সহকারী শিক্ষক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:২১ অপরাহ্ণ
টিউশনের পাশাপাশি বাসায় ও পড়া
টিউশনের পাশাপাশি বাসায় ও পড়া
শুধু টিউশনে গেলেই হবে না,
ভালো কিছু করতে হলে বাড়িতেও নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই করতে হয়।
তোমাদের একটা সোজা কথা বলি, মন দিয়ে শোনো—
টিউশন কী?
টিউশন হলো রাস্তা দেখানো।
স্যার, ম্যাম তোমাদের দেখিয়ে দেবেন—
কোন পথে গেলে অঙ্কটা সহজ হবে,
কীভাবে বাংলা ভালো হবে,
কীভাবে ইংরেজি শিখবে,
কীভাবে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখবে।
কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—
রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া যায়,
কিন্তু হাঁটিয়ে দেওয়া যায় না।
হাঁটতে হবে তোমাকেই।
স্যার তোমার হয়ে পড়তে পারবে না।
ম্যাম তোমার হয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে না।
বাবা-মা তোমার হয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে,
কষ্ট করতে পারে, টাকা দিতে পারে—
কিন্তু তোমার হয়ে পরিশ্রম করতে পারবে না।
তুমি টিউশনে দুই ঘণ্টা পড়লে,
তারপর বাড়িতে এসে যদি বইটা ব্যাগের ভেতরেই রেখে দাও,
তাহলে সেই দুই ঘণ্টার শিক্ষাও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাবে।
আমি অনেক ছাত্র দেখেছি—
তিন-চারটা টিউশন করে,
একটার পর একটা স্যারের কাছে পড়ে,
কিন্তু নিজের বই খুলে বসার সময় নেই।
শেষে পরীক্ষার ফল হাতে নিয়ে হতাশ।
আবার এমন ছাত্রও দেখেছি—
একটা মাত্র টিউশন করে,
কিন্তু বাড়িতে ফিরে নিজের বই খুলে বসেছে।
ভুল করেছে, আবার শিখেছে।
না বুঝলে আবার চেষ্টা করেছে।
প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে বদলেছে।
শেষ পর্যন্ত সেই ছাত্রটাই সবার সামনে দাঁড়িয়েছে।
তাই মনে রেখো—
টিউশন তোমাকে পথ দেখাবে,
কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দেবে তোমার নিজের পরিশ্রম।
আর অভিভাবকদের বলছি—
শুধু সন্তানকে একের পর এক টিউশনে ভর্তি করিয়ে দিলেই আপনার দায়িত্ব শেষ নয়।
সন্তান টিউশনে যাচ্ছে কি না—এটা যেমন দেখবেন,
তেমনি টিউশন থেকে ফিরে সে কী পড়ছে, কতক্ষণ পড়ছে, কী শিখছে—সেটাও খেয়াল রাখবেন।
শুধু জিজ্ঞেস করবেন না—
“আজ কয়টা টিউশন করেছ?”
মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করুন—
“আজ কী শিখলে?”
“নিজে নিজে কতক্ষণ পড়লে?”
“কোন বিষয়টা বুঝতে পারোনি?”
সন্তানের হাতে শুধু মোবাইল তুলে দিয়ে,
তারপর ভালো ফলাফলের আশা করলে হবে না।
বাড়িতে একটা পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন।
সন্তান যখন পড়তে বসবে, তখন সম্ভব হলে আপনিও পাশে থাকুন।
সে পড়ছে আর আপনি মোবাইলে ব্যস্ত—এমন হলে শিশুর কাছে পড়াশোনার গুরুত্ব কমে যায়।
আর একটা কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ—
অন্যের সন্তানের সঙ্গে নিজের সন্তানকে তুলনা করবেন না।
“ও এত ভালো করে, তুমি পারো না কেন?”—
এই কথাগুলো অনেক সময় সন্তানকে ভালো করার বদলে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।
তার বদলে বলুন—
“তুমি চেষ্টা করো, আমরা তোমার পাশে আছি।”
একটি শিশুর ভালো ফলাফলের পেছনে শুধু শিক্ষক নয়,
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক—এই তিনজনের সম্মিলিত ভূমিকা থাকে।
শিক্ষক পথ দেখাবেন,
অভিভাবক পরিবেশ তৈরি করবেন,
আর শিক্ষার্থী পরিশ্রম করবে।
তিনটি একসঙ্গে হলেই আসে সাফল্য।
তোমার বাবা যখন টিউশনের টাকা দেন,
হয়তো সেই টাকা দিতে গিয়ে নিজের কোনো শখটা বাদ দেন।
তোমার মা যখন বলে,
“বাবা, মন দিয়ে পড়ো…”
তখন সেই কথার পেছনে থাকে অনেক না-বলা স্বপ্ন।
তারা তোমার কাছে বেশি কিছু চায় না।
তারা শুধু চায়—
তুমি যেন তাদের কষ্টের দাম রাখো।
তাই টিউশন থেকে ফিরে
মোবাইলটা হাতে নেওয়ার আগে,
গেম খেলার আগে,
অযথা সময় নষ্ট করার আগে—
একবার নিজের বইটা খোলো।
আজ যা পড়েছ, সেটা আবার পড়ো।
দুটি অঙ্ক নিজে করো।
দশটি শব্দ লিখো।
এক পৃষ্ঠা পড়ো।
হয়তো আজ খুব বড় কিছু হবে না।
কিন্তু মনে রেখো—
প্রতিদিনের ছোট ছোট পরিশ্রমই একদিন বড় সাফল্য হয়ে ফিরে আসে।
টিউশন তোমার ২০%,
আর নিজের পড়াশোনা, নিজের চেষ্টা, নিজের পরিশ্রম—৮০%।
তাই শুধু টিউশন করে ভালো ফলের অপেক্ষায় থেকো না।
নিজের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিজের হাতে নাও।
আর অভিভাবকরাও সচেতন হোন।
শুধু টাকা খরচ করে টিউশন করানো নয়—
সন্তানের পাশে বসুন, তার কথা শুনুন, তার পড়া দেখুন, তাকে উৎসাহ দিন।
কারণ সন্তান শুধু একটি ভালো রেজাল্ট চায় না—
সে চায়, তার বাবা-মা তার পাশে থাকুক।
একদিন যখন ফলাফল হাতে আসবে,
তখন যেন তোমার বাবা-মা গর্ব করে বলতে পারেন—
“আমাদের সন্তান আমাদের কষ্টের দাম রেখেছে।”
সেই দিনের জন্যই আজ একটু কষ্ট করো।
আজকের একটু পরিশ্রম
আগামী দিনের অনেক আফসোস থেকে তোমাকে বাঁচাতে পারে।
১৪
২১ মন্তব্য