সহকারী অধ্যাপক
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ : দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের সফলতার পথ -- মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ : দুনিয়ার শান্তি ও
আখিরাতের সফলতার পথ
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষের জীবনে পিতা-মাতার স্থান অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ। একজন মানুষ পৃথিবীতে আসার পর যাঁদের ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, ত্যাগ ও পরিচর্যায় ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, তাঁরা হলেন পিতা-মাতা। সন্তানের জন্ম থেকে তার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের পথচলায় পিতা-মাতা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। সন্তানের হাসিতে তাঁরা আনন্দ পান, সন্তানের কষ্টে ব্যথিত হন এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য নিরলস চেষ্টা করেন।
ইসলাম পিতা-মাতার এই মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআন মাজিদে বহু স্থানে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, পিতা-মাতার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, সেবা ও উত্তম আচরণ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
অর্থ: “তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে।”
—সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, তাওহিদের পর পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ ইসলামী জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পিতা-মাতার মর্যাদা
পিতা-মাতা সন্তানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নিয়ামত। তাঁদের মাধ্যমে সন্তান পৃথিবীতে আসে, তাঁদের হাত ধরে জীবন সম্পর্কে প্রথম শিক্ষা লাভ করে এবং তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসায় তার ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে।
মায়ের গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও স্তন্যদান—সবকিছুতেই রয়েছে অসীম ত্যাগ। অন্যদিকে পিতা সন্তানের ভরণপোষণ, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য পরিশ্রম করেন। তাই তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ
অর্থ: “আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।”
—সূরা লুকমান, ৩১:১৪
অতএব, আল্লাহর শুকরিয়ার পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করতে হবে।
পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম কথা বলা
পিতা-মাতার সঙ্গে সুন্দর ভাষায় কথা বলা সন্তানের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। তাঁদের সঙ্গে এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যাতে তাঁরা কষ্ট পান বা অপমানিত বোধ করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
অর্থ: “তাদের প্রতি ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।”
—সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩
এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। পিতা-মাতার কোনো আচরণে বিরক্ত হলেও সন্তানের উচিত নিজেকে সংযত রাখা। বিরক্তির সামান্য প্রকাশও তাঁদের হৃদয়ে আঘাত করতে পারে।
তাই—
- তাঁদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলতে হবে।
- উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- তাঁদের কথার মাঝখানে বাধা দেওয়া উচিত নয়।
- তাঁদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
- বিরক্তি, অবজ্ঞা ও বিদ্রূপের ভাষা পরিহার করতে হবে।
- তাঁদের ভুল হলে সম্মান বজায় রেখে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
পিতা-মাতার সামনে বিনয়ী হওয়া
সন্তান যত বড়ই হোক, পিতা-মাতার প্রতি তার বিনয় ও শিষ্টাচার বজায় রাখা উচিত। বিশেষ করে তাঁরা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তাঁদের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা বিবেচনা করে আরও বেশি ধৈর্যশীল হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ
অর্থ: “তাদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসার সঙ্গে বিনয়ের ডানা অবনত করো।”
—সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৪
অর্থাৎ পিতা-মাতার প্রতি অহংকার নয়; বরং ভালোবাসা, বিনয় ও মমতা প্রদর্শন করতে হবে।
আজ যে সন্তান নিজের শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে গর্ব করে, তাকে মনে রাখতে হবে—একদিন সে নিজেও অসহায় শিশু ছিল। তখন পিতা-মাতাই তাকে কোলে নিয়েছেন, হাঁটতে শিখিয়েছেন, কথা বলতে শিখিয়েছেন, খাইয়েছেন, ঘুম পাড়িয়েছেন এবং বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন।
বার্ধক্যে পিতা-মাতার সেবা
পিতা-মাতার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি হলো তাঁদের বার্ধক্য। এই বয়সে তাঁরা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন, অনেক সময় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন এবং অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।
