সহকারী অধ্যাপক
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:২৩ পূর্বাহ্ণ
কুরআন, মানুষ ও ভাষা—আল্লাহর অপার অনুগ্রহ (সূরা আর-রহমান : ১–৪ নম্বর আয়াতের আলোকে)
কুরআন, মানুষ ও ভাষা—আল্লাহর অপার অনুগ্রহ
(সূরা আর-রহমান : ১–৪ নম্বর আয়াতের আলোকে)
“পরম করুণাময়। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনি তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।”
-মোঃ মুজিবুর রহমান
মানুষের জীবনে এমন কিছু নিয়ামত রয়েছে, যেগুলো এত স্বাভাবিক ও সহজলভ্য যে আমরা অনেক সময় সেগুলোর প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করি না। শ্বাস নেওয়া, দেখা, শোনা, চিন্তা করা, অনুভব করা এবং নিজের মনের কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারা—এসবই মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ। মানুষ প্রতিদিন কথা বলে, প্রশ্ন করে, উত্তর দেয়, জ্ঞান অর্জন করে, ভালোবাসা প্রকাশ করে, দুঃখের কথা জানায়, অভিজ্ঞতা বিনিময় করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান পৌঁছে দেয়। কিন্তু এই অসাধারণ ক্ষমতার পেছনে যে মহান স্রষ্টার অনুগ্রহ রয়েছে, মানুষ অনেক সময় তা ভুলে যায়।
সূরা আর-রহমানের শুরুতেই আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি বিষয় পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন—কুরআন শিক্ষা, মানুষ সৃষ্টি এবং মানুষকে ‘বায়ান’ বা ভাব প্রকাশের সামর্থ্য শিক্ষা দেওয়া। এর মাধ্যমে মানুষের প্রতি আল্লাহর রহমত, কুরআনের মর্যাদা এবং ভাষা ও প্রকাশক্ষমতার গুরুত্ব এক অনন্য ধারায় তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমে বলা হয়েছে—“আর-রহমান”—পরম করুণাময়। তারপর বলা হয়েছে—“তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন।” এরপর—“তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ।” এবং শেষে—“তিনি তাকে বায়ান শিক্ষা দিয়েছেন।”
এই ধারাবাহিকতা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। মানুষ শুধু একটি জৈবিক অস্তিত্ব নয়; তাকে আল্লাহ জ্ঞান, বিবেক, ভাষা, বোঝার ক্ষমতা ও সত্য গ্রহণের সামর্থ্য দিয়েছেন। আর এইসব নিয়ামতের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন তার রবকে চিনতে পারে, তাঁর হিদায়াত গ্রহণ করতে পারে এবং সেই হিদায়াত অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে পারে।
পরম করুণাময় আল্লাহ
সূরা আর-রহমানের সূচনাই হয়েছে মহান আল্লাহর একটি মহিমান্বিত নাম দিয়ে—আর-রহমান, অর্থাৎ পরম করুণাময়।
আল্লাহর রহমত ছাড়া মানুষের কোনো অস্তিত্বই সম্ভব নয়। মানুষ জন্মের আগে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারেনি, জন্মের পর নিজেকে লালন করতে পারেনি এবং নিজের জন্য পৃথিবীর পরিবেশও তৈরি করতে পারেনি। আল্লাহই তাকে সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন, রিজিক দিয়েছেন, জ্ঞান অর্জনের সামর্থ্য দিয়েছেন এবং অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নিয়ামতে ঘিরে রেখেছেন।
মানুষের প্রতি আল্লাহর রহমতের অন্যতম বড় প্রকাশ হলো—তিনি মানুষকে শুধু পৃথিবীতে ছেড়ে দেননি; বরং তাকে পথনির্দেশ দিয়েছেন। কুরআন নাজিল করেছেন, রাসুল পাঠিয়েছেন এবং সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল ও কল্যাণ-অকল্যাণের পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন।
অতএব, আল্লাহর রহমত শুধু খাদ্য, পানি, বায়ু, স্বাস্থ্য, পরিবার কিংবা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিদায়াত, কুরআন, ঈমান, জ্ঞান ও সত্য বোঝার ক্ষমতাও আল্লাহর মহান রহমত।
কুরআন শিক্ষা—মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ
আল্লাহ বলেন—
“তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন।”
