সহকারী শিক্ষক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:০৫ অপরাহ্ণ
অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠবেন যেভাবে
সকালে ঘুম ভাঙানোর দায়িত্বটা অনেকের কাছেই মোবাইল ফোনের অ্যালার্মের। অ্যালার্ম না বাজলে হয়তো ঘুম আরও কয়েক ঘণ্টা গড়াতে পারে এমন আশঙ্কাও থাকে। কিন্তু নিয়মিত কিছু অভ্যাস গড়ে তুললে শরীরের নিজস্ব জৈবঘড়ির ওপর ভরসা করে অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে জেগে ওঠা সম্ভব।
ছোটবেলায় স্কুলের নির্দিষ্ট সময়ের রুটিনের কারণে ঘুমানো ও জেগে ওঠার একটি স্বাভাবিক ছন্দ তৈরি হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে কাজ, পরিবার, সামাজিক জীবন ও অনিয়মিত সময়সূচির কারণে সেই ছন্দ অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সকালে জেগে উঠতে বাইরের কোনো সংকেতের প্রয়োজন হয়। তবে ঘুমের সময় ঠিক করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং আলো-অন্ধকারের স্বাভাবিক চক্রের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে পারলে ধীরে ধীরে এই অভ্যাস বদলানো যায়। এতে শুধু অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা কমে না, সকালে ঘুমঘুম ভাবও কমতে পারে এবং দিনের শুরুটা হতে পারে আরও সতেজভাবে।
আগে বুঝতে হবে আপনার কতটা ঘুম প্রয়োজন
সুস্থ থাকার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি রাতে প্রায় সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। তবে প্রত্যেকের ঘুমের চাহিদা এক নয়। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস ডালাসের সেন্টার ফর ব্রেইন হেলথের সহকারী অধ্যাপক এবং স্লিপ ইনোভেশন ল্যাবসের সহযোগী পরিচালক ইটি বেন সাইমনের মতে, আট ঘণ্টা ঘুম অনেকের জন্য উপযুক্ত হলেও কারও সাত ঘণ্টাই যথেষ্ট হতে পারে। আবার কারও শরীরের প্রয়োজন হতে পারে নয় ঘণ্টা ঘুমের। এর পেছনে ব্যক্তিভেদে সার্কাডিয়ান রিদম বা ২৪ ঘণ্টার প্রাকৃতিক জৈবঘড়ির পার্থক্যও ভূমিকা রাখে।
নিজের প্রয়োজনীয় ঘুমের সময় বোঝার জন্য ছুটির কয়েকটি দিন কাজে লাগানো যেতে পারে। যখন সকালে কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই এবং অ্যালার্ম দেওয়ার প্রয়োজনও নেই, তখন স্বাভাবিকভাবে কখন ঘুম ভাঙছে তা লক্ষ্য করুন। কয়েক দিন ধরে একই ধরনের সময় পাওয়া গেলে সেটি আপনার শরীরের স্বাভাবিক জাগার সময় সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
প্রতিদিন একই রুটিন ধরে রাখুন
শুধু বেশি সময় ঘুমালেই হবে না, ঘুমানোর ও জেগে ওঠার সময়ও যতটা সম্ভব নিয়মিত রাখা দরকার। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চ ল্যাবের সহ-পরিচালক হেলেন বার্গেসের মতে, এমন সময়ে বিছানায় যাওয়া উচিত যাতে প্রয়োজনীয় ঘুম পূরণ করার সুযোগ থাকে। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ওঠার অভ্যাস শরীরকে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে অভ্যস্ত করে। একসময় শরীর নিজেই বুঝতে শুরু করে কখন বিশ্রামের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং কখন সক্রিয় হওয়ার সময়।
সকালের আলো হতে পারে প্রাকৃতিক অ্যালার্ম
ঘুম ও জাগরণের সঙ্গে আলোর সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীরের সার্কাডিয়ান ঘড়ি পরিবেশের আলো থেকে অনেকটা সংকেত নেয়।
সনদপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম গবেষক আনা জয়েসের মতে, আলো সার্কাডিয়ান ঘড়ির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। সকালে আলো চোখে পৌঁছালে শরীর বুঝতে পারে দিনের শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত মেলাটোনিনের মাত্রা কমতে শুরু করে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যত দ্রুত সম্ভব পর্দা সরিয়ে ঘরে প্রাকৃতিক আলো ঢুকতে দেওয়া তাই উপকারী হতে পারে। সকালের উজ্জ্বল আলো শরীরের জাগ্রত হওয়ার প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে। এ সময় কর্টিসলও বাড়তে থাকে, যা শরীরকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে রাতে ঘুমানোর সময় ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখা ভালো। ব্ল্যাকআউট পর্দা কিংবা আই মাস্ক ব্যবহার করাও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
ঘুমানোর আগে তৈরি করুন ‘উইন্ড-ডাউন’ রুটিন
ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকা শরীরকে দ্রুত ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে দেয় না। তাই শোয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে থেকেই ধীরে ধীরে দিনের ব্যস্ততা কমিয়ে আনার অভ্যাস করা যেতে পারে। এই সময়টায় নিজের জন্য একটি শান্ত রুটিন তৈরি করুন। যেমন, হালকা ত্বকের যত্ন নেওয়া, দাঁত ব্রাশ করা, আরামদায়ক পোশাক পরা, বই পড়া, শান্ত কোনো কাজ করা। রাতে ঘরের আলোও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা ভালো। কারণ কম আলো শরীরকে মেলাটোনিন তৈরির সংকেত দেয় এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
