Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ আগস্ট, ২০২৬ ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের আচরণগত সংকট: কারণ ও করণীয়


প্রাথমিক বিদ্যালয় কেবল অক্ষর চেনার জায়গা নয়, এটি শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশের প্রথম আনুষ্ঠানিক ভিত। কিন্তু আমাদের দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি কঠিন সত্য সামনে আসে—এখানকার একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী আসে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া বা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। এসব শিশুর অনেকের মধ্যে স্কুলের শৃঙ্খলা না মানা, ইউনিফর্ম পরতে অনীহা, বাড়ির কাজ না করা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত বাহ্যিক আচরণের প্রবণতা দেখা যায়। অভিভাবকদের অবহিত করলেও অনেক সময় আশানুরূপ সাড়া মেলে না।

এই আচরণগুলোকে নিছক "খারাপ আচরণ" বা "দায়িত্বহীনতা" হিসেবে দেখলে সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টিকে দেখতে হবে গভীর পারিবারিক ও সামাজিক সংকটের আলোকে।

আচরণের পেছনের আসল কারণ

১. পারিবারিক সচেতনতার অভাব নিম্নবিত্ত পরিবারের মা-বাবাকে জীবিকার সংগ্রামে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়। অনেক পরিবারে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ বা সন্তানকে গাইড করার মতো কেউ থাকে না। ফলে শিশু নিজেও বুঝতে পারে না কেন নিয়ম মানা বা হোমওয়ার্ক করা জরুরি—এটি তার কাছে শুধুই একটি চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশনা মনে হয়।

২. সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব শিশুর ভাষা ও আচরণ মূলত তার আশপাশের পরিবেশের প্রতিফলন। ঘরের বাইরে যে পরিবেশ সে দেখে বেড়ে ওঠে, সেটাকেই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে স্কুলেও প্রকাশ করে। পারিবারিক অস্থিরতা, আর্থিক টানাপোড়েন বা বড়দের আচরণের ছাপ শিশুর মনস্তত্ত্বে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

৩. হীনমন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতা মধ্যবিত্ত বা তুলনামূলক সচ্ছল সহপাঠীদের সঙ্গে পোশাক, উপকরণ বা জীবনযাত্রার পার্থক্য দেখে অনেক শিশু অবচেতনে হীনমন্যতায় ভোগে। এই ক্ষোভ বা নিরাপত্তাহীনতা থেকেই জন্ম নেয় জেদ, অবাধ্যতা বা আত্মরক্ষামূলক আক্রমণাত্মক আচরণ।

পরিবর্তনের উপায় ও করণীয়

সমস্যাটিকে অভিযোগের দৃষ্টিতে না দেখে সহানুভূতি ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

১. শিক্ষকের ভূমিকা: শাসন নয়, সহানুভূতি কঠোর শাস্তির চেয়ে 'পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট' বা ইতিবাচক উৎসাহ এসব শিশুর ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। ছোট্ট একটি ভালো কাজের জন্য শ্রেণিকক্ষে প্রকাশ্যে প্রশংসা করা, শৃঙ্খলার সুফল সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা—এসব শিশুর আচরণে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

২. অভিভাবক সমাবেশ ও কাউন্সেলিং শুধু অভিযোগ না করে নিয়মিত (প্রতি মাসে বা দুই সপ্তাহে) অভিভাবক সেশনের আয়োজন করা উচিত, যেখানে শিক্ষার গুরুত্ব, পরিচ্ছন্নতা ও শিশুর সঙ্গে সুন্দর আচরণের প্রয়োজনীয়তা সহজ ও গ্রহণযোগ্য ভাষায় তুলে ধরা হবে।

৩. স্কুলের পরিবেশকে আকর্ষণীয় করা শিশু কেন ইউনিফর্ম পরতে বা ক্লাসে বসতে চায় না, তা বোঝা জরুরি। গান, খেলাধুলা, ছবি আঁকা ও দেয়াল পত্রিকা তৈরির মতো সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয়কে শিশুর কাছে আনন্দের জায়গা করে তুলতে হবে, যাতে সে নিজ থেকেই স্কুলে আসতে আগ্রহী হয়।

৪. সামাজিক দায়বদ্ধতা ও কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এলাকার সচেতন নাগরিক, শিক্ষিত যুবসমাজ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। স্কুলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাউন্সেলিং, অতিরিক্ত ক্লাস বা মেন্টরিং কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা গেলে এই শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা সহজতর হবে।

৫. প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থা বিদ্যালয় পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষাউপকরণ, উপবৃত্তি বা মিড-ডে মিলের মতো সহায়তা কার্যক্রম নিয়মিত ও সমতাভিত্তিকভাবে পরিচালিত হলে অনেক পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও লাঘব হয়, যা শিশুর নিয়মিত ও আচরণগত মানোন্নয়নে পরোক্ষভাবে সহায়ক হয়।

একটি শিশুর খারাপ আচরণ বা অসচেতনতা তার একার দোষ নয়; এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোরই প্রতিফলিত রূপ। শাস্তি বা অবহেলা দিয়ে শিশুর আচরণ সংশোধন করা যায় না। ভালোবাসা, ধৈর্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে এই শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে এনে দায়িত্বশীল ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে।

 

মন্তব্য করুন