Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:০৩ অপরাহ্ণ

পাঠদানে প্রমিত উচ্চারণ : শ্রেণিকক্ষ হোক শুদ্ধ ভাষাচর্চার প্রাণকেন্দ্র ---পংকজ কান্তি গোপ

পাঠদানে প্রমিত উচ্চারণ : শ্রেণিকক্ষ হোক শুদ্ধ ভাষাচর্চার প্রাণকেন্দ্র

                                          ---পংকজ কান্তি গোপ

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; শিক্ষা একজন মানুষকে জ্ঞানী, চিন্তাশীল, আত্মবিশ্বাসী ও সুন্দরভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে শেখায়। আর নিজেকে প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো ভাষা। তাই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রমিত ভাষায় কথা বলা ও প্রমিত উচ্চারণে পাঠদানের গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান উপায়।” ভাষা যত স্পষ্ট ও সুন্দর হবে, ভাবের প্রকাশও তত সহজ ও গ্রহণযোগ্য হবে। একজন শিক্ষার্থীর ভাষা গড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বিদ্যালয়জীবন। এই সময়ে শিক্ষক যে ভাষায় কথা বলেন, যেভাবে শব্দ উচ্চারণ করেন, শিক্ষার্থীরা অনেকাংশেই তা অনুসরণ করে। ফলে শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তাঁর কথাবার্তা, উচ্চারণ ও ভাষার ব্যবহারও শিক্ষার্থীর জন্য এক ধরনের জীবন্ত পাঠ।

️শুধু বাংলা নয়, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষেই প্রমিত উচ্চারণ

প্রমিত উচ্চারণের প্রয়োজন শুধু বাংলা বিষয়ের শিক্ষকের জন্য—এমন ধারণা ঠিক নয়। বাংলা ছাড়া গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, ধর্ম, সমাজবিজ্ঞানসহ প্রতিটি বিষয়েই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্পষ্ট ও প্রমিত ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে।

গণিতের শিক্ষক যখন কোনো সূত্র বা সমস্যার ব্যাখ্যা করেন, বিজ্ঞান শিক্ষক যখন কোনো বৈজ্ঞানিক বিষয় বোঝান, ইতিহাসের শিক্ষক যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরেন কিংবা ভূগোলের শিক্ষক যখন কোনো অঞ্চল বা প্রাকৃতিক বিষয় ব্যাখ্যা করেন—তখন উচ্চারণ অস্পষ্ট হলে শিক্ষার্থীর বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সঠিক উচ্চারণ শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেক সময় এটি অর্থ স্পষ্ট করারও মাধ্যম।

ইংরেজি ভাষার নিজস্ব উচ্চারণব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের পাঠদানে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হলে সেখানে প্রমিত বাংলা উচ্চারণের চর্চা হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

️বাড়িতে সম্ভব না হলে বিদ্যালয়ই হোক আশ্রয়

আমাদের বাস্তবতা হলো—সব শিক্ষার্থী বাড়িতে প্রমিত উচ্চারণের পরিবেশ পায় না। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। এতে কোনো দোষ নেই; আঞ্চলিক ভাষা আমাদের শিকড় ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর প্রমিত ভাষা শেখার জন্য নিয়মিত অনুশীলনের পরিবেশও প্রয়োজন।

একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যালয়ে থাকে। তাই বিদ্যালয়ই হতে পারে তার প্রমিত ভাষা ও উচ্চারণ শেখার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা। প্রতিটি শিক্ষক যদি নিজের পাঠদানে যত্নসহকারে প্রমিত উচ্চারণ ব্যবহার করেন, তাহলে আলাদা করে ‘উচ্চারণের ক্লাস’ না নিয়েও শিক্ষার্থীদের ভাষা অনেকটা শুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

️শিক্ষককে সংকোচ কাটাতে হবে

প্রমিত ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষকও কখনো কখনো এক ধরনের সংকোচ বা লজ্জাবোধ করেন। মনে হয়, “আমি যদি প্রমিত ভাষায় কথা বলি, শিক্ষার্থীরা হয়তো হাসবে”, অথবা “এভাবে কথা বললে আমাকে কৃত্রিম মনে হবে।” এই সংকোচ দূর করা জরুরি।

প্রমিত ভাষায় কথা বলা কোনো কৃত্রিমতা নয়; এটি একটি সচেতন ভাষাচর্চা। শিক্ষককে মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে শেখে। শিক্ষক নিজে যদি প্রমিত উচ্চারণ ব্যবহারে আত্মবিশ্বাসী হন, শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে তা গ্রহণ করবে।

একজন শিক্ষক ভুল করলে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। বরং নিজের ভুল সংশোধনের মানসিকতাই একজন ভালো শিক্ষকের পরিচয়। ভাষা প্রতিদিন চর্চার বিষয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একসঙ্গে শিখতে পারেন।

️আমরা লিখি এক, বলি আরেক

বাংলা উচ্চারণ শেখার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো- বাংলায় বানান ও উচ্চারণ সব সময় এক নয়। আমরা অনেক শব্দ যেভাবে লিখি, সেভাবে উচ্চারণ করি না। এখানেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

