সহকারী শিক্ষক
২৬ আগস্ট, ২০২৬ ০৬:০৮ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ইসলাম ধর্মের ইতিহাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও আলোকোজ্জ্বল দিন হলো পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। এই দিনে সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদাযাত ও রহমতের বার্তা নিয়ে ধরাপৃষ্ঠে আগমন করেছিলেন শেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (স.)। বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত এই মহামানবের জন্মদিবসটি মুসলিম উম্মাহর কাছে ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.) বা ঈদে আজম নামে পরিচিত। ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.) উদযাপন কেবল একটি সাধারণ অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি মুমিনের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অফুরন্ত নবী প্রেমের সার্থক ও বাস্তব বহিঃপ্রকাশ।
ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.) কী?
'ঈদ' শব্দের অর্থ আনন্দ বা উৎসব এবং 'মিলাদ' শব্দের অর্থ জন্ম বা জন্মকাল। সুতরাং, 'ঈদ-ই মিলাদুন্নবী' অর্থ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর শুভাগমন বা জন্ম উপলক্ষে আনন্দ উৎসব করা। এই দিনটি কেবল প্রিয়নবীর জন্মস্মরণ নয়, বরং তাঁর সুমহান আদর্শ, সীরাত, মানবতা এবং বিশ্ববাসীর জন্য তাঁর আনীত শান্তির বার্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। কোরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা তাঁর নেয়ামত স্মরণ করতে এবং তাতে আনন্দ প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"বলুন, এটি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটি যা তারা জমা করে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।" (সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৮)
মহানবী (স.) হলেন মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত। তাই তাঁর আগমনে খুশি প্রকাশ করা কোরআনী নির্দেশনারই অন্তর্ভুক্ত।
নবী করিম (স.)-এর জন্মলগ্নে খুশি ও অসন্তুষ্টির স্বরূপ
মহানবী (স.)-এর পবিত্র দুনিয়াগমনের সময় পুরো মহাবিশ্ব আনন্দিত হয়েছিল, পক্ষান্তরে মানবকুলের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী ও সত্যবিমুখ ছিল, তারা নারাজ ও ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
কারা খুশি হয়েছিল:
প্রিয়নবীর জন্মলগ্নে সৃষ্টিজগতের কণা কণা আনন্দিত হয়েছিল। আসমানের ফেরেশতারা আনন্দোৎসবে মেতে উঠেছিলেন। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে কাবার চত্বরে উৎসব করেছিলেন। এমনকি ইতিহাসে বর্ণিত আছে, ইসলামের চরম শত্রু আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবা যখন নবীজীর জন্মের সুসংবাদ তাকে দেয়, তখন সে খুশিতে সুয়াইবাকে মুক্ত করে দিয়েছিল। এই খুশির স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি সোমবার তার আযাবের মাত্রা কিছুটা হালকা করা হয় বলে হাদিসে এসেছে। আমিনা রহ. তাঁর গর্ভকালীন ও জন্মলগ্নে স্বয়ং ফেরেশতাদের মাধ্যমে বিশেষ বারতা ও নূর বা আলোর ঔজ্জ্বল্য দেখতে পেয়েছিলেন।
কারا নারাজ হয়েছিল:
মক্কার তৎকালীন দাম্ভিক ও কাফের সমাজ, বিশেষ করে আবু জাহেল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এই নবজাতকের আগমনে ভীত ও নারাজ হয়েছিল। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, এই মহামানবের আগমন তাদের মিথ্যা অহংকার, কুসংস্কার ও বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থার পতন ডেকে আনবে।
ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.)-এ খুশি হওয়া বনাম বিরোধিতা করা
আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্তিতে আনন্দ প্রকাশ করা মুমিনের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য, আর এর বিরোধিতা করা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ।
খুশি হওয়া কিসের লক্ষণ:
নবীজীর আগমনে খুশি হওয়া হলো খাঁটি ঈমান, পরিপূর্ণ ভালোবাসা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের বহিঃপ্রকাশ। একজন আশেক বা প্রকৃত মুমিন যখন নবীজীর জন্মদিবস পায়, তখন তাঁর হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এটি সৌভাগ্য ও ঈমানের পরিচায়ক।
বিরোধিতা করা কিসের লক্ষণ:
পক্ষান্তরে, রহমতের আগমনকে কেন্দ্র করে যারা বিরূপ মনোভাব পোষণ করে বা বিরোধিতা, তা সংকীর্ণ মানসিকতা, নবীপ্রেমের ঘাটতি এবং অজ্ঞতার লক্ষণ। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামতের প্রকাশে যারা ভ্রুকুচি করে, তারা মূলত হেদায়াত থেকে বঞ্চিত।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.)-এর বাস্তবতা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নবী-রাসুলগণের জন্মদিবস বা বিশেষ দিনগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ করেছেন। যেমন হযরত ঈসা (আ.) তাঁর জন্মদিবসের ব্যাপারে বলেছেন:
"আর আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।" (সূরা মারিয়াম, আয়াত ৩৩)
যেহেতু হযরত ঈসা (আ.) নিজের জন্মদিনের শান্তি ও মর্যাদার কথা বলেছেন, সেহতু সমস্ত নবীদের সর্দার, খাতামুন্নাবিয়্যিন হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জন্মদিবস সারা বিশ্বের মানুষের জন্য আরও কত না বড় শান্তির ও আনন্দের বিষয়।
