সহকারী অধ্যাপক
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
আকাশে উড়ন্ত পাখি—আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন
আকাশে উড়ন্ত পাখি—আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন
(সূরা আল-মুলক : ১৯ নম্বর আয়াতের আলোকে)
মহাবিশ্ব আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরত, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশীলতার এক উন্মুক্ত নিদর্শন। আকাশ, বাতাস, মেঘ, বৃষ্টি, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়, নদী, সমুদ্র, উদ্ভিদ, প্রাণী—সবকিছুই তাঁর সৃষ্টির পরিচয় বহন করে। মানুষের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এসব নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করলে মহান আল্লাহর ক্ষমতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও রহমত সম্পর্কে ঈমান আরও দৃঢ় হয়।
সূরা আল-মুলকের ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আকাশে উড়ে চলা পাখিদের দিকে। পাখিরা কখনো ডানা মেলে আকাশে ভেসে থাকে, আবার কখনো ডানা গুটিয়ে নেয়। তারা কীভাবে শূন্যে অবস্থান করে এবং আকাশে বিচরণ করে—এ নিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اَوَ لَمۡ یَرَوۡا اِلَی الطَّیۡرِ فَوۡقَهُمۡ صٰٓفّٰتٍ وَّ یَقۡبِضۡنَ ۚ مَا یُمۡسِكُهُنَّ اِلَّا الرَّحۡمٰنُ ؕ اِنَّهٗ بِكُلِّ شَیۡءٍۭ بَصِیۡرٌ
অর্থ: “তারা কি তাদের ওপরের পাখিদের প্রতি লক্ষ্য করে না, যারা ডানা মেলে রাখে এবং গুটিয়ে নেয়? পরম করুণাময় ছাড়া কেউ তাদের ধরে রাখে না। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছুর সম্যক দ্রষ্টা।”
—সূরা আল-মুলক, ৬৭:১৯
এই আয়াত মানুষকে শুধু পাখি দেখার শিক্ষা দেয় না; বরং পাখির উড্ডয়নের পেছনে আল্লাহর কুদরত ও পরিচালনা উপলব্ধি করার আহ্বান জানায়।
পাখির উড্ডয়ন—এক বিস্ময়কর নিদর্শন
পাখিরা আকাশে উড়ে বেড়ায়। কখনো তারা ডানা বিস্তৃত করে বাতাসে ভেসে থাকে, কখনো ডানা ঝাপটে দ্রুত এগিয়ে যায়, আবার কখনো ডানা গুটিয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। তাদের এই স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খল চলাফেরা মানুষের কাছে হয়তো প্রতিদিনের সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু একজন মুমিনের কাছে এটি আল্লাহর কুদরতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
একটি ছোট পাখির শরীর কত হালকা, তার ডানা কত সুন্দরভাবে গঠিত, তার দৃষ্টিশক্তি কত প্রখর, তার চলাফেরায় কত সূক্ষ্ম ভারসাম্য—এসবের পেছনে রয়েছে মহান স্রষ্টার অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।
পাখি নিজের শক্তিতে স্বাধীনভাবে সবকিছু করতে পারে—এমন ধারণা ইসলামী দৃষ্টিতে সঠিক নয়। পাখির অস্তিত্ব, তার শক্তি, তার দেহের গঠন, তার উড্ডয়নের সামর্থ্য এবং তার জন্য নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়ম—সবই আল্লাহর সৃষ্টি ও বিধানের অন্তর্ভুক্ত।
“রহমান ছাড়া কে তাদের ধরে রাখে?”
