Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ভেষজ উদ্ভিদ ‘কেও’


কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় একসময় বাড়ির পাশের ঝোপঝাড়, খাল-নালা, জলাশয়ের পাড় কিংবা নিচু জমির স্যাঁতসেঁতে মাটিতে আপনাআপনিই জন্মাত কেও গাছ। বর্ষা শেষে গাছের মাথায় ফুটত সাদা ফুল। ফুলের নিচে থাকত লালচে পুষ্পমঞ্জরি। সবুজের মধ্যে লাল-সাদার সেই দৃশ্য ছিল গ্রামবাংলার চেনা ছবি।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই দৃশ্য। বাড়িঘর নির্মাণ, খাল-নালা ভরাট, ঝোপঝাড় পরিষ্কার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনে কমেছে কেও গাছের আবাসস্থল। ফলে আগের মতো আর চোখে পড়ে না ভেষজগুণসম্পন্ন এই উদ্ভিদ। উপজেলার উত্তর চান্দলা এলাকায় কুমিল্লা-মিরপুর সড়কের পাশে এখনো কিছু কেও গাছ টিকে আছে। তবে সংখ্যায় তা নেহাতই সামান্য।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দশক আগেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে কেও গাছ জন্মাতে দেখা যেত। বাড়ির আশপাশ, সড়কের পাশ ও নিচু জমিতে ছিল এ গাছের উপস্থিতি। সময়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাওয়ায় উদ্ভিদটির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কেও বা কেওমূল একটি বহুবর্ষজীবী সপুষ্পক ভেষজ উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Costus speciosus বা Cheilocostus speciosus। আদা গোত্রের এ উদ্ভিদ কোস্টাসি (Costaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি কেও, কেওমূল, কেমুক, কেউন্দা ও কেঁউসহ নানা আঞ্চলিক নামে পরিচিত।

কেও গাছ বেড়ে উঠতে খুব বেশি যত্নের প্রয়োজন হয় না। ছায়াযুক্ত ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় সহজেই বেড়ে ওঠে। জলাশয়, খাল-নদীর পাড়, নিচু জমি ও ঘন ঝোপঝাড়বেষ্টিত এলাকায় সাধারণত এ গাছ জন্মায়। এর কাণ্ড নলের মতো লম্বা। মাটির নিচে থাকা রাইজোম বা কন্দ থেকে নতুন গাছ জন্মে। বীজের মাধ্যমেও বংশবিস্তার করে। ফল পাখির খাদ্য হওয়ায় পাখির মাধ্যমেও বীজ ছড়িয়ে পড়ে।

ধুপির ডানায় প্রকৃতির মায়াবী সৌন্দর্য

বর্ষার শেষ দিকে কেও গাছে ফুল আসে। সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে ফুল ফুটতে শুরু করে এবং বছরের শেষভাগ পর্যন্ত তা দেখা যেতে পারে। থরে থরে সাজানো লালচে পুষ্পমঞ্জরিপত্রের ভেতর থেকে বের হওয়া সাদা ফুল সহজেই আলাদা করে চেনায় এ উদ্ভিদকে।

কেও বা কেওমূল ভেষজগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এর কন্দে ডায়োসজেনিন নামের একটি উপাদান পাওয়া যায়। স্টেরয়েডজাতীয় যৌগ তৈরিতে এ উপাদানের ব্যবহার রয়েছে বলে উদ্ভিদবিষয়ক বিভিন্ন তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

লোকজ চিকিৎসায় কেও গাছের কন্দমূল, পাতা ও বীজ ব্যবহারের কথা প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে গাঁটের ব্যথা, অজীর্ণ, পেট ফাঁপা, বদহজম, জ্বর, সর্দি-কাশি, মাথাব্যথা ও চর্মরোগে এর ব্যবহারের কথা জানা যায়। কিছু এলাকায় কন্দ কৃমিনাশক এবং মূত্রনালির প্রদাহে ব্যবহারের কথাও প্রচলিত। কোথাও কোথাও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও এর ব্যবহারের কথা শোনা যায়।

তবে এসব ব্যবহার মূলত লোকজ জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো রোগের চিকিৎসায় কেও গাছের কোনো অংশ ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা নিরাপদ নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, ‘আগে বাড়ির আশপাশে ও সড়কের পাশে সচরাচর কেও গাছ দেখা যেত। একসঙ্গে অনেকগুলো গাছ জন্মাত। এখন আর তেমন দেখা যায় না। ছোটবেলায় দেখেছি, মা-চাচিরা নানা অসুখ-বিসুখে এই গাছের বিভিন্ন অংশ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন।’

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মন্তাজ আলী বলেন, ‘শৈশবে এ গাছ অনেক দেখেছি। এখন এই গাছ নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো এ গাছের নামও জানে না। অথচ একসময় এ গাছ প্রচুর ছিল এবং নানা রোগে এটি ব্যবহার করা হতো। আমরাও এ গাছসহ অনেক গাছগাছালি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করেছি।’

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রকৃতি থেকে অনেক উপকারী উদ্ভিদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এটা আমাদের ও প্রকৃতির জন্য অশনিসংকেত। আবাসস্থল বৃদ্ধি, ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চল উজাড়ের কারণে কেওর মতো আরও অনেক উদ্ভিদ প্রকৃতি থেকে কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো উদ্ভিদ একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে। কেও উদ্ভিদটিও হারিয়ে যাওয়ার পথে।’

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) ডা. মোহাম্মদ সোহেল রানা কালবেলাকে বলেন, ‘কেও ভেষজগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এর বিভিন্ন অংশের লোকজ ব্যবহার রয়েছে। তবে কোনো রোগের চিকিৎসায় এ উদ্ভিদের কোনো অংশ ব্যবহারের আগে এর সঠিক পরিচয় ও মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া দরকার। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কেওসহ কোনো উদ্ভিদ ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।’

তিনি বলেন, ‘উপকারী এ কেও উদ্ভিদটি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু কেও নয়, প্রকৃতি থেকে যেসব উদ্ভিদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, সেসব উদ্ভিদও সংরক্ষণ করা দরকার

মন্তব্য করুন

ব্লগ