হাদিস শরীফেও এর প্রমাণ রয়েছে। প্রিয়নবী (স.) নিজে তাঁর জন্মবারবার উদযাপন করেছেন রোজা রাখার মাধ্যমে। সাহাবি আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে প্রতি সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ইরশাদ করেন:
"এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার প্রতি ওহি নাজিল করা হয়েছে।" (সহিহ মুসলিম)
নবীজী নিজেই নিজের জন্মবারবারকে ইবাদত ও শুকরিয়ার মাধ্যমে স্মরণ করেছেন, যা মিলাদুন্নবী উদযাপনের এক অনন্য ভিত্তি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাসূলদের আগমনের বার্তাকে মানবজাতির জন্য হেদায়েতের প্রধান উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন:
"আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।" (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ১০৭)
ব্যাখ্যা: নবী (স.) যেহেতু 'রহমাতুল্লিল আলামিন' বা বিশ্বজগতের জন্য রহমত, তাই তাঁর আগমনী দিবস বা মিলাদুন্নবী উদযাপন করা প্রকারান্তরে আল্লাহর সেই মহান রহমতের শোকর গুজার করা। যে ব্যক্তি বিশ্বজগতের জন্য রহমত নিয়ে এসেছেন, তাঁর পৃথিবীতে আগমনকে কেন্দ্র করে আনন্দ করা মোমিনের ঈমানী দায়িত্বের অংশ।
নবীজীর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার গুরুত্ব (হাদিসের দলিল)
নবী (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা যে ঈমানের মূল ভিত্তি, তার প্রমাণ হাদিসে স্পষ্ট। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন:
"তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং পৃথিবীর সকল মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
ব্যাখ্যা: নবী প্রেমের এই হাদিসটিই ঈদ-ই মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রধান অনুপ্রেরণা। একজন মোমিন যখন নবীজীর জন্মদিনে আনন্দ প্রকাশ করে, তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করে এবং তাঁর সীরাত আলোচনা করে, তখন তার হৃদয়ে নবীজীর প্রতি ভালোবাসা আরও দৃঢ় হয়। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই; বরং প্রিয়জনের স্মরণে আনন্দ করা এবং তাঁর গুণকীর্তন করা ভালোবাসারই স্বাভাবিক দাবি।
পূর্বসূরিদের যুগে মিলাদুন্নবী (স.) উদযাপন
নবী করিম (স.), সাহাবা কেরাম, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈনগণের যুগ থেকেই প্রিয়নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের বিভিন্ন রূপ প্রচলিত ছিল।
সাহাবা কেরাম (রা.): হযরত হাসান ইবনুল সাবিত (রা.) এবং অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবিগণ নবীজীর শানে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি করতেন, সীরাত আলোচনা করতেন এবং নবীজীর জন্ম ও গুণকীর্তন করে মজলিস করতেন। রাসুল (স.) মসজিদে হাসান (রা.)-এর জন্য মিম্বর স্থাপন করে দিয়েছিলেন যাতে তিনি নবীজীর প্রশংসা ও ইসলামের প্রচার করতে পারেন।
তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈনগণ:
ইসলামের সোনালী যুগে ইমাম সুয়ূতি (র.), আল্লামা ইবনুল জাওযী (র.), এবং ইবনে কাছির (র.)-এর মতো প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ মিলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। ইবনুল জওযী লিখেছেন, সারা বিশ্বে মিলাদুন্নবী উদযাপনের মাধ্যমে শান্তি ও বরকত বর্ষিত হয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, মুসলিম জাহানের বিভিন্ন যুগে খলিফা ও আমীরগণ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে দান-খয়রাত করার মাধ্যমে এই পবিত্র দিনটি পালন করে আসছেন।
নবী প্রেমের বহিঃপ্রকাশ: ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.)
দিনশেষে ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.) হলো কলিজার টুকরা নবীজীর প্রতি নিখাদ ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। মানুষের জীবন যখন পার্থিব মোহ ও অন্ধত্বে ডুবে থাকে, তখন ১২ রবিউল আউযালের আলোয় মানুষ আবার ফিরে পায় মানবতার ঠিকানা। মিলাদুন্নবীর মিলাদ মাহফিলগুলোতে যখন নবীর পবিত্র সীরাত, তাঁর চরিত্র, তাঁর নমনীয়তা, তাঁর দয়া ও ক্ষমার গুণাবলী আলোচনা করা হয়, তখন তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ নতুন করে দীক্ষিত হয় আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রত্যয়ে।
এই দিনে মিলাদুন্নবীর আনন্দ মিছিল, দরুদ পাঠ, কোরআন খতম, এবং গরিবদের মাঝে খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ। এই উৎসব কোনো মনগড়া প্রথা নয়, বরং এটি আত্মাকে প্রিয়নবীর সান্নিধ্যে সিক্ত করার এক ঐশ্বরিক সুযোগ।
পরিশেষে বলা যায়, ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (স.) উদযাপন করা মানেই নবীজীর আদর্শকে নতুন করে অন্তরে ধারণ করা। নবীপ্রেমই ইমানের মূল প্রাণশক্তি। যতদিন এই ধরায় ঈমানের আলো থাকবে, ততদিন পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল বিশ্ববাসীর হৃদয়ে আলো ছড়াবে আনন্দের জোয়ারে। প্রিয়নবীর প্রতি আমাদের হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকে দরুদ ও সালাম- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। (Collected)
১
১ মন্তব্য