শৈশবে সন্তান যখন অসহায় ছিল, পিতা-মাতা তখন তাকে সেবা করেছেন। বার্ধক্যে পিতা-মাতা যখন অসহায় হন, তখন সন্তানের দায়িত্ব তাঁদের সেবা করা।
সন্তানের উচিত—
তাঁদের প্রয়োজন বুঝে নেওয়া,
সময়মতো ওষুধ ও খাবারের ব্যবস্থা করা,
চিকিৎসার প্রয়োজন হলে চিকিৎসা করানো,
তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা,
একাকিত্ব দূর করা,
এবং তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা।
পিতা-মাতার সেবা শুধু অর্থ ব্যয়ের নাম নয়; সময় দেওয়া, কথা বলা, পাশে বসা, প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এসবও সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পিতা-মাতার জন্য দোয়া
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার অন্যতম সুন্দর প্রকাশ হলো তাঁদের জন্য দোয়া করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের শিখিয়েছেন—
وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
অর্থ: “আর বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’”
—সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৪
এই দোয়ায় সন্তানের অন্তরের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়। জীবিত পিতা-মাতার জন্য তাঁদের কল্যাণ, সুস্থতা, ঈমান ও বরকতের দোয়া করা উচিত। আর তাঁরা ইন্তেকাল করলে তাঁদের মাগফিরাত ও রহমতের জন্য দোয়া করা উচিত।
পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা
পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের ত্যাগকে স্মরণ করা এবং তাঁদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করাই প্রকৃত কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
একজন সন্তান হয়তো জীবনে অনেক মানুষের উপকারের কথা মনে রাখে, কিন্তু পিতা-মাতার অসংখ্য ত্যাগ ভুলে যায়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মায়ের রাতজাগা, বাবার পরিশ্রম, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের চিন্তা—এসবের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
সন্তানের উচিত সময় পেলেই পিতা-মাতার খোঁজ নেওয়া এবং তাঁদের অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হওয়া।
পিতা-মাতার আনুগত্যের সীমা
ইসলাম পিতা-মাতার আনুগত্যের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এই আনুগত্য সীমাহীন নয়। আল্লাহর অবাধ্যতার কোনো কাজে কারও আনুগত্য করা যাবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۖ وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا
অর্থ: “যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে বাধ্য করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।”
—সূরা লুকমান, ৩১:১৫
এ আয়াত ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার কথা মানা যাবে না; কিন্তু সেই কারণে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করা যাবে না।
অর্থাৎ গুনাহের কাজে আনুগত্য নয়, কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ অব্যাহত থাকবে।
পিতা-মাতার সঙ্গে মতভেদ হলে কী করণীয়?
জীবনে কখনো কখনো পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে মতভেদ হতে পারে। বয়স, অভিজ্ঞতা, চিন্তাধারা ও সময়ের পার্থক্যের কারণে মতের অমিল হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু মতভেদ মানেই সম্পর্কচ্ছেদ নয়।
সন্তানের উচিত—
১. উত্তেজিত না হওয়া।
২. ধৈর্য ধরে কথা বলা।
৩. কণ্ঠস্বর নিচু রাখা।
৪. সম্মান বজায় রাখা।
৫. নিজের বক্তব্য যুক্তি ও কোমলতার সঙ্গে তুলে ধরা।
৬. প্রয়োজন হলে পরিবারের জ্ঞানী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া।
৭. পিতা-মাতাকে অপমান বা হেয় না করা।
একজন সচেতন মুসলিম জানে—মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু অসম্মান করা যাবে না।
পিতা-মাতার প্রতি অবাধ্যতার ভয়াবহতা
যেভাবে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ বড় নেক আমল, তেমনি তাঁদের অবাধ্যতা ও কষ্ট দেওয়া গুরুতর গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বড় বড় গুনাহের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে পিতা-মাতার অবাধ্যতাকেও গুরুতর গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। —সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম
তাই পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া, অপমান করা, তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা, তাঁদের অযথা কষ্ট দেওয়া, তাঁদের প্রয়োজনকে অবহেলা করা কিংবা তাঁদের অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
বিশেষ করে বার্ধক্যে তাঁদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করা একজন সন্তানের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়।
মায়ের বিশেষ মর্যাদা
ইসলামে পিতা-মাতা উভয়েরই অধিকার রয়েছে। তবে মায়ের গর্ভধারণ, প্রসব ও লালন-পালনের অতিরিক্ত কষ্টের কারণে মায়ের বিশেষ মর্যাদার কথাও হাদিসে এসেছে।
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?”
তিনি বললেন, “তোমার মা।”
লোকটি জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর কে?”
