প্রধান শিক্ষক
১৫ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
শতভাগ জিপিএ ফাইভের পেছনে নৃশংসতা, কাদির মোল্লাকে গ্রেফতার দাবি
শতভাগ জিপিএ ফাইভের পেছনে নৃশংসতা, কাদির মোল্লাকে গ্রেফতার দাবি
রবি ও তপন (ছদ্ম নাম) দুই বন্ধু। দুজনই নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে বছর বোর্ডের অধীনে একসঙ্গে রেজিস্ট্রেশন করে তারা। একসঙ্গেই এ বছর তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। রবি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার মুখে হাসি, পরিবারে উচ্ছ্বাস।
কিন্তু ভিন্ন চিত্র তপনের পরিবারে কান্না। তপন এবার পরীক্ষাতেই বসতে পারেনি। একই বিদ্যালয়ে পড়ে, একসঙ্গে রেজিস্ট্রেশন করেও নির্বাচনি পরীক্ষার নামে বাদ দিয়েছে তপনকে। শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে গেছে একটি বছর। মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছে এ শিক্ষার্থী১০ আগস্ট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরপরই ডেমরার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, সারাদেশের বিভিন্নি শাখার ক্যামব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ ও সামসুল হক খান স্কুল এন্ড কলেজসহ কয়েকটির বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিভাবকরা প্রশ্ন তুলেছেন, ফাসিস্ট আমলের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও দীপু মনি কেন মাহবুব মোল্লা ও সামসুল হক খান স্কুলে ঘন ঘন যেতেন? কেন আওয়ামী লীগের ওবায়দুল কাদে ৬৩ বার মাহবুব মোল্লা ও সামসুল হক স্কুলে গেছেন?জিপিএ ফাইভ ব্যবসায়ী ক্যামব্রিয়ান কলেজের লায়ন বাশার কারগারে গেলেও মোল্লা কেন বাইরে? কোন একজন এমপি গত ছয়মাসে ঘন ঘন ওই কলেজে যাচ্ছেন?
একাধিক অভিভাবক ফেসবুকে দাবি করেছেন কাদির মোল্লাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করার। তারা প্রশ্ন তুলেছেন কাদির মোল্লা কলেজের সঙ্গে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তাদের দহরম মহরম কেন? কেন পরীক্ষা নিয়ুন্ত্রকরা ঘনঘন ওই প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হয়ে যান? সিসি ক্যামেরা দেখতে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড থেকে কারা গিয়েছিলেন? ঢাকা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আমিরুল আলম পলাশসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেই এনকেএমসহ সব জালিয়াতদের জারিজুরি ফাঁস হবে।
তিতাসের সমালোচিত সাবেক কোটিপতি মিটার রিডার ও এনকেএম স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা কাদির মোল্লাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা। একজন কুখ্যাত দুনীতিবাজকে কেন শিক্ষাখাত ধবংসের সুুযোগ করে দেওয়া হলো। তাকে গ্রেফতার করলেই শতভাগ জিপিএ ফাইভের আসল রহস্য জানা যাবে বলে বিশ্বাস তাদের।
এদিকে গত ১১ আগস্ট বেসরকারি টেলিভিশন চানেল আইয়ের এক অনুষ্ঠানে দৈনিক শিক্ষাডটকম পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক সিদ্দিকুর রহমান খান শতভাগ পাসের নেপথ্যে নৃশংসতা, শুভংকরের ফাঁকি ও কারসাজির খতিয়ান তুলে ধরেছেন। বিস্তারিত দেখুন লিংকে...
নবম থেকে এসএসসি, ঝরে গেছে ২১৯ শিক্ষার্থী
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস্ থেকে মোট ৬০১ জন শিক্ষার্থী নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন করে। অথচ এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে ৩৮২ জন। অর্থাৎ, নবম থেকে দশম শ্রেণি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় বসার আগেই ঝরে পড়তে বাধ্য হয়েছেন ২১৯ শিক্ষার্থী।
অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মনে প্রশ্ন উঠেছে—ফলাফলের দিক থেকে এতো ভালো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেন ২১৯ জন শিক্ষার্থী ঝরে যাবে? দুই বছরে এতো শিক্ষার্থী ঝরে গেলে সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে শ্রেষ্ঠ হয়?
