, ধৈর্য ও সহনশীলতাও সুন্দর জীবনের অপরিহার্য গুণ। মানুষের সঙ্গে চলতে গেলে মতপার্থক্য হবেই। কেউ ভুল করবে, কেউ কষ্ট দেবে, আবার কখনো নিজেরও ভুল হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ ও বিদ্বেষের পরিবর্তে ন্যায়, সংযম ও ক্ষমার পথ বেছে নেওয়া উত্তম। ক্ষমা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং অনেক সময় এটি আত্মসংযম ও মহত্ত্বের পরিচয়।
প্রকৃতির প্রতিও মানুষের দায়িত্ব রয়েছে। আকাশ, বাতাস, নদী, পাহাড়, বৃক্ষ, প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য আল্লাহর সৃষ্টি। এগুলোর প্রতি যত্নশীল হওয়া মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। বৃক্ষরোপণ, পানি ও পরিবেশ সংরক্ষণ, অপচয় রোধ এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মতো কাজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়তে সাহায্য করে। তাই একটি সুন্দর স্বপ্নের মধ্যে পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের স্বপ্নও থাকতে হবে।
সত্যিকারের স্বপ্ন মানুষকে শুধু নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায় না; বরং তাকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। একজন ধনী ব্যক্তি যদি সম্পদের মাধ্যমে অসহায়ের উপকার করেন, একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যদি জ্ঞান ছড়িয়ে দেন, একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন এবং একজন দক্ষ মানুষ যদি নিজের দক্ষতা সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁদের স্বপ্ন সত্যিকার অর্থে সার্থক হয়।
সাফল্যের সংজ্ঞাও তাই নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু উচ্চ পদ, বিপুল অর্থ, খ্যাতি বা বাহ্যিক মর্যাদা অর্জনই সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো ঈমানকে অটুট রেখে হালাল পথে জীবনযাপন করা, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা, পরিবারকে ভালো রাখা, সমাজের কল্যাণে কাজ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। দুনিয়ার সাফল্য ক্ষণস্থায়ী হতে পারে; কিন্তু নেক আমল ও আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তাই স্বপ্ন দেখো—কিন্তু স্বপ্নকে সত্য ও সৎ পথে পরিচালিত করো। জ্ঞান অর্জনের স্বপ্ন দেখো, চরিত্রবান হওয়ার স্বপ্ন দেখো, মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখো, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখো, পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখো এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের স্বপ্ন দেখো। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য পরিশ্রম করো, ধৈর্য ধরো, নিজের ভুল সংশোধন করো এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখো।
মনে রাখতে হবে, স্বপ্নপূরণ জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; বরং কীভাবে স্বপ্ন পূরণ করা হচ্ছে—সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যায়ের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য প্রকৃত সাফল্য নয়। সততা, শ্রম, জ্ঞান, নৈতিকতা ও ঈমানের মাধ্যমে অর্জিত অল্প সাফল্যও অনেক মূল্যবান। কারণ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার সম্পদে নয়, তার চরিত্রে; তার ক্ষমতায় নয়, তার ন্যায়বোধে; তার খ্যাতিতে নয়, তার সৎকর্মে।
সুতরাং আসুন, আমরা স্বপ্নকে পরিত্যাগ না করে তাকে সুন্দর ও কল্যাণময় পথে পরিচালিত করি। স্বপ্নের সঙ্গে জ্ঞানকে যুক্ত করি, জ্ঞানের সঙ্গে আমলকে যুক্ত করি, আমলের সঙ্গে নৈতিকতাকে যুক্ত করি এবং সবকিছুর সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষাকে যুক্ত করি। আমাদের স্বপ্ন হোক এমন—যেখানে নিজের উন্নতির সঙ্গে অন্যের কল্যাণ জড়িয়ে থাকবে; ব্যক্তিগত সাফল্যের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব থাকবে; দুনিয়ার কল্যাণের সঙ্গে আখিরাতের প্রস্তুতিও থাকবে।
স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে তাই এগিয়ে চলতে হবে—সত্যের পথে, শ্রমের পথে, জ্ঞানের পথে, ইবাদতের পথে, মানবতার পথে। যে স্বপ্ন মানুষের হৃদয়ে আশা জাগায়, চরিত্রকে সুন্দর করে, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে শেখায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়—সেই স্বপ্নই সত্যিকারের সুন্দর স্বপ্ন।
পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের স্বপ্নকে সৎকর্মে রূপান্তরিত করেন, আমাদের প্রচেষ্টায় বরকত দান করেন, ব্যর্থতার সময় ধৈর্য দেন, সাফল্যের সময় বিনয় দান করেন এবং আমাদের জ্ঞান, ঈমান, চরিত্র, কর্ম ও মানবসেবাকে কবুল করেন। আমাদের জীবন যেন শুধু নিজের জন্য নয়, মানুষের কল্যাণের জন্যও উৎসর্গিত হয়। দুনিয়ায় কল্যাণ এবং আখিরাতে সফলতা—এই হোক আমাদের জীবনের মহৎ স্বপ্ন ও পবিত্র প্রত্যাশা।
স্বপ্ন থাকুক হৃদয়ে,
সততা থাকুক কর্মে,
ঈমান থাকুক অন্তরে,
মানবতা থাকুক আচরণে,
আর আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকুক জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে।
১৪
২৪ মন্তব্য