Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:০৩ অপরাহ্ণ

কালো মেঘে ঢাকা দুটি রাত

কালো মেঘে ঢেকে থাকা দুটি রাত( পরীর মায়ের মূমুর্ষ অবস্থা)


সেদিন ছিল ৩০ আগস্ট, রবিবার।

সন্ধ্যা তখন নামতে শুরু করেছে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। দিনের শেষ আলোটুকু যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের ভেতর।

কিছু কিছু সন্ধ্যা আছে, যেগুলো শুধু সন্ধ্যা নয়—মনে হয়, জীবনের সমস্ত আলোও যেন একসঙ্গে নিভে যেতে শুরু করেছে।

ঠিক এমন এক মুহূর্তে ডাক্তার বললেন—,রোগীকে প্ল্যাটিলেট দিতে হবে।

আমি বললাম

—কত ব্যাগ?

এক ব্যাগ।

আমি তখনও জানি না, এক ব্যাগ প্ল্যাটলেট বলতে কী বোঝায়।

পরে জানলাম—চার ব্যাগ রক্ত থেকে তৈরি হয় এক ইউনিট প্ল্যাটলেট।

চার ব্যাগ!

মনে হলো, পৃথিবীটা যেন হঠাৎ আমার সামনে আরও বড় হয়ে গেল।

কোথায় পাব চার ব্যাগ রক্ত?

কোথায় পাব চারজন মানুষ?

তার ওপর চারদিকে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা। সবাই রক্ত খুঁজছে। সবাই প্ল্যাটলেট খুঁজছে।

সেদিন বুঝেছিলাম, প্রিয় একজন মানুষ যখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে, তখন একটি ব্যাগ রক্তের মূল্য কতটা।

হঠাৎ মনে পড়ল আরিফের কথা।

আরিফকে বলতেই সে এক মুহূর্ত দেরি করল না।

—আমি দেব।

কী অদ্ভুত! নিজের কোনো হিসাব নেই, কোনো অজুহাত নেই। শুধু একজন অসহায় ভাবীর পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত।

কিন্তু একজন দিয়ে তো হবে না।

আরও তিনজন চাই।

আমি ছুটছি।

আরিফ ছুটছে।

সঙ্গে শুনু মামা।

হঠাৎ শুনু মামা বলল—

—আমারও তো বি পজিটিভ!

সেদিন মনে হলো, অন্ধকারের মধ্যেও আল্লাহ মানুষকে মানুষ দিয়ে সাহায্য করেন।

আরও একজন পাওয়া গেল।

এরপর পরীর ছোট খালামনি, ছোট খালু, দুজনকে ম্যানেজ করলেন।

কেউ রক্ত দিলেন, কেউ ডোনার খুঁজলেন, কেউ রাতের অন্ধকারে হাসপাতালে ছুটে এলেন।

আমি শুধু ছুটছি।

কোথায় যাব, কী করব—কিছুই বুঝতে পারছি না।

রাত তখন প্রায় আটটা।

ডাক্তার বললেন, আদ-দ্বীনে গেলে প্ল্যাটলেট নেওয়ার ব্যবস্থা হতে পারে।

মনে প্রশ্ন—

এত রাতে কি ব্লাড ব্যাংক খোলা থাকবে?

তবু ছুটলাম।

কারণ তখন আর প্রশ্ন করার সময় নেই।

পরীর মায়ের জন্য যা করার, করতে হবে।

আদ-দ্বীনের ব্লাড ব্যাংকে পৌঁছে দেখি প্রচণ্ড ভিড়।

সবার চোখে একই উৎকণ্ঠা।

কেউ রক্তের জন্য এসেছে, কেউ প্ল্যাটলেটের জন্য, কেউ হয়তো নিজের প্রিয় মানুষটির জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করতে এসেছে।

সেখানে একজন আপা বসে ছিলেন।

কালো বোরকা। মাথায় স্কার্ফ। বাম হাতে কালো ঘড়ি।

প্রচণ্ড ব্যস্ত।

তবু আমি বললাম,

—আপা, প্ল্যাটলেট নিতে চাই।

তিনি বললেন—

—সম্ভব। আগে পেমেন্ট করে আসেন।

তারপর জানতে চাইলাম,

—আপা, কতক্ষণ খোলা থাকবে?

তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন—

আমাদের তো ২৪ ঘণ্টার ডিউটি। আমার ডিউটি রাত আটটা থেকে সকাল সাতটা।

সেদিন সেই কথাটা আমার কাছে কত বড় আশ্বাস ছিল, তা হয়তো তিনি কোনোদিন জানবেন না।

দুই ব্যাগের ব্যবস্থা হয়ে গেল।

কিন্তু আমার তো চার ব্যাগ দরকার।

বাকিটাও আসতে শুরু করল।

রাত বাড়ছে।

মানুষজন ক্লান্ত হচ্ছে।

কিন্তু আমার ক্লান্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

ল্যাবরেটরি আপা তখনও ছুটছেন।

এক মুহূর্ত বসার সুযোগ নেই তাঁর।

তবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—

—চিন্তা করবেন না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন। অধৈর্য হবেন না। একটা উপায় হবেই।

তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন—

—আপনার ছেলে-মেয়ে কয়জন?

