কিছুদিন আগে অর্থসহ কুরআন পড়ছিলাম। সূরা আদিয়াতে এসে হঠাৎ থমকে গেলাম। প্রথম আয়াতটি পড়েই আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম—আল্লাহ তাআলা একটি ঘোড়ার শপথ নিয়ে সূরা শুরু করেছেন! আয়াতটি হলো: "শপথ সেই দ্রুতগামী ঘোড়াগুলোর, যারা উর্ধ্বশ্বাসে হ্রেষাধ্বনি করতে করতে দৌড়ায়।"
আমি ভাবতে বসলাম, পৃথিবীতে এত কিছু থাকতে ঘোড়ার শপথ কেন? কুরআনের অনেক সূরাই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শপথ দিয়ে শুরু হয়েছে; যেমন—সূর্য, চন্দ্র, আকাশ, নক্ষত্র, সময় কিংবা রাত-দিনের শপথ। এমনকি ফেরেশতাদের শপথও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সূরায় ঘোড়ার কথা কেন এল?
এর পরের আয়াতগুলো পড়তে থাকলাম:
> "শপথ সেই ঘর্ষণকারী ঘোড়াগুলোর, যাদের খুর থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হয়। শপথ সেই ঘোড়াগুলোর, যারা প্রভাতকালে অভিযান চালায় এবং ধূলি উৎক্ষিপ্ত করে। অতঃপর শত্রুদলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে তাদের তছনছ করে দেয়।"
এর ঠিক পরের আয়াতটি পড়েই আমার মন এক গভীর উপলব্ধিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল: "নিশ্চয়ই মানুষ তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।"
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মুহূর্তের জন্য মাথা ফাঁকা হয়ে গেল। মেলাতে চেষ্টা করলাম—ঘোড়ার বীরত্বগাথার বর্ণনা থেকে হঠাৎ মানুষের অকৃতজ্ঞতার প্রসঙ্গে কেন যাওয়া হলো? তাও আবার এত নাটকীয়ভাবে!
বিষয়টি পরিষ্কার করতে আমি কয়েকটি নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থ অধ্যয়ন করলাম। যা বুঝতে পারলাম, তা আমার জীবনদর্শনকে নাড়িয়ে দিয়েছে:
এই সূরা ঈমান, জান্নাত বা জাহান্নামের আলোচনা দিয়ে শুরু হয়নি; শুরু হয়েছে একটি প্রাণীর উদাহরণ দিয়ে, যার আনুগত্য প্রশ্নাতীত। তবে এটি সাধারণ কোনো ঘোড়া নয়, এটি 'যুদ্ধঘোড়া'। যে ঘোড়া তার মনিবের ইশারায় আগুনের ফুলকি ছুটিয়ে শত্রুর ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সে জানে না কেন এই যুদ্ধ, সে ক্লান্ত হয়, আহত হয়, কিন্তু পিছু হটে না। কারণ সে তার মালিকের প্রতি চরম বিশ্বস্ত।
এরপরই আল্লাহর সেই অমোঘ ঘোষণা: "মানুষ সত্যিই তার মালিকের প্রতি অকৃতজ্ঞ।" আল্লাহ যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন—দেখো, সামান্য একটু খাদ্যের বিনিময়ে একটি পশু তার মালিকের জন্য জীবন বাজি রাখতে পারে, আর তুমি সৃষ্টির সেরা হয়েও তোমার রবের প্রতি কতটা উদাসীন!
