সহকারী শিক্ষক
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষায় বিশ্ব এগিয়ে, আমরা কেন পিছিয়ে?
এআই জেনারেটেড প্রতীকী ছবি
বিশ্ব কেন এগিয়ে, আমরা কেন পিছিয়ে, প্রশ্নটি অস্বস্তিকর; কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কেন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি কিংবা ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি, আর বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ও ডিগ্রি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এর উত্তর শুধু অর্থের অভাবে নয়; বরং দৃষ্টিভঙ্গি, নীতিগত সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পার্থক্যে নিহিত।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, তারা নিজেদের কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে না; বরং জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত ধারণা শিল্পে প্রবেশ করে, শিল্প সেই ধারণাকে পণ্যে রূপ দেয়, আর সেই পণ্য বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য পরিমাপ করা হয় শুধু কতজন স্নাতক তৈরি হলো তা দিয়ে নয়; বরং কতটি গবেষণা শিল্পে ব্যবহৃত হলো, কতটি পেটেন্ট নিবন্ধিত হলো, কতটি স্টার্টআপ গড়ে উঠল এবং কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এসব সূচক দিয়েও।
বাংলাদেশেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে; কিন্তু তার বড় অংশই আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের পর থেমে যায়। গবেষণার ফল শিল্পে পৌঁছায় না, শিল্পের সমস্যা গবেষণার বিষয় হয় না, আর নীতিনির্ধারণেও গবেষণার ব্যবহার সীমিত। এই বিচ্ছিন্নতা দূর না হলে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প দুই খাতই তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে না।
শিল্পের দরজায় বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় শিল্প: আজকের বিশ্বে পাঠ্যক্রম পাঁচ বছর পরপর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। প্রযুক্তি প্রতি মাসে বদলাচ্ছে, কর্মবাজার প্রতি বছর নতুন দক্ষতা দাবি করছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে শিল্পের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
প্রতিটি অনুষদে শিল্প উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা যেতে পারে, যেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উদ্যোক্তা, গবেষক এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করবেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় বুঝতে পারবে শিল্প কী চায়, আর শিল্পও জানতে পারবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা কোথায়।
Md. Rafiqul Islam Talukder
একই সঙ্গে প্রতিটি ডিগ্রি প্রোগ্রামে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, কো-অপ এডুকেশন, শিল্পভিত্তিক প্রকল্প, ক্যাপস্টোন গবেষণা এবং সমস্যাভিত্তিক শিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শ্রেণিকক্ষে শেখা তত্ত্ব যখন বাস্তব শিল্পকারখানায় প্রয়োগের সুযোগ পায়, তখনই প্রকৃত দক্ষতা তৈরি হয়।
গবেষণায় বিনিয়োগ নয়, ব্যয় ভাবার সংস্কৃতি বদলাতে হবে
বাংলাদেশে গবেষণাকে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয় হিসেবে দেখা হয়। অথচ উন্নত দেশগুলো গবেষণাকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। একটি সফল গবেষণা নতুন প্রযুক্তি সৃষ্টি করতে পারে, একটি নতুন প্রযুক্তি নতুন শিল্প গড়ে তুলতে পারে, আর একটি নতুন শিল্প হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় বিনিয়োগ করা। সরকার কর-প্রণোদনা, গবেষণা তহবিল এবং প্রতিযোগিতামূলক অনুদানের মাধ্যমে এই অংশীদারত্বকে উৎসাহিত করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও সরকারের যৌথ গবেষণা প্রকল্প যত বাড়বে, দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও তত বৃদ্ধি পাবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বায়োটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং আগামী দশকের অর্থনীতিকে পরিচালিত করবে। এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয় যদি এখনো শুধু মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা এমন কর্মবাজারে প্রবেশ করবে, যা ইতোমধ্যে তাদের জন্য বদলে গেছে।
সুতরাং উচ্চশিক্ষায় মৌলিক পরিবর্তন অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়; বরং সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, সহযোগিতামূলক কাজ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং ডিজিটাল সক্ষমতা গড়ে তোলাকে শিক্ষার কেন্দ্রে আনতে হবে। এ দক্ষতাগুলোই ভবিষ্যতের অর্থনীতির প্রকৃত মুদ্রা।
