Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ

সৃষ্টির সেবা - মোঃ মুজিবুর রহমান

সৃষ্টির সেবা

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

মানুষ সামাজিক জীব। সে একা বাঁচতে পারে না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ পরিবার, সমাজ, প্রতিবেশী ও বৃহত্তর মানবসমাজের ওপর কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল। একইভাবে পৃথিবীর জীবজন্তু, পশুপাখি, বৃক্ষলতা, নদী-নালা, জলাশয় ও পরিবেশ—সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টির অংশ। তাই ইসলামের শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, রোগীর সেবা করা, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা এবং জীবজন্তুর প্রতিও দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে একজন মুমিন তার ঈমানের সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

প্রচলিত একটি বাণী হলো—

«الْخَلْقُ عِيَالُ اللهِ، فَأَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللهِ أَنْفَعُهُمْ لِعِيَالِهِ»

অর্থাৎ, “সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর পরিবার; আল্লাহর কাছে সৃষ্টির মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক প্রিয়, যে তাঁর সৃষ্টির অধিক উপকার করে।”

তবে বাণীটির সূত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। এটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত নয়; বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে এর বর্ণনা পাওয়া যায়, কিন্তু সনদের দুর্বলতার কথাও মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন।

তবু সৃষ্টির প্রতি দয়া, মানুষের উপকার ও কল্যাণ সাধনের মূল শিক্ষা কুরআন ও সহিহ হাদিসের বহু দলিল দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। যেমন, রাসুলুল্লাহ ﷺ পশুর প্রতিও দয়ার শিক্ষা দিয়েছেন এবং বলেছেন, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর সেবা করার মধ্যে সওয়াব রয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তির ক্ষমা পাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব কেবল সম্পদ, পদমর্যাদা, বংশ, বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক পরিচয়ে নয়; বরং তাকওয়া, সৎকর্ম, উত্তম চরিত্র এবং আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণে আত্মনিয়োগের মধ্যেই প্রকৃত মর্যাদা।

সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর সৃষ্টি

মহান আল্লাহ সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা, পালনকর্তা ও মালিক। মানুষ, ফেরেশতা, জিন, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, বৃক্ষলতা, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র—সবকিছু তাঁর সৃষ্টি।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ

অর্থাৎ, “পৃথিবীতে বিচরণশীল কোনো প্রাণী এবং দুই ডানায় উড়ে এমন কোনো পাখি নেই—যারা তোমাদের মতো একেকটি জাতি নয়।”
—
সূরা আল-আন‘আম, ৬:৩৮

এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, জীবজগৎও আল্লাহর সৃষ্টির একটি সুবিন্যস্ত অংশ। তাই কোনো প্রাণীর প্রতি অকারণে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন ইসলামী চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

ইসলাম মানুষকে মানুষের জন্য কল্যাণের উৎস হতে শিক্ষা দেয়। একজন মুসলমানের মুখ, হাত, আচরণ ও কর্ম যেন অন্য মানুষের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তির কারণ হয়।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ»

অর্থাৎ, “মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।”

অর্থাৎ শুধু নামের মুসলমান হওয়াই যথেষ্ট নয়; মুসলমানের চরিত্রে এমন গুণ থাকা প্রয়োজন, যাতে তার দ্বারা অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে।

সে কাউকে অপমান করবে না, অন্যায়ভাবে কষ্ট দেবে না, প্রতারণা করবে না, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না, দুর্বলকে অত্যাচার করবে না এবং কারও অসহায়ত্বকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির উপায় বানাবে না।

মানবসেবা একটি মহৎ ইবাদত

মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা ইসলামের একটি মহান নৈতিক শিক্ষা। একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, অসুস্থের সেবা করা, দরিদ্রকে সাহায্য করা, ঋণগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, এতিমের দায়িত্ব নেওয়া এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।

মহান আল্লাহ বলেন—

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ

“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো।”
—
সূরা আল-মায়িদা, ৫:২

এই আয়াত মুসলিম সমাজের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা। সমাজে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে মানুষ মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং কল্যাণের সহযোগী।

ক্ষুধার্তের মুখে হাসি ফোটানো

পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মানুষ আছে, যারা একবেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করে। কারও ঘরে খাবার নেই, কারও চিকিৎসার টাকা নেই, কারও সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। আবার কেউ কর্মহীন, কেউ ঋণগ্রস্ত, কেউ দুর্যোগে সর্বস্ব হারিয়েছে।