বললাম—

—একজন।

তিনি বললেন—

—আল্লাহ চাইলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন—

—প্ল্যাটলেট কত?

বললাম—

—আঠারো হাজার।

তিনি বললেন—

ঘাবড়াবেন না। আরও কম প্ল্যাটলেট নিয়েও মানুষ বেঁচে গেছে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।

আমি জানি না, তিনি তখন একজন রোগীর স্বজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, নাকি একজন ভেঙে পড়া স্বামীকে একটু শক্ত হতে শেখাচ্ছিলেন।

আমি কানে কানে বললাম—

আপা, খুব সমস্যা। একটু দ্রুত করা যায়?

তিনি বললেন—

সর্বাত্মক চেষ্টা করব। মেশিনেরও তো সময় লাগে। তবে চিন্তা করবেন না। আপনার নম্বরটা দিয়ে যান। হয়ে গেলে ফোন দেব।

কয়টা বাজতে পারে?

আনুমানিক রাত চারটা।

আমি বললাম—

—ঠিক আছে। ফোন দিতে হবে না। আমি তার আগেই চলে আসব।

রাত তখন গভীর হচ্ছে।

হাসপাতালে  ফিরলাম প্রায় একটা বাজে।

দরজা খুলে দেখি—

পরীর মা সেভাবেই আছে।

আমি তার দিকে তাকালাম।

কিছু বলতে পারলাম না।

কী বলব?

স্বামীরা কখনো কখনো স্ত্রীর সামনে কাঁদতে পারে না।

শুধু আড়ালে গিয়ে কাঁদে।

সেদিনও তাই হলো।

মোবাইলে অ্যালার্ম দিলাম—রাত তিনটার।

কিন্তু ঘুম কোথায়?

চোখ বন্ধ করলেই শুধু পরীর মায়ের মুখ।

প্ল্যাটলেট আঠারো হাজার।

এই একটা সংখ্যাই যেন মাথার ভেতর ঘুরছে।

খাওয়া নেই।

ঘুম নেই।

শুধু কান্না।

রাত তিনটায় উঠে পড়লাম।

ফ্রেশ হলাম।

বের হলাম।

গভীর রাত।

রাস্তায় প্রায় কোনো মানুষ নেই।

গেটের কাছে একটি ইজিবাইক পেলাম।

বললাম—

—চাচা, আদ-দ্বীন হাসপাতালে যাবেন?

হ্যাঁ।

রিজার্ভ যাব।

ভাড়া জানতে চাইলে তিনি বললেন—

—ওটা নিয়ে ভাবতে হবে না। আগে উঠুন।

সেদিন ওই মানুষটিও আমার কাছে একজন ফেরেশতার মতো ছিল।

রাতের অন্ধকার ভেদ করে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।

কোনো ঝামেলা হলো না।

কোনো বাধা হলো না।

মনে হলো, কেউ যেন অদৃশ্যভাবে আমার পথটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে।

হাসপাতালে গিয়ে দেখি,

সেই আপা তখনও ব্যস্ত।

আমাকে দেখে বললেন—

—আমি তো আপনাকে ফোন দিতাম। আপনি এসেছেন, ভালো হয়েছে। সব রেডি করে রেখেছি।

তারপর জিজ্ঞেস করলেন,

—ভাবি কেমন আছেন?

আমি শুধু বললাম,

—বুঝতে পারছি না, আপা।

তিনি আবার বললেন,

—একদম চিন্তা করবেন না। কান্নাকাটি করা যাবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।

তারপর প্ল্যাটলেট দেওয়া শুরু হলো।

চার ব্যাগ।

এক ইউনিট।

আমি দেখছিলাম প্ল্যাটলেট পরীর মায়ের শরীরে ঢুকছে।

কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল—

ওগুলো শুধু পরীর মায়ের শরীরে ঢুকছে না।

ওগুলো যেন আমার বুকেও ঢুকছে।

আমার বুকের ভেতর একটু একটু করে আলো জ্বলছে।

আমি যেন আবার শ্বাস নিতে পারছি।

একজন দায়িত্বহীন স্বামী হিসেবে সেদিন বুঝেছিলাম—

স্ত্রীর শরীরে এক ফোঁটা জীবন ঢোকার দৃশ্যের চেয়ে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

কিন্তু গল্প তখনও শেষ হয়নি।

৩১ আগস্ট, সোমবার বিকেলে ডাক্তার আবার বললেন—

—আবার প্ল্যাটলেট দিতে হবে।

আবার দৌড়।

আবার ডোনার।

আবার ফোন।

আবার অনুরোধ।

আবার মানুষের দরজায় দরজায় কড়া নাড়া।

পরীর ছোট খালু কী যে সাহায্য করলেন!