আয়াতের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো—“পরম করুণাময় ছাড়া কেউ তাদের ধরে রাখে না।”
এর অর্থ এই নয় যে পাখিকে আকাশে রাখার জন্য অবশ্যই কোনো অদৃশ্য হাত পাখিটিকে ধরে রেখেছে। বরং আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় এমন নিয়ম ও ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছেন, যার মাধ্যমে পাখিরা আকাশে উড়তে পারে এবং নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারে।
বাতাস, ডানা, দেহের গঠন, ভারসাম্য ও উড্ডয়নের অন্যান্য উপকরণ—সবই আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি তাঁর সৃষ্টিজগতকে নির্ধারিত নিয়মের অধীনে পরিচালনা করেন।
তাই একজন মুমিন যখন পাখিকে আকাশে উড়তে দেখে, তখন তার হৃদয়ে শুধু বৈজ্ঞানিক বিস্ময় সৃষ্টি হয় না; বরং সে স্রষ্টার কুদরতও উপলব্ধি করে।
বিজ্ঞান আমাদের বলতে পারে পাখি কীভাবে উড়ে; কিন্তু একজন মুমিন একই সঙ্গে উপলব্ধি করে—এই উড্ডয়নের সামর্থ্য, নিয়ম ও উপকরণ কে সৃষ্টি করেছেন এবং কে সেগুলো পরিচালনা করছেন।
পাখির ডানা—আল্লাহর নিখুঁত সৃষ্টির প্রমাণ
পাখির ডানা অত্যন্ত বিস্ময়কর একটি সৃষ্টি। ডানার গঠন, পালকের বিন্যাস, শরীরের ওজন, পেশির শক্তি এবং ভারসাম্য—সবকিছুই তার উড্ডয়নের উপযোগী করে সৃষ্টি করা হয়েছে।
একটি পাখি যখন ডানা মেলে আকাশে ভেসে থাকে, তখন তার প্রতিটি নড়াচড়া একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে ঘটে। সে যখন ডানা ঝাপটায়, তখন সামনে এগিয়ে যায়। যখন ডানা বিস্তৃত করে, তখন বাতাসের সহায়তায় ভেসে থাকতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডানার অবস্থান পরিবর্তন করে সে গতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং দিক পরিবর্তন করে।
এত সূক্ষ্ম ও সুন্দর ব্যবস্থা একজন সচেতন মানুষকে স্রষ্টার মহত্ত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
কুরআন মানুষকে বারবার সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানিয়েছে। কারণ সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধির পথ উন্মুক্ত হয়।
পাখির জীবনেও রয়েছে রিজিকের ব্যবস্থা
পাখি প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়। তার সামনে হয়তো কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যভাণ্ডার দেখা যায় না। তবু সে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রাণীর জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন।
কখনো পাখি শস্য খায়, কখনো ফল, কখনো পোকামাকড় বা অন্য উপযোগী খাদ্য গ্রহণ করে। তার জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সৃষ্টিজগতের মধ্যে রাখা হয়েছে।
এ থেকে মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ।
মানুষকে অবশ্যই জীবিকা অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। ইসলাম অলসতা শেখায় না। বরং বৈধ উপায়ে পরিশ্রম ও উপার্জনের নির্দেশ দেয়। কিন্তু চেষ্টা করার পাশাপাশি অন্তরকে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল রাখতে হবে।
পাখির উড্ডয়ন ও তাওহিদের শিক্ষা
এই আয়াতের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো তাওহিদ—আল্লাহ তাআলাকে এক ও অদ্বিতীয় রব হিসেবে বিশ্বাস করা এবং তাঁর সঙ্গে কোনো শরিক না করা।
আকাশে পাখির উড্ডয়ন দেখে মুমিন উপলব্ধি করে যে, এই বিশাল সৃষ্টি-ব্যবস্থার একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আছেন। তিনি এককভাবে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও সর্বময় নিয়ন্ত্রক।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আল্লাহই সব কিছুর স্রষ্টা।”
—সূরা আয-যুমার, ৩৯:৬২
অতএব পাখি, আকাশ, বাতাস কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর ক্ষমতার অংশীদার মনে করা যাবে না। সৃষ্টিকে সম্মান করা যায়, সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে বিস্মিত হওয়া যায়, কিন্তু ইবাদত ও চূড়ান্ত নির্ভরতা কেবল আল্লাহর জন্য।
আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে—
إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ بَصِيرٌ
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই তিনি সবকিছুর সম্যক দ্রষ্টা।”
আল্লাহ তাআলা সবকিছু দেখেন। প্রকাশ্য ও গোপন কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়। মানুষের কর্ম, কথা, আচরণ, উদ্দেশ্য এবং জীবনের প্রতিটি অবস্থা তাঁর জ্ঞাত।
এই বিশ্বাস মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে।
একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তাকে সর্বদা দেখছেন, তখন সে গোপনেও অন্যায় করতে ভয় পায়। মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর দৃষ্টি থেকে কিছুই গোপন করা সম্ভব নয়।
তাই আল্লাহর সর্বদর্শিতার বিশ্বাস একজন মুমিনকে সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়ার পথে পরিচালিত করে।
সৃষ্টিকে দেখা থেকে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা
কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্য উপভোগের বিষয় নয়; বরং এটি শিক্ষা গ্রহণেরও মাধ্যম।
একটি পাখিকে আকাশে উড়তে দেখে মানুষ ভাবতে পারে—
আমি কে?