এমন মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ঈমানি চেতনারও প্রকাশ।

একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তি যদি তার সম্পদ থেকে দরিদ্রের জন্য কিছু ব্যয় করে, তবে তার সম্পদ কমে যায় না; বরং আল্লাহর কাছে তার আমলনামা সমৃদ্ধ হয়।

আল্লাহ বলেন—

وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ

“তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণ অগ্রে প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।”
—
সূরা আল-বাকারা, ২:১১০

অতএব, মানুষের জন্য করা ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। দুনিয়ায় মানুষ হয়তো তা ভুলে যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তা ভুলে যান না।

প্রতিবেশীর অধিকার ও সামাজিক দায়িত্ব

মানবসেবার সবচেয়ে কাছের ক্ষেত্র হলো নিজের পরিবার ও প্রতিবেশী।

কেউ যদি দূরের মানুষের জন্য বড় বড় দান করে, অথচ পাশের ঘরের অসহায় প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে—তাহলে তার মানবিকতার পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয়—তার প্রতি ন্যায়, সদাচরণ ও মানবিক আচরণ করা উচিত।

একজন প্রকৃত মুমিনের ঘর থেকে যেন প্রতিবেশীর জন্য কষ্ট, ভয় ও ক্ষতির পরিবর্তে শান্তি ও নিরাপত্তা ছড়িয়ে পড়ে।

পিতা-মাতা ও পরিবারের সেবা

মানবসেবার সূচনা হতে হবে নিজের ঘর থেকে।

মহান আল্লাহ বলেন—

وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

“পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো।”
—
সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩

বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা করা, তাদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলা, তাদের প্রয়োজন পূরণ করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা সন্তানের অন্যতম দায়িত্ব।

পরিবারের ছোটদের প্রতি স্নেহ, বড়দের প্রতি সম্মান, স্ত্রী-স্বামীর পারস্পরিক অধিকার রক্ষা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখাও মানবসেবার অন্তর্ভুক্ত।

যে ব্যক্তি বাইরে মানুষের সামনে ভদ্র কিন্তু ঘরের মানুষের প্রতি কঠোর, তার চরিত্রে পূর্ণতা আসেনি।

এতিম, অসহায় ও দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো

সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এতিম শিশু পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত। বিধবা নারী স্বামীর সহায়তা থেকে বঞ্চিত। দরিদ্র পরিবার অর্থের সংকটে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজে অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করেন।

তাদের অবহেলা না করে সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে সাহায্য করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ ۝ وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ

“সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না এবং সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দিও না।”
—
সূরা আদ-দুহা, ৯–১০

এ শিক্ষা শুধু দান করার নয়; বরং সম্মানের সঙ্গে দান করার শিক্ষা। কাউকে সাহায্য করে তাকে অপমান করা ইসলামের সৌন্দর্যের পরিপন্থী।

প্রাণীর প্রতিও দয়া

ইসলামের মানবিকতা শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবজন্তুর প্রতিও দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা ইসলাম দিয়েছে।

সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল। আল্লাহ তার এ কাজকে কবুল করে তাকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “পশুপাখির প্রতিও কি আমাদের সওয়াব আছে?” রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন—

«فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ»

অর্থাৎ, “প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে।”

এই হাদিস আমাদের হৃদয়ে গভীর মমতা সৃষ্টি করে। একটি প্রাণী কথা বলতে পারে না বলে তার কষ্টের মূল্য নেই—এ ধারণা ইসলামের নয়।

তাই পশুকে অকারণে নির্যাতন করা, ক্ষুধার্ত রাখা, তৃষ্ণার্ত রাখা বা বিনা কারণে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা

আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবীতে দায়িত্বশীল হিসেবে রেখেছেন। মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া আমানতের রক্ষণাবেক্ষণকারী।

অতএব নদী-নালা দূষিত করা, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করা, পানি অপচয় করা, পরিবেশ নষ্ট করা এবং জীববৈচিত্র্যের প্রতি অযথা ক্ষতি করা একজন সচেতন মুসলমানের আচরণ হতে পারে না।

আল্লাহ বলেন—

وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا

“পৃথিবীতে সংশোধনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।”
—
সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৫৬

অতএব, পরিবেশ রক্ষাও বৃহত্তর অর্থে সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীলতার অংশ।