অভিভাবক ও বোর্ড কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মূলত নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল ভুয়া পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তারা টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন অস্বাভাবিক কঠিন ও জটিল করে। দ্বিতীয়ত—খাতা মূল্যায়নের সময় উত্তর লিখলে বোর্ড পরীক্ষায় যেখানে ১০ নম্বর দেওয়া হয়, টেস্টের খাতায় সেখানে স্কুলের শিক্ষকরা ৫ নম্বর দেন। যারা অনেক বেশি নম্বর পেয়ে টেস্টে পাস করে, তারা বোর্ডের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার উপযোগী ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছুটা দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা ঝরে যায়। এতে বোর্ড পরীক্ষায় স্কুলের শতভাগ পাস ও শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জন হয় এবং নামমাত্র খ্যাতি বাড়ে।
জানা যায়, এ কৌশল অবলম্বন করে বহু বছর ধরে শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের তকমা লাগিয়েছে স্কুলটি। ২০১৭, ২০২২, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে শতভাগ জিপিএ-৫ পায় স্কুলটির শিক্ষার্থীরা। প্রত্যেকবারই নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল কর্তৃপক্ষ একই কৌশল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন স্কুলটির সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি বলেন, কোনো অপকৌশল নেই। আর ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের সব কর্তাই আমাদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রাখেন। এতে দোষের কিছু নেই। আমাদের ভালো ফলাফলে অনেকেই হিংসা করেন।
জানা যায়, নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলে ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৬০১ জন। তাদের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে দশম শ্রেণিতে ওঠে ৪৮৩ জন। এতে নবম থেকে দশমে উঠতেই ১১৮ জন ঝরে যায়। দশম শ্রেণিতে যে টেস্ট বা নির্বাচনি পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে ৩১৪ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। বাকি ১৬৯ জন বাদ পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, নাছিমা কাদের মোল্লা স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় পাসের নম্বর কখনো ৫০ কখনো ৬০ আবার কখনো জিপিএ-৫ না পেলে সেসব শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না। তারা এসএসসির বোর্ড পরীক্ষায়ও অংশ নিতে দেওয়া হয় না।
ওসমান গণি সোহেল ্নামের একজন শিক্ষক বলেছেন, বাকিয়া জান্নাত নামের তার একজন ছাত্রীকে এনকেএম স্কুল টিসি দেয় পরে সে সানবীম স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে এ প্লাস পেয়েছে ।
নির্বাচনি পরীক্ষায় ‘টেনেটুনে’ পাস করেও বোর্ডে জিপিএ-৫!
স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি—তাদের ৩১৪ ছাত্র-ছাত্রী নির্বাচনি পরীক্ষায় পাস করেছিল। রিটেক বা পুনরায় নেওয়া পরীক্ষায় আরও ৬৮ জন পাস করে। তাহলে টেনেটুনে পাস করা শিক্ষার্থীরা তিনমাসের ব্যবধানে কীভাবে সবাই জিপিএ-৫ পেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিভাবকদের অভিযোগের অন্ত নেই
বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ানোর সরকারি নির্দেশ মানে না এনকেএম হোমস। লটারী করে ভর্তি করার কথা থাকলেও তা করে না।
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রেশন করেও এসএসসি পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের অভিযোগের শেষ নেই।
এক ছাত্রের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে ক্লাস ফাইভ (পঞ্চম) শ্রেণি থেকে নাছিমা কাদির মোল্লায় পড়ছে। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতেও পড়লো, প্রতিবছর পাস করলো। অথচ টেস্ট পরীক্ষায় ফেল! তাহলে এর দায় শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের নাকি শিক্ষার্থীর?’
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল কর্তৃপক্ষ নির্বাচনি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি বলে স্বীকার করেছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে, তারা শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের এসএসসির ফরম পূরণ করতে দিয়েছে। এক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি ধরলেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে দৈনিক শিক্ষাডটকমকে জানিয়েছন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষায় পাস বা ফেল হিসাব কষা হবে কেন? সেখানে তো পাস বা ফেলের কিছু নেই। শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেবে, তাহলেই সে ফরম পূরণ করতে পারবে। বাছাই করার কোনো নিয়ম বা সুযোগ নেই। এ বাছাই শুধু নিজেদের স্কুলের কথিত ভালো ফল জাহির করতে করা হয়।’
শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠান প্রধানদের খুব শিগগিরই র্বোড অফিসে ডাকা হবে বলেও চেয়ারম্যান জানান।।
১৪
২৪ মন্তব্য