আমাকে কে সৃষ্টি করেছেন?
আমার জীবন কে দিয়েছেন?
আমার রিজিক কোথা থেকে আসে?
আমার শক্তি কে দিয়েছেন?
মৃত্যুর পর আমাকে কোথায় ফিরে যেতে হবে?
এ ধরনের চিন্তা মানুষের অন্তরকে জাগ্রত করে।
যে চোখ শুধু দৃশ্য দেখে, সে পাখি দেখে চলে যায়। কিন্তু যে হৃদয় ঈমানের আলোয় জাগ্রত, সে পাখির উড্ডয়নে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন দেখতে পায়।
মানুষের অহংকারের অবসান
মানুষ কখনো তার জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা, প্রযুক্তি কিংবা সামাজিক মর্যাদা নিয়ে অহংকার করতে পারে। কিন্তু আকাশে উড়ে চলা একটি পাখিও তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ যত শক্তিশালী মনে করুক নিজেকে, সে নিজেও আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর ওপর নির্ভরশীল।
মানুষের চোখে পৃথিবীর অনেক কিছুই তার নিয়ন্ত্রণাধীন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, জীবন, মৃত্যু ও অসংখ্য প্রয়োজন তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই।
তাই মুমিনের চরিত্রে অহংকারের পরিবর্তে বিনয় থাকা উচিত।
সে বলবে—
আমি আল্লাহর বান্দা।
আমার শক্তি তাঁর দান।
আমার জ্ঞান তাঁর দেওয়া।
আমার জীবন তাঁর আমানত।
আমার রিজিক তাঁরই হাতে।
পাখি আমাদের তাওয়াক্কুল শেখায়
পাখি সকালে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। সে বাসায় বসে থেকে খাবার আসার অপেক্ষা করে না। সে চেষ্টা করে, উড়ে বেড়ায় এবং খাদ্য অনুসন্ধান করে।
এখানে মানুষের জন্য সুন্দর শিক্ষা রয়েছে—তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়।
ইসলামী তাওয়াক্কুল হলো—বৈধ উপায়ে প্রয়োজনীয় চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
কৃষক জমিতে বীজ বপন করবে, ব্যবসায়ী বৈধ ব্যবসা করবে, শিক্ষার্থী মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে, কর্মী দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবে—তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
অতএব, চেষ্টা মানুষের দায়িত্ব; সফলতা আল্লাহর তাওফিক।
বিপদের সময় আল্লাহর ওপর ভরসা
জীবনে নানা বিপদ, দুঃখ, সংকট ও অনিশ্চয়তা আসে। কখনো মানুষ মনে করে তার সামনে আর কোনো পথ নেই। কিন্তু একজন মুমিন জানে—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়।
যে আল্লাহ আকাশে উড়ন্ত পাখির জন্য ব্যবস্থা করেন, তিনি তাঁর বান্দার অবস্থাও জানেন। তিনি বান্দার প্রয়োজন, দুঃখ ও অসহায়ত্ব সম্পর্কে অবগত।
তবে আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং দোয়া, চেষ্টা, ধৈর্য ও বৈধ উপায় অবলম্বন—সবকিছুর সমন্বয় করাই ইসলামী তাওয়াক্কুলের পথ।
আল্লাহর রহমত সর্বব্যাপী
আয়াতে আল্লাহর একটি মহান নাম এসেছে—আর-রহমান, অর্থাৎ পরম করুণাময়।
পাখির প্রতি তাঁর রহমত যেমন প্রকাশিত, তেমনি মানুষের প্রতিও তাঁর অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে। বাতাস, পানি, আলো, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পরিবার, জ্ঞান, বুদ্ধি—মানুষের জীবন আল্লাহর অগণিত নিয়ামতে পরিপূর্ণ।
মানুষ অনেক সময় যে নিয়ামতগুলো প্রতিদিন পায়, সেগুলোর মূল্য উপলব্ধি করে না। কিন্তু যখন কোনো নিয়ামত হারিয়ে যায়, তখন তার গুরুত্ব বুঝতে পারে।