তিনি বললেন, “তোমার মা।”
আবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, “তোমার মা।”
এরপর জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “তোমার বাবা।”
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম
এ হাদিস মায়ের বিশেষ মর্যাদা স্পষ্ট করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পিতার অধিকার কম গুরুত্বপূর্ণ; বরং পিতা-মাতা উভয়ের প্রতিই সদাচরণ করা সন্তানের দায়িত্ব।
পিতার অধিকার ও মর্যাদা
পরিবারের দায়িত্ব বহন, উপার্জন, সন্তানদের ভরণপোষণ, শিক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য পিতা যে ত্যাগ করেন, তারও যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত।
সন্তানের উচিত পিতার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা, তাঁর পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁর বার্ধক্যে তাঁর পাশে দাঁড়ানো।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ কোনো প্রতিযোগিতা নয়। মায়ের প্রতি ভালোবাসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাবার প্রতিও সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রয়োজন।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ শুধু জীবিত অবস্থায় নয়
পিতা-মাতা ইন্তেকাল করলেও সন্তানের দায়িত্ব সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায় না। তাঁদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের ঋণ বা বৈধ দায়িত্ব থাকলে তা আদায়ের চেষ্টা করা, তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা এবং তাঁদের জন্য সাদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করা নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ব্যতিক্রম—সাদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। —সহিহ মুসলিম
তাই নেক সন্তান পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে।
পিতা-মাতার বন্ধু ও আত্মীয়দের সম্মান
পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসার একটি সুন্দর প্রকাশ হলো তাঁদের প্রিয় মানুষদের সম্মান করা। তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা, তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা এবং তাঁদের পরিচিতজনদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করা পিতা-মাতার হৃদয়কে আনন্দিত করতে পারে।
এতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং প্রজন্মের মধ্যে ভালোবাসা বজায় থাকে।
আধুনিক জীবনে পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা
আধুনিক জীবনে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে অনেক সন্তান পিতা-মাতার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
কেউ একই ঘরে থেকেও পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলে না। কেউ মোবাইল ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেয়, অথচ বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে কয়েক মিনিট বসার সময় পায় না।
এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য; পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করার জন্য নয়।
সন্তানের উচিত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁদের জন্য সময় রাখা। দূরে থাকলে নিয়মিত ফোন করা, ভিডিও কলে কথা বলা এবং সুযোগমতো তাঁদের কাছে যাওয়া উচিত।
পিতা-মাতার সেবা কেন মহৎ ইবাদত?
পিতা-মাতার সেবা মানুষের চরিত্রকে বিনয়ী করে। তাঁদের সেবা করার মাধ্যমে সন্তান কৃতজ্ঞতা, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ শিখে।
একজন সন্তান যখন বৃদ্ধ পিতার হাত ধরে হাঁটায়, অসুস্থ মায়ের পাশে রাত জাগে, তাঁদের প্রয়োজন পূরণ করে এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে—তখন সে শুধু সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় একটি মহান নেক কাজ করছে।
তবে মনে রাখতে হবে, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করতে গিয়ে আল্লাহর কোনো ফরজ বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না। কারণ সর্বোচ্চ আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর জন্য।
উত্তম সন্তানের কিছু বৈশিষ্ট্য
উত্তম সন্তান—
পিতা-মাতার সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলে,
তাঁদের সম্মান করে,
তাঁদের প্রয়োজন বোঝে,
তাঁদের সেবা করে,
তাঁদের সামনে অহংকার করে না,
তাঁদের ভুলে ধৈর্য ধারণ করে,
তাঁদের জন্য দোয়া করে,
তাঁদের আত্মীয়দের সম্মান করে,
তাঁদের বার্ধক্যে পাশে থাকে,
এবং তাঁদের মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য কল্যাণের কাজ করে।
উত্তম সন্তান শুধু পিতা-মাতার কাছ থেকে ভালোবাসা নেয় না; বরং নিজের জীবন দিয়ে তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করে।
