Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০২:৩১ অপরাহ্ণ

উল্লুকগুলো গেল কোথায়—একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অমীমাংসিত দীর্ঘশ্বাস

উল্লুকগুলো গেল কোথায়—একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অমীমাংসিত দীর্ঘশ্বাস
আমি উল্লুক দেখেছি।
কথাটি এত সরল যে, এর জন্য কোনো অলংকারের প্রয়োজন নেই।
আমি তাদের দেখেছি নিজের চোখে।
আমি তাদের ডাক শুনেছি নিজের কানে।
আমি তাদের বিচরণ দেখেছি সেই বনের গাছের ডালে ডালে।
আমি দেখেছি—তারা এই বনেরই বাসিন্দা ছিল।
আজ যখন সেই বনে উল্লুক নেই, তখন আমার প্রশ্নটিও তাই কোনো বই থেকে উঠে আসা প্রশ্ন নয়, কোনো প্রতিবেদনের ভাষ্য নয়, কোনো নথির ওপর দাঁড়ানো অনুমান নয়।
এটি আমার নিজের দেখা জীবনের একটি প্রশ্ন।
চৈত্রের নীরব দুপুরে হঠাৎ বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে যেত—
“হুতু... হুতু...”
দূরের গাছের মগডাল থেকে ভেসে আসত সেই ডাক। শব্দটি কোথা থেকে আসছে, তা সবসময় চোখে পড়ত না; কিন্তু কান চিনে ফেলেছিল সেই কণ্ঠ।
স্থানীয় ভাষায় আমরা বলতাম ‘হুতু’। পরে জেনেছি, শুদ্ধ বাংলায় তার নাম উল্লুক।
আমার সঙ্গে এই প্রাণীটির পরিচয় আজকের নয়। তখন আমি কোনো গবেষক ছিলাম না, উল্লুকের সংখ্যা গণনা করার জন্যও বনে যাইনি। আমি তখন কেবল মাধ্যমিকের একটি ছাত্র। উল্লুক তখন আমাদের সাথী—একটু দেখা পেলেই সার্থকতা, তাদের লাফালাফি ও নৃত্য দেখলেই এক অদ্ভুত মনোরঞ্জন। তখন আমার চোখে তারা কেবল বনের প্রাণি, আমি তখন একটুও ভাবিনি যে এরা একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে। আমার অনাগত ভবিষ্যৎ হয়তো একদিন উল্লুকের গল্প শুনবে রূপকথার মতো।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সালের সময়ে ভেংডেবারের কাছের গভীর বনে বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়ে কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে আমি বহুবার উল্লুক দেখেছি। সেই জীবিকার পথেই আমার চোখের সামনে খুলে গিয়েছিল এক অন্য পৃথিবী।
উঁচু গাছের ডালে ডালে উল্লুকের পরিবার দেখতাম। এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফিয়ে যেত। কখনো কয়েকটি একসঙ্গে চলত, কখনো দূরত্ব রেখে। তাদের চলাফেরায় ছিল এমন স্বাভাবিকতা, যেন বনটি শুধু তাদের জন্যই তৈরি। তখন আমার মনে হতো, ওই এলাকায় ৫ থেকে ১০টি উল্লুক পরিবার থাকতে পারে। প্রতিটি পরিবারে ৩–৪টি সদস্য ধরলে, সব মিলিয়ে ২০–৪০টির মতো উল্লুক ওই বিস্তৃত বনাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে বিচরণ করত বলে আমার ধারণা।
এটি কোনো জরিপের সংখ্যা নয়। আমি যা দেখেছি, তার স্মৃতিনির্ভর হিসাব। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই— উল্লুক ছিল। আমি দেখেছি।
২০০১—শেষ দিকের সেই ডাক
২০০১ সালে আবারও বন আমার জীবনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেল।
কালিরছড়া বিটের মনোকালচার জ্বালানি কাঠের বাগানে বন বিভাগের হয়ে চারা লাগানোর শ্রমিক হিসেবে কাজ করতাম। সকাল থেকে বিকেল—গাছের চারা, মাটি, ঘাম আর বনের গন্ধের মধ্যে দিন কাটত। নাইফর শিয়া ও বড় কুরুমের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কাজ করার সময় কখনো কখনো হঠাৎ হাত থামিয়ে দিতাম। কাজের শব্দের মধ্যে কান পাততাম।
তারপর শুনতাম—
“হুতু... হুতু...”
সেই একই ডাক। সেই একই বন। সেই একই প্রাণী।
আমি তখন জানতাম না, ভবিষ্যতে এই ডাকটিই আমার কাছে একটি হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর স্মৃতি হয়ে থাকবে। তখন উল্লুক ছিল বলেই তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। আজ বুঝি, স্বাভাবিক বলে মনে হওয়া অনেক কিছুই একদিন হারিয়ে যায়।
আজ আমি কেন প্রশ্ন করছি?
কারণ আজ সেই উল্লুক নেই।
যে বনে তাদের দেখেছি, সেখানে আজ তাদের দেখি না। যে গাছের ডালে তাদের লাফাতে দেখেছি, সেখানে আজ তাদের ছুটে চলা দেখি না। যে দুপুরে তাদের ডাক শুনেছি, সেই দুপুরে আজও বাতাস আসে—কিন্তু সেই ডাক আসে না।
“হুতু... হুতু...”
নেই।
এই ‘নেই’ শব্দটিই আমাকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।