সেবার জন্য ধনী হওয়া শর্ত নয়

মানুষের উপকার করার জন্য কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া জরুরি নয়।

এক গ্লাস পানি, একটি ভালো কথা, একজন অসুস্থ মানুষের পাশে কিছুক্ষণ বসা, একজন বৃদ্ধকে রাস্তা পার করে দেওয়া, একজন ছাত্রকে জ্ঞান দেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সান্ত্বনা দেওয়া, পথহারা মানুষকে পথ দেখানো—এসবও কল্যাণের কাজ।

কখনো একটি হাসি, একটি সান্ত্বনার বাক্য কিংবা আন্তরিক একটি দোয়া মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে—

দান শুধু অর্থের নয়; সময়ও দান, শ্রমও দান, জ্ঞানও দান, ভালোবাসাও দান, সহানুভূতিও দান।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মানবসেবা

শিক্ষাক্ষেত্রেও সেবার মহৎ সুযোগ রয়েছে।

একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের পাঠদান করেন না; তিনি মানুষের চরিত্র গঠন করেন। একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পথ দেখানো, তার ভুল সংশোধন করা, দুর্বল শিক্ষার্থীকে বাড়তি সহযোগিতা করা এবং তার মধ্যে নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা অত্যন্ত মহৎ কাজ।

একজন শিক্ষার্থীও তার জ্ঞান অর্জন করে সমাজের উপকার করতে পারে।

তাই জ্ঞান এমন সম্পদ, যা নিজে ধারণ করে অন্যকে উপকৃত করলে আরও বিস্তৃত হয়।

মানবসেবায় নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

ইসলামে কাজের মূল্যায়নে নিয়তের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

কেউ যদি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করে, তাহলে তার উদ্দেশ্য হতে পারে লোকদেখানো। আবার কেউ যদি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের উপকার করে, তবে তার সামান্য কাজও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে।

তাই আমাদের প্রত্যেক কল্যাণকর কাজের আগে মনে রাখতে হবে—

“আমি মানুষের প্রশংসার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কাজ করছি।”

এই নিয়ত মানুষকে অহংকার থেকে রক্ষা করে এবং সেবাকে ইবাদতে পরিণত করে।

সেবা কখনো অন্যায়ের সহযোগিতা নয়

সৃষ্টির উপকার করার অর্থ সব ধরনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করা নয়।

ইসলাম ভালো কাজে সহযোগিতা করতে বলেছে, অন্যায় ও পাপের কাজে নয়।

আল্লাহ বলেন—

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

“পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।”
—
সূরা আল-মায়িদা, ৫:২

অতএব, কারও উপকার করতে গিয়ে অন্যের অধিকার নষ্ট করা, অপরাধে সহযোগিতা করা, প্রতারণা আড়াল করা বা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া মানবসেবা নয়।

প্রকৃত সেবা হলো ন্যায়, সত্য, কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে মানুষকে সহযোগিতা করা।

সৃষ্টির সেবায় বিনয় প্রয়োজন

কেউ মানুষের উপকার করে অহংকার করতে পারে না। কারণ সামর্থ্য, সম্পদ, জ্ঞান, সময়—সবই আল্লাহর দান।

আজ আমি কারও উপকার করছি; কাল হয়তো আমাকেই অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হবে।

তাই সাহায্য করার সময় মনে রাখতে হবে—

উপকার করছি আমি—এমন নয়; বরং আল্লাহ আমাকে কারও উপকার করার সুযোগ দিয়েছেন।

এই উপলব্ধি মানুষকে বিনয়ী করে।

সৃষ্টির উপকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য

মানুষের সেবা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু এর সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

একজন মুমিন মানুষের জন্য কাজ করবে, কিন্তু মানুষের কাছে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

সে দরিদ্রকে সাহায্য করবে, কিন্তু প্রতিদান আশা করবে না।

সে ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেবে, কিন্তু ছবি তুলে প্রচার করার প্রয়োজন অনুভব করবে না।

সে অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু তার দুর্বলতাকে প্রকাশ করে তাকে অপমান করবে না।

এটাই হলো ইখলাসপূর্ণ মানবসেবা।

আজকের সমাজে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

বর্তমান সমাজে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মানুষের হৃদয়ের দূরত্বও বেড়েছে।