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মানুষ সৃষ্টি করার উল্লেখের আগেই কুরআন শিক্ষার কথা এসেছে। এটি কুরআনের মর্যাদা ও মানুষের জীবনে তার অপরিসীম গুরুত্বের প্রতি গভীর ইঙ্গিত বহন করে।
কুরআন কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়। এটি মহান আল্লাহর কালাম, মানবজাতির জন্য হিদায়াত, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী এবং মানুষের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের পথনির্দেশ।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ দেখায়, যা সর্বাধিক সঠিক।”
— সূরা আল-ইসরা : ৯
মানুষ যত জ্ঞানীই হোক, তার জ্ঞান সীমিত। মানুষের অভিজ্ঞতা সীমিত, চিন্তার পরিধি সীমিত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার জ্ঞান সীমিত। কিন্তু আল্লাহ সর্বজ্ঞ। তাই মানুষের জন্য আল্লাহর দেওয়া পথনির্দেশই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
কুরআন মানুষকে শেখায়—
- কে আমাদের স্রষ্টা;
- কেন আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে;
- কীভাবে জীবন পরিচালনা করতে হবে;
- কীভাবে বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণ করতে হবে;
- কীভাবে পরিবার গঠন করতে হবে;
- কীভাবে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে;
- কীভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে;
- কীভাবে সত্য কথা বলতে হবে;
- কীভাবে অন্যায় থেকে বাঁচতে হবে;
- এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।
তাই কুরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এটি জীবন পরিচালনার হিদায়াতের গ্রন্থ।
মানুষ—আল্লাহর সৃষ্টি ও দায়িত্বশীল বান্দা
এরপর আল্লাহ বলেন—
“তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ।”
মানুষ নিজের স্রষ্টা নয়। মানুষ নিজে নিজেকে অস্তিত্বে আনেনি। তার জীবন, দেহ, মস্তিষ্ক, হৃদয়, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, ভাষা, বুদ্ধি—সবই আল্লাহর দান।
আল্লাহ বলেন—
“আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।”
— সূরা আয-যারিয়াত : ৫৬
সুতরাং মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্জন, বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পদ-মর্যাদা অর্জন কিংবা পার্থিব সুখ ভোগ নয়। এগুলো বৈধ উপায়ে অর্জন করা যেতে পারে; কিন্তু এগুলো জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়।
মানুষের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহর বান্দা হওয়া, তাঁর ইবাদত করা, তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর দেওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।
‘বায়ান’—ভাব প্রকাশের অনন্য ক্ষমতা
চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ বলেন—
“তিনি তাকে বায়ান শিক্ষা দিয়েছেন।”
আরবি البيان (আল-বায়ান) শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক। এর মধ্যে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করা, কথা বলা, নিজের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় ব্যক্ত করা এবং কোনো বিষয়কে স্পষ্ট করে তোলার অর্থ রয়েছে।
মানুষ তার মনের ভেতরের কথা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে। সে বলতে পারে—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সে বলতে পারে—
“আমি দুঃখিত।”
সে বলতে পারে—
“আমি ভুল করেছি।”
সে বলতে পারে—
“আমি তোমার সাহায্য চাই।”
আবার সে বলতে পারে—
“আমি সত্যের পক্ষে আছি।”
এই সামর্থ্য মানুষের জীবনে কত বড় নিয়ামত, তা আমরা সাধারণত উপলব্ধি করি না।
একজন মানুষ ক্ষুধার্ত হলে তার প্রয়োজন জানাতে পারে। অসুস্থ হলে ব্যথার কথা বলতে পারে। শিক্ষক জ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারেন। শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারে। মা সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন। সন্তান বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পারে। একজন মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে পারে।