তাই মুমিনের উচিত নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা।
পরিবেশ ও প্রাণীর প্রতি দায়িত্ব
পাখি আল্লাহর সৃষ্টি। তাই প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা ইসলামের শিক্ষা নয়। মানুষের উচিত আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীল আচরণ করা।
অকারণে প্রাণী হত্যা, তাদের বাসা নষ্ট করা, খাদ্য ও পানির উৎস ধ্বংস করা কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা অনুচিত।
প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও আল্লাহর দেওয়া আমানতের প্রতি দায়িত্বশীলতার অংশ।
একজন মুমিন সৃষ্টির প্রতি দয়া করবে এবং স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করবে।
জ্ঞান ও ঈমানের সমন্বয়
পাখির উড্ডয়ন নিয়ে বিজ্ঞান গবেষণা করে। পাখির শরীরের গঠন, ডানার প্রকৃতি, বায়ুপ্রবাহ, ভারসাম্য ও উড্ডয়নের নিয়ম নিয়ে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে। এসব জ্ঞান আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিকে আরও গভীর করতে পারে।
ইসলাম জ্ঞানচর্চার বিরোধী নয়। বরং সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা মানুষকে আল্লাহর নিদর্শন উপলব্ধিতে সহায়তা করতে পারে।
তবে একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রাকৃতিক নিয়ম আবিষ্কার করেই যেন সে স্রষ্টাকে অস্বীকার না করে। বরং সে বুঝবে, নিয়মের অস্তিত্বও স্রষ্টার কুদরত ও প্রজ্ঞার অংশ।
শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
এই আয়াত শিশু-কিশোরদের জন্যও অত্যন্ত শিক্ষণীয়।
তাদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে শেখানো উচিত। পাখি কেন উড়ে, কীভাবে খাবার খুঁজে নেয়, কীভাবে বাসা বানায়, কীভাবে সন্তান লালন করে—এসব বিষয়ে জানার পাশাপাশি তাদের বোঝানো উচিত যে এসবের পেছনে আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি ও প্রজ্ঞার নিদর্শন রয়েছে।
এভাবে বিজ্ঞানচর্চা ও ঈমানের শিক্ষা পাশাপাশি চলতে পারে।
একটি পাখি হতে পারে একটি শিশুর জন্য জীবন্ত পাঠশালা—যেখানে সে জীববিজ্ঞান শেখার পাশাপাশি স্রষ্টার কুদরত সম্পর্কেও চিন্তা করতে পারে।
পরিবার ও সমাজের জন্য শিক্ষা
পাখির জীবনেও দায়িত্ববোধের কিছু নিদর্শন দেখা যায়। তারা বাসা তৈরি করে, খাদ্য সংগ্রহ করে এবং সন্তানদের লালন-পালন করে।
মানুষ তার চেয়েও অধিক দায়িত্বশীল। কারণ আল্লাহ মানুষকে বিবেক, বুদ্ধি ও শরিয়তের বিধান দিয়েছেন।
অতএব বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে; সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্ব রয়েছে; স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে; প্রতিবেশী, আত্মীয় ও সমাজের মানুষের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে।
যে ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে, সে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হয়।
আয়াতটির প্রধান শিক্ষাসমূহ
সূরা আল-মুলকের ১৯ নম্বর আয়াত থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করতে পারি—
প্রথমত, আকাশে উড়ন্ত পাখি আল্লাহর কুদরতের অন্যতম নিদর্শন।
দ্বিতীয়ত, সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর নির্ধারিত ব্যবস্থার অধীন।