পিতা-মাতার সঙ্গে সুন্দর আচরণের বাস্তব চর্চা
প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসাকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে।
যেমন—
- সকালে তাঁদের সালাম দেওয়া।
- তাঁদের খোঁজ নেওয়া।
- তাঁদের প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করা।
- সময়মতো খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা করা।
- তাঁদের সঙ্গে কিছু সময় বসে কথা বলা।
- তাঁদের কোনো কথা শুনে বিরক্ত না হওয়া।
- বাইরে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাঁদের জানানো।
- তাঁদের পছন্দ ও অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হওয়া।
- তাঁদের জন্য দোয়া করা।
- তাঁদের সামনে অহংকার না করা।
- তাঁদের ভুল হলে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে বিষয়টি সামলানো।
- তাঁদের জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করা।
এসব ছোট কাজই একসময় বড় ভালোবাসার নিদর্শনে পরিণত হয়।
পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা : এক মহান নৈতিক শিক্ষা
একটি শিশুর নৈতিক শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে। সে যদি দেখে তার বাবা-মা দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে ভালো আচরণ করছেন, তাহলে সেও ভবিষ্যতে নিজের পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো আচরণ করতে শিখবে।
অন্যদিকে যে সন্তান পিতা-মাতাকে অপমান করে, তার নিজের সন্তানও ভবিষ্যতে একই আচরণ শেখার ঝুঁকিতে থাকে।
তাই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ শুধু একটি ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নৈতিকতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।
পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি
হাদিসে পিতা-মাতার সন্তুষ্টির গুরুত্ব অত্যন্ত জোরালোভাবে এসেছে। তবে বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝা জরুরি।
পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন করা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে, যখন তা শরিয়তসম্মত ও ন্যায়সংগত কাজের মাধ্যমে অর্জিত হয়। কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কোনো মানুষের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না।
সুতরাং একজন মুসলিমের জীবন হবে ভারসাম্যপূর্ণ—
আল্লাহর হক আদায় করবে,
পিতা-মাতার হক আদায় করবে,
মানুষের হক আদায় করবে,
এবং সবকিছুর ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমা রক্ষা করবে।
একটি হৃদয়স্পর্শী উপলব্ধি
পিতা-মাতা চিরকাল আমাদের পাশে থাকবেন—এ ধারণা ভুল।
আজ যাঁরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করেন, একদিন হয়তো তাঁদের ঘরটি নীরব হয়ে যাবে। আজ যাঁদের কণ্ঠে আমরা শুনি—“খেয়েছ?”, “কোথায় আছ?”, “সাবধানে যেও”—একদিন সেই কণ্ঠ আর শোনা যাবে না।
তখন অনেক অর্থ, সম্পদ ও সাফল্য থাকলেও তাঁদের কাছে ফিরে গিয়ে একবার “মা” বা “বাবা” বলে ডাকার সুযোগ থাকবে না।
তাই তাঁরা জীবিত থাকতেই তাঁদের মূল্য বুঝতে হবে।
তাঁদের ভালোবাসতে হবে।
তাঁদের সম্মান করতে হবে।
তাঁদের সেবা করতে হবে।
তাঁদের জন্য দোয়া করতে হবে।
কারণ মৃত্যুর পর আফসোস করে লাভ নেই; সুযোগ থাকতে ভালোবাসা প্রকাশ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
উপসংহার
পিতা-মাতা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জীবনে এক বিরাট আমানত ও নিয়ামত। তাঁদের প্রতি সদাচরণ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা তাওহিদের নির্দেশের সঙ্গে পিতা-মাতার প্রতি ইহসানের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলা, সম্মান করা, সেবা করা, প্রয়োজন পূরণ করা, বার্ধক্যে পাশে থাকা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করা একজন মুমিনের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
একজন আদর্শ মুসলিম কখনো পিতা-মাতাকে বোঝা মনে করে না। বরং তাঁদের সেবাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—
যে হাতে পিতা-মাতা আমাদের শৈশবে আগলে রেখেছেন,
আজ সেই হাতের যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
যে কণ্ঠ আমাদের প্রথম কথা শিখিয়েছে,
আজ সেই কণ্ঠের প্রতি সম্মান দেখানো আমাদের কর্তব্য।
যে হৃদয় আমাদের জন্য অগণিতবার কেঁদেছে,
আজ সেই হৃদয়ে শান্তি দেওয়াই আমাদের ভালোবাসা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। জীবিত পিতা-মাতাকে সুস্থতা, ঈমান, বরকত ও কল্যাণময় জীবন দান করুন এবং ইন্তেকালকারী পিতা-মাতাদের ক্ষমা করুন, তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
“হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।”
আমিন।
৭
৭ মন্তব্য