একজন ডোনার নিয়ে এলেন।

বড় মামীআরেকজন ম্যানেজ করলেন।

আমার সহকর্মী সুমনা শারমিন হুট করে একজন ডোনার জোগাড় করলেন।

ফেসবুক থেকেও ৫ জন মানুষ এগিয়ে এলেন।

মোট আট জন ডোনার!

তিনজনের রক্ত নিলাম।

আর ৫ জনকে বললাম—

—প্রয়োজন হলে পরে ডাকব।

সেদিনও ল্যাবরেটরিতে প্রচণ্ড ভিড়।

আমি আপাকে বললাম—

—আপা, খুব তাড়া।

তিনি বললেন—

একটা মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে। তবে চিন্তা করবেন না। খুব দ্রুত করার চেষ্টা করছি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম—

—আপা, আপনি কয়টা পর্যন্ত আছেন?

—সাতটা পর্যন্ত।

আমি সাতটার আগেই চলে গেলাম।

গিয়ে দেখি—

আপা একটু তন্দ্রায়।

আমি ডাকলাম না।

ভাবলাম, সারারাত যে মানুষটি অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে, তাকে আর কতবার ডাকব?

কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই চোখ মেলে বললেন—

—আপনি এসেছেন?

তারপর বললেন—

—আমি ভেবেছিলাম, আপনি এসে আমাকে ডাকবেন। আবার নাও ডাকতে পারেন—ভাবছিলাম, এত ক্লান্ত একজন মানুষকে কীভাবে ডাকেন!

সেদিন মনে হলো—

আমাদের জীবনের ক্লান্তিরও একটা সীমা আছে। কিন্তু স্ত্রীর জন্য একজন ব্যর্থ স্বামীর উদ্বেগের কোনো সীমা নেই।

আপা বললেন—

—এখনো হয়নি। সাতটার সময় আরেকজন আপা আসবেন। আমি তাকে বলে যাব। চিন্তা করবেন না। মেয়ের মায়ের দিকে খেয়াল রাখবেন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবেন।

আমি আবার প্ল্যাটলেট নিয়ে চলে এলাম।

সাত ব্যাগ।

তারপর আরও দুই ব্যাগ।

দুটি দিন।

কত রাত।

কত মানুষ।

কত ফোন।

কত দৌড়।

কত কান্না।

কত অচেনা মানুষের ভালোবাসা।

রক্তের ব্যাগগুলো আসলে শুধু রক্ত ছিল না।

একেকটি ব্যাগের ভেতরে ছিল একজন মানুষের ভালোবাসা।

একজনের সময়।

একজনের রাত জাগা।

একজনের দৌড়।

একজনের দোয়া।

একজনের মানবিকতা।

আর সেই ল্যাবরেটরি আপার কয়েকটি কথা—

“চিন্তা করবেন না।”

“আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।”

“কান্নাকাটি করা যাবে না।”

“একটা উপায় হবেই।”

এই কথাগুলো হয়তো তাঁর কাছে খুব সাধারণ ছিল।

কিন্তু আমার কাছে?

সেদিন ওই কথাগুলোই ছিল—

অন্ধকার রাতের আলো।

সেই রাতের কথা মনে পড়লে বুক ভার হয়ে আসে।

মনে হয়, পৃথিবীটা আসলে এত নিষ্ঠুর নয়।

মানুষ এখনো মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

কেউ রক্ত দিয়ে।

কেউ ডোনার খুঁজে।

কেউ রাতের অন্ধকারে গাড়ি চালিয়ে।

কেউ হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে।

কেউ একটি ফোন করে।

কেউ শুধু বলে—

“ভয় পাবেন না, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন।”

আর কখনো কখনো—

এই সামান্য কথাটুকুই একজন ভেঙে পড়া স্বামীকে আবার দাঁড় করিয়ে দেয়।

পরীর মায়ের সেই দুই রাত আমাকে শিখিয়েছে—

জীবন খুব ভঙ্গুর, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অনেক শক্তিশালী।

আর আল্লাহ যখন কাউকে বাঁচিয়ে রাখতে চান, তখন তিনি কখনো কখনো মানুষের হাতকেই তাঁর রহমতের মাধ্যম বানিয়ে দেন।

সর্বোপরি, সবার ভালোবাসায় পরীর আম্মু এখন অনেকটা সুস্থ!

মন্তব্য করুন