ঘরের তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ
ঘুমের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। শরীর অতিরিক্ত তাপ হাত-পায়ের দিকে রক্তপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে বাইরে বের করে দেয়। এ কারণেই খুব গরম পরিবেশে ঘুমানো কঠিন হতে পারে। গরমে ঘুমে বারবার ব্যাঘাত ঘটলে সকালে সতেজভাবে জেগে ওঠাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঘুমানোর আগে ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক করে নিন। প্রয়োজন হলে ফ্যান বা এসি ব্যবহার করুন। পাশাপাশি ভারী পোশাক বা মোটা কম্বলের পরিবর্তে হালকা পোশাক ও পাতলা চাদর ব্যবহার করতে পারেন।
ঘুমের বড় শত্রু হতে পারে স্মার্টফোন
বিছানায় যাওয়ার পর হাতে ফোন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে করতে কখন যে অনেকটা সময় চলে যায়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। ফোনের নীল আলো রাতে মস্তিষ্কে দিনের আলোর মতো সংকেত পাঠাতে পারে। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সমস্যা শুধু নীল আলোতে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্রমাগত স্ক্রল করার অভ্যাসও ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে। একের পর এক নতুন কনটেন্ট দেখার কারণে ব্যবহারকারী দীর্ঘ সময় ফোনে আটকে থাকতে পারেন। ২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে প্রায় ৪৫ হাজার নরওয়েজীয় শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে খারাপ ঘুমের সম্পর্ক পাওয়া যায়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের বয়সের কারণে তুলনামূলক বেশি ঘুম প্রয়োজন হলেও অনেকেই পর্যাপ্ত সময় ঘুমাতে পারে না।
ঘুমানোর আগে ফোন থেকে দূরে থাকুন
ঘুমের সময় ঠিক করতে চাইলে শোয়ার আগে ফোন ব্যবহার কমানো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। প্রয়োজনে ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময়ের পর কিছু অ্যাপ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা যায়। ফোনে গ্রেস্কেল মোড চালু করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি ও ভিডিও তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো ঘুমানোর সময় ফোনটি বিছানা থেকে কিছুটা দূরে রাখা। এতে অকারণে বারবার ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।
খাবার ও ক্যাফেইনের দিকেও নজর দিন
শুধু ঘুমানোর সময় নয়, দিনের খাবারের সময়ও শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করা, প্রতিদিন প্রায় নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া এবং ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার অভ্যাস ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে। অ্যালকোহল ঘুমিয়ে পড়তে শুরুতে সাহায্য করলেও রাতের পরের অংশে ঘুমের স্বাভাবিক ধারায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ঘুম ভালো রাখতে এটি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
হঠাৎ নয়, ধীরে বদলান ঘুমের সময়
কারও ঘুমের সময় যদি দীর্ঘদিন ধরে এলোমেলো থাকে, তাহলে একদিনেই সেটি ঠিক করার চেষ্টা না করাই ভালো। হেলেন বার্গেসের পরামর্শ হলো, ঘুমানো ও জেগে ওঠার সময় ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা। প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট করে সময় এগিয়ে এনে কাঙ্ক্ষিত সময়ের কাছাকাছি যাওয়া যেতে পারে। এরপর নতুন সময়সূচিটি নিয়মিত ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। কারণ শরীরের জৈবঘড়ি খুব দ্রুত বদলায় না। নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে সেটিকে নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়।
অ্যালার্ম ছাড়াই ওঠার মূল চাবিকাঠি নিয়মিত অভ্যাস
অ্যালার্ম ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা কোনো রাতারাতি শেখা কৌশল নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, নির্দিষ্ট ঘুমের সময়, সকালের আলো, রাতে কম আলো, ফোন থেকে দূরত্ব এবং আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ সবকিছু মিলিয়েই শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ তৈরি হয়। জীবনের ব্যস্ততায় মাঝে মাঝে এই রুটিন নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। তাই এক-দুই দিন নিয়ম ভেঙে গেলে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ধীরে ধীরে আবার আগের সময়সূচিতে ফিরে আসাই গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ধৈর্য। শরীরের জৈবঘড়িকে জোর করে বদলানো যায় না; নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে তাকে ধীরে ধীরে নতুন ছন্দে অভ্যস্ত করতে হয়।
১৪
২১ মন্তব্য