সহকারী শিক্ষক
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও মেধা মূল্যায়ন পদ্ধতি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল বিষয়। প্রথাগত মুখস্থবিদ্যা-ভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা প্রকাশের পরিবেশ তৈরি করাই বর্তমানে এই ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মূলত দুই ধরনের মূল্যায়নের সংমিশ্রণ দেখা যায়:
গঠনমূলক মূল্যায়ন (Formative Assessment): শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়ন, ক্লাস টেস্ট, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট এবং শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বছরজুড়ে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
সমষ্টিগত মূল্যায়ন (Summative Assessment): নির্দিষ্ট সময় পর (যেমন—অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক বা পাবলিক পরীক্ষা) লিখিত, মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন করা হয়।
১. এসএসসি (SSC) ও সমমান: ১০ম শ্রেণি শেষে প্রথম জাতীয় বা বোর্ডভিত্তিক লিখিত পরীক্ষা, যা উচ্চমাধ্যমিকে প্রবেশের মূল ভিত্তি।
২. এইচএসসি (HSC) ও সমমান: ১২তম শ্রেণি শেষে অনুষ্ঠিত হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থায় মেধা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না—তা নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
রোট লার্নিং বা মুখস্থনির্ভরতা: লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য অর্জিত বোঝার চেয়ে তথাকথিত ‘শর্টকাট’ ও মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা বেশি থাকে।
নম্বর কেন্দ্রিক মানসিকতা: জিপিএ-৫ (GPA-5) বা বেশি নম্বর পাওয়ার সামাজিক চাপের কারণে প্রকৃত দক্ষতা অর্জনের বদলে শুধু পরীক্ষায় পাসের কৌশল শেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একমুখী মূল্যায়ন (One-Size-Fits-All): শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, নৈতিকতা বা সৃজনশীলতার মতো বহুমাত্রিক গুণাবলী মাপার সুযোগ লিখিত পরীক্ষায় সীমিত।
পরীক্ষা ভীতি ও মানসিক চাপ: একক পরীক্ষার ওপর পুরো ভবিষ্যৎ নির্ভর করার কারণে শিক্ষার্থীদের চরম মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠায় ভুগতে হয়।
প্রশ্নে বৈষম্য ও মান নিয়ন্ত্রণ: বিভিন্ন বোর্ডের অধীনে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সমতা বজায় রাখা এবং যোগ্য শিক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়নে মাঝে মাঝে তারতম্য দেখা যায়।
শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় একাধিক যুগোপযোগী প্রস্তাব ও পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে:
পাবলিক পরীক্ষার চাপ কমানো: মাধ্যমিক পর্যায়ে অতি-পরীক্ষার বোঝা কমাতে কেবল আবশ্যিক বা মূল বিষয়গুলোতে কেন্দ্রীভূত পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন এবং বাকি বিষয়গুলো অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ধারাবাহিক মূল্যায়নে জোর (Continuous Assessment): শুধু বছরের শেষের লিখিত পরীক্ষার ওপর ১০০% নম্বর নির্ভর না রেখে বছরজুড়ে প্রজেক্ট, উপস্থাপনা, লিখিত পরীক্ষা ও ব্যবহারিক কাজের ওপর নির্দিষ্ট শতাংশ নম্বর বরাদ্দ রাখা।
দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের প্রাধান্য: মুখস্থ তথ্যের চেয়ে প্রয়োগমূলক ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে প্রশ্নপত্র তৈরির ওপর জোর দেওয়া।
একটি আন্তর্জাতিক মানের ও গ্রহণযোগ্য মেধা মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের আধুনিকায়ন এবং শ্রেণিভিত্তিক গঠনমূলক মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। মেধার পরিমাপ কেবল পরীক্ষার খাতায় লেখার ক্ষমতার ওপর না হয়ে চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং বাস্তব প্রয়োগদক্ষতার ভিত্তিতে হওয়া আবশ্যক।
১৪
২১ মন্তব্য