কেউ নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্যের কথা ভাবতে চায় না। কোথাও বৃদ্ধ পিতা-মাতা অবহেলিত, কোথাও এতিম শিশু অসহায়, কোথাও দরিদ্র মানুষ চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছে, কোথাও প্রতিবেশী বিপদে অথচ পাশের মানুষ নির্বিকার।

এই পরিস্থিতিতে ইসলামের মানবিক শিক্ষা নতুন করে আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত করতে হবে।

আমাদের এমন সমাজ গড়তে হবে—

যেখানে শক্তিমান দুর্বলকে রক্ষা করবে,
ধনী দরিদ্রের পাশে দাঁড়াবে,
শিক্ষিত অশিক্ষিতকে জ্ঞান দেবে,
সুস্থ অসুস্থের সেবা করবে,
সচ্ছল অসচ্ছলের কষ্ট বুঝবে,
প্রতিবেশী প্রতিবেশীর খোঁজ নেবে,
এবং মানুষ মানুষকে মানুষ হিসেবেই সম্মান করবে।

কীভাবে আমরা সৃষ্টির উপকার করতে পারি?

প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস গড়ে তুললেই আমরা এই মহান শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারি—

১. পিতা-মাতার সেবা করা।
২. পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোমল আচরণ করা।
৩. প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া।
৪. ক্ষুধার্ত মানুষকে খাদ্য দেওয়া।
৫. অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা।
৬. এতিম ও দরিদ্রদের সহযোগিতা করা।
৭. বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
৮. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা।
৯. পথচারী ও বৃদ্ধদের প্রয়োজনমতো সাহায্য করা।
১০. শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া।
১১. পশুপাখিকে অকারণে কষ্ট না দেওয়া।
১২. তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি দেওয়া।
১৩. বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ করা।
১৪. পানি ও খাদ্যের অপচয় রোধ করা।
১৫. মানুষের সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করা।
১৬. অন্যায়, প্রতারণা ও জুলুম থেকে বিরত থাকা।
১৭. কারও মনে কষ্ট দিলে ক্ষমা চাওয়া।
১৮. অন্যের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
১৯. ভালো কথা বলা এবং কটু কথা থেকে বিরত থাকা।
২০. প্রতিটি কল্যাণকর কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।

উপসংহার

সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও দয়া ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রকাশ। একজন সত্যিকারের মুমিন কেবল নিজের মুক্তির চিন্তা করে না; বরং তার জীবন থেকে পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ, দেশ, মানবজাতি এবং জীবজগত উপকৃত হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, মানুষের উপকারের সর্বোচ্চ মর্যাদা তখনই, যখন তা ঈমান, ইখলাস, ন্যায়নীতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়।

আমরা যেন এমন মানুষ হই, যার হাতে কেউ নিরাপত্তাহীন না হয়, যার কথায় কেউ অপমানিত না হয়, যার সম্পদ থেকে দরিদ্র উপকৃত হয়, যার জ্ঞান থেকে অজ্ঞ আলোকিত হয়, যার হৃদয়ে অসহায়ের জন্য মমতা থাকে এবং যার আচরণে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রকাশ পায়।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ বর্ণিত শিক্ষায় প্রাণীর সেবাতেও সওয়াবের কথা এসেছে—অর্থাৎ দয়ার দরজা কত বিস্তৃত, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

সুতরাং আমাদের জীবনের একটি মহান অঙ্গীকার হতে পারে—

আমি কারও কষ্টের কারণ হব না;
যতটুকু পারি, মানুষের উপকার করব;
দুর্বলকে সাহায্য করব;
ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেব;
তৃষ্ণার্তকে পানি দেব;
প্রাণীর প্রতি দয়া করব;
প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করব;
এবং প্রতিটি কল্যাণকর কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করব।

কারণ দুনিয়ায় মানুষের জন্য কল্যাণের উৎস হয়ে ওঠা যেমন মহৎ চরিত্রের পরিচয়, তেমনি আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশাও জাগায়।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে দয়া, মমতা, ইখলাস ও তাকওয়ায় পরিপূর্ণ করে দিন। আমাদেরকে মানুষের, জীবজন্তুর এবং সমগ্র সৃষ্টির জন্য কল্যাণের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমাদের দ্বারা কারও ক্ষতি নয়, বরং উপকার সাধিত হোক। আমাদের সব সেবামূলক কাজ কবুল করুন এবং কিয়ামতের দিন আপনার সন্তুষ্টি ও রহমত নসিব করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