এগুলো সবই আল্লাহপ্রদত্ত বায়ান-এর নিদর্শন।
ভাষা শুধু শব্দ নয়, এটি আল্লাহর নিয়ামত
মানুষের ভাষা একটি বিস্ময়কর নিয়ামত। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য ভাষা প্রচলিত। মানুষের উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার, বাক্যগঠন ও প্রকাশভঙ্গি একেক জায়গায় একেক রকম।
আল্লাহ বলেন—
“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।”
— সূরা আর-রূম : ২২
অর্থাৎ মানুষের ভাষার বৈচিত্র্যও আল্লাহর কুদরতের একটি নিদর্শন।
বাংলা, আরবি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষা—মানুষ যে ভাষাতেই কথা বলুক, কথা বলার সামর্থ্য আল্লাহর দেওয়া।
একটি শিশু জন্মের পর ধীরে ধীরে তার চারপাশের মানুষের ভাষা আয়ত্ত করে। সে শুনে, অনুকরণ করে, ভুল করে, আবার শেখে। একসময় সে নিজের প্রয়োজন, অনুভূতি ও চিন্তা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়।
এটি মানুষের কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি আল্লাহর অসাধারণ শিক্ষা ও অনুগ্রহের প্রকাশ।
‘বায়ান’ জ্ঞান প্রকাশেরও মাধ্যম
বায়ানের অর্থ শুধু কথা বলা নয়। জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান প্রকাশের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।
একজন শিক্ষক একটি বিষয় জানেন এবং তা শিক্ষার্থীদের বোঝান। একজন লেখক তার চিন্তা লিখে রাখেন। একজন গবেষক তার অনুসন্ধানের ফল প্রকাশ করেন। একজন আলেম কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
একজন মানুষ এক জীবনে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করে, তার অনেকটাই অন্য মানুষের কাছ থেকে শেখে। আবার সে নিজে যা শেখে, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।
এভাবেই ভাষা জ্ঞানকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বহন করে নিয়ে যায়।
এই দৃষ্টিতে ভাষা মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
ভাষা ও মানবসভ্যতার বিকাশ
মানুষ কথা বলতে পারে বলেই সে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে। ভাষার মাধ্যমে মানুষ পরিকল্পনা করে, শিক্ষা দেয়, আইন প্রণয়ন করে, অভিজ্ঞতা বিনিময় করে এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
একজন কৃষক অন্য কৃষককে কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা বলতে পারেন। একজন চিকিৎসক রোগ সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারেন। একজন প্রকৌশলী তার পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে পারেন। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভুল সংশোধন করতে পারেন।
অর্থাৎ মানবসভ্যতার অগ্রগতির পেছনে ভাষার ভূমিকা অপরিসীম।
কিন্তু এই নিয়ামতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো—সত্য বলা এবং কল্যাণের কথা বলা।
জিহ্বা—নিয়ামতও, পরীক্ষাও
আল্লাহ মানুষকে কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছেন। কিন্তু এই ক্ষমতা একই সঙ্গে নিয়ামত এবং পরীক্ষা।
মানুষ তার জিহ্বা দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, আল্লাহর জিকির করতে পারে, সালাম দিতে পারে, ভালো কথা বলতে পারে, কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারে এবং মানুষের উপকার করতে পারে।
আবার এই জিহ্বা দিয়েই মিথ্যা বলা, গিবত করা, অপবাদ দেওয়া, কটূক্তি করা, গালি দেওয়া, ঝগড়া সৃষ্টি করা এবং মানুষের সম্মান নষ্ট করাও সম্ভব।
তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
— সহিহ আল-বুখারি; সহিহ মুসলিম
এটি ভাষা ব্যবহারের একটি মহান নীতি।
সব কথা বলা জরুরি নয়।
সব সত্যও সবসময় একইভাবে বলা হয় না।
সত্যকে সুন্দর, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও উপকারী পদ্ধতিতে প্রকাশ করতে হয়।