এটি কেবল তিরস্কার নয়, এটি একটি নৈতিক তুলনা (Moral Comparison)। তাফসির অনুযায়ী, এখানে 'কানুদ' বা অকৃতজ্ঞ বলতে তাকে বোঝানো হয়েছে, যে আল্লাহর নেয়ামতগুলো অনুভব করে না, বরং সর্বদা অপ্রাপ্তি আর অভিযোগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যে বিপদ মনে রাখে কিন্তু নেয়ামত ভুলে যায়।
সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া আয়াত হলো: "এবং সে নিজেই এ বিষয়ে সাক্ষী।" এখানে আল্লাহ বলছেন, তোমার অকৃতজ্ঞতার প্রমাণের জন্য কোনো বাইরের সাক্ষীর প্রয়োজন নেই; তোমার নিজের বিবেকই যথেষ্ট। মানুষ অন্তরে জানে সে কোথায় ভুল করছে, কে তাকে রিজিক দিচ্ছে। মানুষ অজ্ঞতার কারণে পথ হারায় না, বরং নিজের সাথে বিশ্বাসভাতকতা (Self-betrayal) করে।
আমাদের অন্তরে দুটি সত্তা থাকে: একটি যে কাজ করে বা ভুল করে, আর অন্যটি হলো সাক্ষী সত্তা বা বিবেক। কোনো অন্যায় করলে ভেতর থেকে যে কণ্ঠস্বর বলে ওঠে "এটা ঠিক হলো না"—সেই কণ্ঠস্বরই হলো এই 'শাহিদ'। বিচার দিবস আসার আগেই আমাদের অন্তরের বিচার প্রক্রিয়া আসলে শুরু হয়ে গেছে।
এরপর বলা হয়েছে: "নিশ্চয়ই সে ধন-সম্পদের মোহে প্রবল আসক্ত।" এখানে 'খাইর' (সম্পদ) লাভের জন্য মানুষের যে তীব্র ও হিংস্র আকাঙ্ক্ষা (Violent Intensity), তাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ আল্লাহকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না, বরং তাঁকে 'রিপ্লেস' বা প্রতিস্থাপন করে ফেলে। সে তার নিরাপত্তা আর সুখের উৎস হিসেবে আল্লাহকে বাদ দিয়ে ক্ষমতা, সম্পদ আর খ্যাতিকে বেছে নেয়। হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর দুনিয়ার প্রতি অন্ধ মোহ—এই দুই তীব্র আবেগ একসাথে থাকতে পারে না।
সূরার শেষে বলা হয়েছে কবরের ভেতরের সব ওলটপালট করে বের করে আনা হবে এবং মানুষের অন্তরে যা গোপন ছিল, তা যাচাই-বাছাই করা হবে।
* 'বু'ছিরা' (بعثر): এর অর্থ কেবল পুনরুত্থান নয়, বরং সবকিছু উল্টেপাল্টে ভেতরের গোপন ইতিহাস বের করে আনা।
* 'হুসসিলা' (حصل): এর অর্থ হলো ছেঁকে বের করা। অর্থাৎ আমাদের কাজের লোকদেখানো অংশটুকু বাদ দিয়ে ভেতরের আসল নিয়ত বা অহংকারকে পৃথক করে ফেলা হবে। আমাদের হৃদয় আসলে একটি বিশাল আর্কাইভ, যেখানে প্রতিটি চিন্তা সংরক্ষিত আছে।
একটি ঘোড়া তার মালিকের কাছ থেকে সামান্য খাবার পায়, অথচ সে আমৃত্যু অনুগত থাকে। আর মানুষকে আল্লাহ অগণিত নেয়ামত দিয়েছেন, দিয়েছেন বিচারবুদ্ধি। তবুও মানুষ অকৃতজ্ঞ। সমস্যা এটি নয় যে মানুষ দৌড়াচ্ছে; সমস্যা হলো মানুষ ভুল লক্ষ্যের পেছনে দৌড়াচ্ছে।
ঘোড়া না বুঝেও সঠিক মালিকের জন্য প্রাণ দেয়, আর মানুষ জেনে-বুঝে ভুল মালিক (দুনিয়া) বেছে নেয়। আমাদের জীবনের এই প্রাণান্তকর দৌড় যদি ভুল উদ্দেশ্যে হয়, তবে দিনের শেষে সমস্ত পরিশ্রমই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
১৪
২১ মন্তব্য