সহকারী শিক্ষক
২৮ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৯ অপরাহ্ণ
নম্বর ও মানসিক চাপ: এসএসসি-২৬ পরীক্ষার্থীরা আসলে কী শিখল
নম্বর ও মানসিক চাপ: এসএসসি-২৬ পরীক্ষার্থীরা আসলে কী শিখল

প্রাসঙ্গিক বাস্তবতার আলোকে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাসের হারে একটি দৃশ্যমান পতন ঘটেছে। বিশেষ করে আমাদের হাওর অঞ্চল ও প্রান্তিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে ফলের এই নিম্নগতি কিছুটা অনুমেয়ই ছিল। তবে এ ফলের জন্য ঢালাওভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর সব দায় চাপিয়ে দেওয়া বা চড়াও হওয়াটা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। সচেতন মহলের অনেকেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দোষারোপ করছেন; কেউ কেউ আবার বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে নিয়ে কটূক্তি করছেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এই শিক্ষার্থীরা নবম শ্রেণিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারিকুলামে পড়াশোনা করেছিল। বর্তমানে অবশ্য সেই নতুন কারিকুলাম কার্যকর নয়; চলছে চিরাচরিত কারিকুলামের (সৃজনশীল) পরিমার্জিত (রিভাইজড) ভার্সন। এই বিবেচনায় এবারের ফলকে কোনোক্রমেই একেবারে অস্বাভাবিক বলা যায় না। পরিবর্তিত কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতির রূপান্তর এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নিরপেক্ষ কঠোরতা—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা একটি ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পাবলিক পরীক্ষার ফলের একটি নির্দিষ্ট ধারা বজায় ছিল। পূর্বে অনেক সময় ২০-২৫ নম্বরকে খাতা মূল্যায়নের নমনীয়তার মাধ্যমে ৩৩ বানিয়ে পাসের হার বাড়ানো হতো বলে সচেতন মহলে অভিযোগ আছে, ফলে অনেক শিক্ষার্থী, যাদের আসলে পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কথা, তারাও পাস করে যেতো। এতে শিক্ষার্থীদের মনে একটি বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিল যে, খাতায় কিছু একটা লিখে এলেই পাস করা সম্ভব। ফলস্বরূপ, একজন শিক্ষার্থী বাস্তবে কতটুকু শিখল, তার চেয়ে পরীক্ষায় কত নম্বর পেল সেটিই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। এই প্রক্রিয়ায় মারাত্মক শিখনঘাটতি নিয়েই অসংখ্য শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসি পাসের সনদ হাসিল করেছে। এবারের ফল মূলত সেই কৃত্রিম বাস্তবতার ভেতরের পুঞ্জীভূত প্রকৃত চিত্রটিই আমাদের সামনে এনে দিয়েছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহল ও নীতিপ্রণেতারা অবশেষে অনুধাবন করতে পেরেছেন যে এই মানহীন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার মান, জবাবদিহি ও তদারকি বৃদ্ধিতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; যেমন বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, সরাসরি ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবীক্ষণ, নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন, পুরোনো শিক্ষা আইন ও নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার মান বাড়ানো। তবে কোনো পরিবর্তনই রাতারাতি কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত শিখনঘাটতি কাটিয়ে উঠতে ধারাবাহিক ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ অপরিহার্য।
পারিপার্শ্বিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাকে কখনোই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ নিয়মিত খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যেমন সহায়ক, তেমনি তা শৃঙ্খলা, দলগত কাজ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে অপরিহার্য। প্রান্তিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে তো খেলার মাঠ ও সরঞ্জামের অভাবই প্রকট। এ অবহেলা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশকে ক্ষুণ্ন করছে এবং পরোক্ষভাবে পরীক্ষার ফলের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে, আশার কথা বর্তমান সরকার এই বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে খেলাধুলাকে শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে এসেছে।
-(1).gif)


১৪
২৪ মন্তব্য