বন ধ্বংস হয়েছে—আমি জানি। আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে—আমি নিজের চোখে দেখেছি। বনের চেহারা বদলে গেছে—এটিও আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমি আরও একটি পরিবর্তনের সাক্ষী—উল্লুকের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
আমার দেখা সত্যকে কে অস্বীকার করবে? কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন— “আপনার প্রমাণ কী?”
আমি বলব— আমার চোখ।
আমি যদি বলি, ১৯৯০-এর দশকে আমি এই বনে উল্লুক দেখেছি, তাহলে সেটি কোনো কাগজে লেখা না থাকলেও আমার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। কোনো নথিতে লেখা হয়েছে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কেউ রিপোর্ট করেছেন কি না, সেটিও আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু আমি সেখানে ছিলাম—এ সত্যের সাক্ষী আমি নিজেই।
কিন্তু তারা গেল কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। আর ঠিক এই না-জানাটাই আমার কষ্ট।
হয়তো বন ধ্বংসের কারণে তারা ধীরে ধীরে কমে গেছে। হয়তো খাদ্য ও নিরাপদ আবাসস্থলের অভাবে অন্য বনে চলে গেছে। হয়তো পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হয়তো প্রাকৃতিক কারণেই একসময় শেষ হয়ে গেছে তাদের ছোট ছোট দলগুলো। কিন্তু মানুষের লোভের সম্ভাবনাটিকেও আমি একেবারে অস্বীকার করতে পারি না।
উল্লুক কি কখনো ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? কেউ কি তাদের শিকার করেছিল? কেউ কি জীবন্ত অবস্থায় তাদের বন থেকে তুলে নিয়েছিল?
আমি জানি না। কিন্তু আমি প্রশ্ন করতে পারি। কারণ যে প্রাণীকে আমি দেখেছি, তার হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কারণ জানার অধিকার আমার আছে।
কাউকে অভিযুক্ত করছি না, কিন্তু প্রশ্ন থামাবও না। প্রাকৃতিক মৃত্যু বাস্তবতা, আবাসস্থল ধ্বংস বাস্তবতা, স্থানান্তর সম্ভাবনা, শিকার বা অবৈধভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া—সবই সম্ভাবনা। কোনটি সত্য? আমি জানি না। কিন্তু আমি এতটুকু জানি— ১৯৯০-এর দশকে তারা ছিল। ২০০১ সালেও তাদের ডাক ছিল। আজ তারা নেই। এই তিনটি সত্যকে পাশাপাশি রাখলেই প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
আমি সেই শেষ ডাকের সাক্ষী
আজও কখনো চৈত্রের দুপুরে বনের কথা মনে পড়লে আমার কানে যেন ভেসে আসে—
“হুতু... হুতু...”
চোখের সামনে ভেসে ওঠে উঁচু গাছের ডাল। দেখি, একটি পরিবার এ ডাল থেকে ও ডালে যাচ্ছে। দেখি, আরেকটি একটু দূরে। তারপর মনে পড়ে—সেসব এখন আর নেই।
আমার কৈশোরের সেই বন আছে হয়তো। গাছও আছে কিছু। পাহাড় আছে। বাতাস আছে। শুধু নেই সেই প্রাণীগুলো। আর নেই সেই ডাক।
আমি জানি না তাদের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল। হয়তো তারা প্রকৃতির নিয়মে হারিয়ে গেছে। হয়তো বন হারিয়ে তাদের জীবনও হারিয়েছে। হয়তো তারা অন্য কোনো অরণ্যে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছে। কিংবা হয়তো মানুষের লোভ তাদের জীবন কেড়ে নিয়েছে।
আমি জানি না। কিন্তু আমি যে সত্যটি জানি, সেটি কেউ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না—
আমি তাদের দেখেছি। আমি তাদের শুনেছি। আমি তাদের সঙ্গে একই বনের ভেতর হেঁটেছি। আমি তাদের হারিয়ে যেতেও দেখেছি—যদিও সেই হারিয়ে যাওয়ার শেষ মুহূর্তটি আমার চোখের সামনে ঘটেনি।
তাই আজ আমার প্রশ্ন কোনো নথির কাছে নয়। আমার প্রশ্ন সেই বনের কাছে, যে বন একদিন তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। আমার প্রশ্ন সেই সময়ের কাছে, যে সময় তাদের আমার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
আর আমাদের সবার কাছে আমার একটাই প্রশ্ন—
উল্লুকগুলো গেল কোথায়?
আমি জানি না উত্তর কী। কিন্তু প্রশ্নটি আমি রেখে যেতে চাই। কারণ একদিন যদি এই বনের শেষ মানুষটিও ভুলে যায় যে এখানে উল্লুক ছিল, তাহলে তাদের অস্তিত্বের শেষ জীবন্ত সাক্ষ্যটুকুও হারিয়ে যাবে।
আমি চাই না সেই স্মৃতিটুকু হারিয়ে যাক। কারণ তারা শুধু একটি প্রজাতি ছিল না। তারা ছিল আমার দেখা বন। আমার শোনা বন। আমার কৈশোরের বন।
আর তাদের সেই ডাক—
“হুতু... হুতু...”
আজও আমার স্মৃতির ভেতর বেঁচে আছে।
একটি হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর ডাক হয়ে নয়—
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য হয়ে।

মুফিদুল আলম
রামু,কক্সবাজার।

মন্তব্য করুন

ব্লগ