সুন্দর কথা ঈমানি চরিত্রের অংশ
কুরআন মানুষকে সুন্দর কথা বলতে শিক্ষা দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“আর আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন এমন কথা বলে, যা সর্বোত্তম।”
— সূরা আল-ইসরা : ৫৩
একটি সুন্দর কথা মানুষের মনকে আনন্দিত করতে পারে। আবার একটি কঠিন কথা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট সৃষ্টি করতে পারে।
একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীকে বলেন,
“তুমি চেষ্টা করলে পারবে”—
তাহলে সেই কথা একজন দুর্বল শিক্ষার্থীর মধ্যেও নতুন আশার জন্ম দিতে পারে।
কিন্তু যদি বলা হয়,
“তুমি কিছুই পারবে না”—
তাহলে সে হতাশ হয়ে যেতে পারে।
তাই বায়ান-এর নিয়ামতকে কল্যাণের পথে ব্যবহার করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।
সত্য কথা বলার শিক্ষা
ইসলামে সত্যবাদিতার গুরুত্ব অপরিসীম।
আল্লাহ বলেন—
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।”
— সূরা আল-আহযাব : ৭০
সত্য কথা মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে। সত্য মানুষের ওপর আস্থা সৃষ্টি করে। পরিবারে সত্য থাকলে সম্পর্ক মজবুত হয়। সমাজে সত্য থাকলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যবসায় সত্য থাকলে বিশ্বাস তৈরি হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে সত্য থাকলে জ্ঞান বিকশিত হয়।
অন্যদিকে মিথ্যা মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে, সম্পর্ক দুর্বল করে এবং সমাজে অন্যায় বাড়ায়।
সুতরাং আল্লাহর দেওয়া ভাষার নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা হলো—সত্য ও কল্যাণের কথা বলা।
কুরআন শিক্ষা ও ভাষার সম্পর্ক
কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত হিদায়াত। আর মানুষকে আল্লাহ ভাষা ও ভাব প্রকাশের ক্ষমতা দিয়েছেন, যাতে সে এই হিদায়াত বুঝতে, শিখতে, শিক্ষা দিতে এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
কুরআন তিলাওয়াত করা ইবাদত। কুরআনের অর্থ বোঝা, শিক্ষা গ্রহণ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু সুন্দর কণ্ঠে তিলাওয়াত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; কুরআনের শিক্ষা চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
যদি কুরআন আমাদের সত্যবাদী হতে শেখায়, তাহলে সত্যবাদী হতে হবে।
যদি কুরআন ন্যায়বিচার শেখায়, তাহলে ন্যায়বিচার করতে হবে।
যদি কুরআন বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তম আচরণ শেখায়, তাহলে তাদের সম্মান করতে হবে।
যদি কুরআন মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়, তাহলে মানুষের অধিকার নষ্ট করা যাবে না।
এভাবেই কুরআন শিক্ষা মানুষের ভাষা ও আচরণ উভয়কে পরিশুদ্ধ করে।
ভাষার বৈচিত্র্যে আল্লাহর কুদরত
পৃথিবীতে মানুষের ভাষা অসংখ্য। একটি ভাষার মধ্যেও অঞ্চলভেদে উচ্চারণ ও শব্দের পার্থক্য দেখা যায়। মানুষের ভাষাগত বৈচিত্র্য নিয়ে অহংকার করার কিছু নেই; বরং এটি আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে দেখার বিষয়।
মানুষের ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু সবার স্রষ্টা একজন।
মানুষের উচ্চারণ আলাদা হতে পারে, কিন্তু সবাই আল্লাহর সৃষ্টি।
মানুষের সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু সত্য, ন্যায়, দয়া, সততা ও মানবিকতার মূল্য সর্বত্র গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ভাষার পার্থক্য যেন বিদ্বেষের কারণ না হয়। ভাষা হোক পারস্পরিক বোঝাপড়া, জ্ঞানবিনিময় ও সৌহার্দ্যের মাধ্যম।
কথা বলার আগে চিন্তা করা
আল্লাহ আমাদের বায়ান দিয়েছেন; তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা উচিত—আমি যা বলছি তা কি সত্য? এটি কি প্রয়োজনীয়? এটি কি উপকারী? এতে কি কারও অধিকার নষ্ট হবে?