উচ্চশিক্ষা ও শিল্প সংযোগ কোনো একক বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো একক মন্ত্রণালয় কিংবা কোনো একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এটি একটি জাতীয় কর্মসূচি। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প সহযোগিতা, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্ভাবন কেন্দ্র এবং শিল্প-সমর্থিত গবেষণাকে স্পষ্ট অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ যে রাষ্ট্র গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়, সেই রাষ্ট্রই আগামী দিনের প্রযুক্তির মালিক হয়। আর যে রাষ্ট্র প্রযুক্তির মালিক হয়, সেই রাষ্ট্রই অর্থনীতির নেতৃত্ব দেয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে ডিগ্রিকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার পুরোনো ধারা; অন্যদিকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্প-সংযুক্ত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ শুধু মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ যদি ২০৪১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে উচ্চশিক্ষা ও শিল্পকে আলাদা দুটি জগৎ হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প, সরকার এবং সমাজ একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সংযোগ ( ইন্ডাস্ট্রি লিয়াজন অফিস) ও প্রযুক্তি স্থানান্তর কেন্দ্র (টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে গবেষণার ফল সরাসরি শিল্পে পৌঁছাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর নয়; বরং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। তৃতীয়ত, গবেষণার মূল্যায়নে শুধু প্রবন্ধ প্রকাশ নয়; বরং পেটেন্ট, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শিল্পে প্রয়োগ, স্টার্টআপ সৃষ্টি এবং সামাজিক প্রভাবকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, শিল্পভিত্তিক গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং উদ্ভাবনী প্রকল্প চালু করতে হবে। পঞ্চমত, সরকারি ও বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় বিনিয়োগে কর-প্রণোদনা এবং বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। ষষ্ঠত, নারীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) শিক্ষায় অংশগ্রহণ, গবেষণা অনুদান, প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং শিল্পে নেতৃত্বের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। কারণ অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। সপ্তমত, জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিলকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা পায়। অষ্টমত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের সূচকে স্নাতকদের কর্মসংস্থান, শিল্প-সহযোগিতা, গবেষণার ব্যবহারিক প্রভাব এবং উদ্ভাবনের অবদান অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হবে পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি এই পরিবর্তন শুধু শিক্ষানীতির মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি নীতি যেন পরিবর্তিত না হয়। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, গবেষণা ও উদ্ভাবনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ কখনো দলীয় কর্মসূচি নয়; এটি জাতীয় অঙ্গীকার। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প অংশীদারত্ব, গবেষণা ব্যয় বৃদ্ধি, উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি। কারণ আজকের গবেষণায় বিনিয়োগই আগামী দিনের শিল্প, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। আমাদের রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, বিস্তৃত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিকাশমান শিল্প খাত; কিন্তু এই তিনটি শক্তি যদি আলাদা আলাদাভাবে চলতে থাকে, তাহলে সম্ভাবনা কখনোই পূর্ণ বাস্তবতায় রূপ নেবে না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সফল, যখন তার গবেষণা মানুষের জীবন বদলে দেয়। একটি শিল্প তখনই শক্তিশালী, যখন সে নিজস্ব জ্ঞান ও প্রযুক্তি সৃষ্টি করতে পারে। আর একটি রাষ্ট্র তখনই উন্নত, যখন তার শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
তাই প্রশ্নটি আবারও উচ্চারিত হোক—উচ্চ শিক্ষা ও শিল্প সংযোগ ছাড়া উন্নত দেশ কি সম্ভব?
বিশ্বের অভিজ্ঞতা, অর্থনীতির তত্ত্ব এবং বাস্তবতার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ একই উত্তর দেয়—না, সম্ভব নয়। যে জাতি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার কেন্দ্র, শিল্পকে উদ্ভাবনের ক্ষেত্র এবং সরকারকে দূরদর্শী সমন্বয়কারীতে পরিণত করতে পারে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত সেই জাতির হাতেই যায়। বাংলাদেশেরও সামনে সেই পথ খোলা। এখন প্রয়োজন কেবল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত—ডিগ্রিকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা থেকে জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্প-সংযুক্ত উচ্চশিক্ষার দিকে জাতীয় রূপান্তর। কারণ উন্নত দেশের স্বপ্ন কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, শিল্পের উৎপাদনলাইন এবং তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তার মিলনেই বাস্তবে রূপ নেয়।

১৪
২১ মন্তব্য