যেমন- 'পদ্মা' লিখলেও উচ্চারণের সময় বলি 'পদদা'। 'আহ্বান' লিখলেও উচ্চারণের সময় বলি 'আওভান'। নদী, জিহ্বা, ব্রাহ্মণ, মর্যাদা, গদ্য ইত্যাদি শব্দেও লিখিত রূপ ও কথ্য উচ্চারণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

তাই শিক্ষার্থীদের শুধু “শব্দটি কীভাবে লিখতে হয়” শেখালেই হবে না; “শব্দটি কীভাবে বলতে হয়”—সেটিও শেখাতে হবে।

️ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে হোক ভাষার আনন্দময় চর্চা

প্রমিত উচ্চারণ শেখানোর জন্য প্রতিদিন আলাদা ক্লাসের প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষক ক্লাসের ফাঁকে এক-দুই মিনিটের ছোট ছোট ভাষাচর্চা করতে পারেন।

আজকের শব্দ হতে পারে-‘গ্রীষ্ম’।

পরের দিন-'বিষ্ময়’।

অন্যদিন- ‘জ্ঞান’, ‘উৎসব’, ‘শ্রদ্ধা’ কিংবা ‘স্মরণ’।

শিক্ষক বলতে পারেন, “আজ আমরা একটি শব্দ শিখব। সবাই বলো তো, শব্দটি কীভাবে উচ্চারণ করবে?” এরপর শিক্ষার্থীদের দিয়ে বলিয়ে সঠিক উচ্চারণটি বুঝিয়ে দেওয়া যায়।

এভাবে ভাষাশিক্ষা হয়ে উঠবে আনন্দময়। শিক্ষার্থীরা ভুলকে ভয় না পেয়ে নিজেরাই প্রশ্ন করতে শিখবে। একটি শব্দ নিয়ে ছোট্ট আলোচনা কখনো কখনো পুরো ক্লাসের পরিবেশও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

️প্রমিত উচ্চারণ মানে আঞ্চলিক ভাষাকে অবমূল্যায়ন নয়

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার-প্রমিত ভাষা শেখানোর অর্থ আঞ্চলিক ভাষাকে ছোট করা নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের ভাষার নিজস্ব সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রয়েছে। আঞ্চলিক ভাষা আমাদের সংস্কৃতির সম্পদ।

কিন্তু বিদ্যালয়, গণমাধ্যম, আনুষ্ঠানিক সভা, বক্তব্য, উপস্থাপনা ও সর্বজনীন যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি সর্বজনগ্রাহ্য ভাষার প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই প্রমিত ভাষার গুরুত্ব।

️প্রমিত উচ্চারণ ব্যক্তিত্বেরও অংশ

একজন মানুষ কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে শব্দ উচ্চারণ করেন, কীভাবে বাক্য সাজান-এসব তাঁর ব্যক্তিত্বের ওপরও প্রভাব ফেলে। স্পষ্ট ও সুন্দর উচ্চারণ একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ভবিষ্যতে সে যখন বিতর্ক করবে, বক্তব্য দেবে, চাকরির সাক্ষাৎকারে অংশ নেবে কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে কথা বলবে, তখন এই ভাষাচর্চাই তাকে এগিয়ে রাখবে।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষা ও ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। তাঁর ভাষাবিষয়ক কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ভাষা কেবল লিখিত বর্ণের সমষ্টি নয়; ধ্বনি ও উচ্চারণও ভাষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ভাষাশিক্ষায় উচ্চারণকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

️শেষ কথা

প্রমিত উচ্চারণ শেখানোর দায়িত্ব শুধু বাংলা শিক্ষকের নয়; এটি বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষকের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ শিক্ষার্থীর ভাষা শুধু বাংলা ক্লাসে তৈরি হয় না-সে পুরো বিদ্যালয়জুড়েই ভাষা শেখে।

তাই প্রয়োজন এমন একটি বিদ্যালয়-পরিবেশ, যেখানে শিক্ষক নিজে প্রমিত ভাষায় কথা বলবেন, শিক্ষার্থীকে উৎসাহ দেবেন, ভুল উচ্চারণকে নিয়ে উপহাস না করে সংশোধনের সুযোগ দেবেন এবং ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট শব্দ ও উচ্চারণ নিয়ে আনন্দময় আলোচনা করবেন।

বাড়িতে হয়তো সব শিক্ষার্থী প্রমিত উচ্চারণের পরিবেশ পায় না। কিন্তু বিদ্যালয় যদি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে, তবে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠতে পারে প্রমিত ভাষা ও সুন্দর উচ্চারণ চর্চার প্রাণকেন্দ্র।

শিক্ষকের কণ্ঠ থেকে শিক্ষার্থীর কণ্ঠে, আর শ্রেণিকক্ষ থেকে সমাজে-এভাবেই ছড়িয়ে পড়ুক শুদ্ধ, স্পষ্ট ও সুন্দর বাংলা উচ্চারণের চর্চা।

প্রমিত উচ্চারণ হোক শিক্ষার অংশ, আর শ্রেণিকক্ষ হোক ভাষার সবচেয়ে সুন্দর বিদ্যালয়।

 

লেখক: পংকজ কান্তি গোপ, সিনিয়র শিক্ষক, পুটিজুরী শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, বাহুবল, হবিগঞ্জ।

ইমেইল: [email protected]

মন্তব্য করুন