তৃতীয়ত, আল্লাহ তাআলা পরম করুণাময়; তাঁর রহমত সৃষ্টিজগতকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।
চতুর্থত, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা। কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়।
পঞ্চমত, প্রকৃতির নিদর্শন দেখে মানুষের ঈমান ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করা উচিত।
ষষ্ঠত, রিজিকের জন্য বৈধ চেষ্টা করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।
সপ্তমত, আল্লাহর নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
অষ্টমত, সৃষ্টির প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।
নবমত, সৃষ্টিকে দেখে স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
দশমত, মানুষের অহংকার না করে বিনয়ী ও আল্লাহভীরু হওয়া উচিত।
আমাদের করণীয়
এই আয়াত শুধু পড়ার জন্য নয়; জীবনে বাস্তবায়নের জন্যও শিক্ষা দেয়। তাই আমাদের উচিত—
১. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।
২. আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা।
৩. আল্লাহর একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।
৪. আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা।
৫. বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা।
৬. ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা।
৭. গোপন ও প্রকাশ্য সব কাজে আল্লাহকে ভয় করা।
৮. প্রাণী ও পরিবেশের প্রতি দয়াশীল হওয়া।
৯. অহংকার পরিত্যাগ করে বিনয়ী হওয়া।
১০. কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলা।
উপসংহার
সূরা আল-মুলকের ১৯ নম্বর আয়াত আমাদের চোখ খুলে প্রকৃতির দিকে তাকাতে শেখায়। আকাশে ডানা মেলে উড়ে চলা একটি পাখি শুধু একটি প্রাণী নয়; মুমিনের জন্য এটি আল্লাহর অসীম কুদরত, প্রজ্ঞা ও রহমতের একটি দৃশ্যমান নিদর্শন।
পাখি ডানা মেলে উড়ে, আবার ডানা গুটিয়ে নেয়। সে বাতাসের মধ্যে বিচরণ করে, খাদ্যের সন্ধানে দূর-দূরান্তে যায় এবং নির্ধারিত নিয়মে জীবনযাপন করে। তার এই জীবনব্যবস্থার মধ্যেও আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি ও পরিচালনার নিদর্শন রয়েছে।
তাই আমাদের উচিত শুধু চোখ দিয়ে পাখিকে দেখা নয়; ঈমানের চোখ দিয়ে তার উড্ডয়নের পেছনে মহান স্রষ্টার কুদরত উপলব্ধি করা।
আকাশের দিকে তাকালে যেন আমাদের অন্তর বলে ওঠে—
যিনি পাখিকে আকাশে উড়ার শক্তি দিয়েছেন,
যিনি তার জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন,
যিনি তাকে তাঁর নির্ধারিত নিয়মে পরিচালনা করেন,
যিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন—
তিনিই আমাদের রব, মহান আল্লাহ।
সুতরাং পাখির উড্ডয়ন আমাদের জন্য হোক ঈমান জাগানোর শিক্ষা, আল্লাহর কুদরত উপলব্ধির মাধ্যম, তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের প্রেরণা এবং তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করার স্মারক।
আকাশে পাখির ডানা মেলা আমাদের শেখাক—
আল্লাহ মহান, তাঁর কুদরত অসীম, তাঁর জ্ঞান সর্বব্যাপী,
তাঁর রহমত ব্যাপক এবং তাঁর দৃষ্টি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআনের আয়াতগুলো বুঝে পড়ার, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং সেই শিক্ষা অনুযায়ী ঈমান ও আমলে জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
৭
৭ মন্তব্য