একজন মুমিনের ভাষা হওয়া উচিত সংযত, মার্জিত ও দায়িত্বশীল।
কথা বলার আগে ভাবতে হবে—
এ কথা কি সত্য?
এ কথা কি প্রয়োজনীয়?
এ কথা কি উপকারী?
এ কথায় কি কারও সম্মান নষ্ট হবে?
এ কথা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে?
এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষের ভাষাকে পবিত্র রাখতে সাহায্য করে।
নীরবতাও কখনো প্রজ্ঞা
যেখানে ভালো কথা বলার সুযোগ নেই, সেখানে নীরব থাকা উত্তম হতে পারে।
নীরবতা মানে দুর্বলতা নয়। অনেক সময় নীরবতা হলো আত্মসংযমের পরিচয়।
রাগের সময় চুপ থাকা, ঝগড়ার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, গিবতের আসরে অংশ না নেওয়া এবং অনর্থক বিতর্ক থেকে দূরে থাকা—এসবও একজন সচেতন মুমিনের গুণ।
তাই আল্লাহ যে ভাষা দিয়েছেন, তার কৃতজ্ঞতা শুধু বেশি কথা বলায় নয়; বরং কখন কথা বলতে হবে এবং কখন নীরব থাকতে হবে—তা জানার মধ্যেও রয়েছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জীবনে ‘বায়ান’
শিক্ষকতার সঙ্গে বায়ান-এর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
একজন শিক্ষক শুধু তথ্য দেন না; তিনি জ্ঞানকে সহজ ভাষায় শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেন। কঠিন বিষয়কে সহজ করেন, অজানাকে জানার পথে নিয়ে যান এবং শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক তাই ভাষাকে ব্যবহার করবেন—
- জ্ঞান দেওয়ার জন্য,
- নৈতিকতা শেখানোর জন্য,
- শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য,
- ভুল সংশোধনের জন্য,
- সত্যের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করার জন্য।
একইভাবে শিক্ষার্থীরও উচিত শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, না বুঝলে ভদ্রভাবে প্রশ্ন করা এবং শেখা বিষয় জীবনে প্রয়োগ করা।
পরিবারে ভাষার সৌন্দর্য
একটি পরিবারের শান্তি অনেকাংশে নির্ভর করে পারিবারিক কথাবার্তার ওপর।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুন্দর কথা ভালোবাসা বাড়ায়। বাবা-মায়ের কোমল ভাষা সন্তানের মনে নিরাপত্তা সৃষ্টি করে। ভাই-বোনের পারস্পরিক সম্মান সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
অন্যদিকে কটু কথা, অপমান, ব্যঙ্গ, গালি, অবজ্ঞা ও অবিরাম অভিযোগ পরিবারের শান্তি নষ্ট করতে পারে।
তাই ঘরকে শান্তির নীড় করতে হলে ভাষাকেও শান্তির ভাষা বানাতে হবে।
“তুমি কিছুই বোঝ না”—এর পরিবর্তে বলা যায়,
“চলো, বিষয়টি আমরা আরেকবার ভেবে দেখি।”
“তুমি সবসময় ভুল কর”—এর পরিবর্তে বলা যায়,
“এখানে হয়তো একটু ভিন্নভাবে করলে ভালো হবে।”
এই সামান্য পরিবর্তন অনেক বড় পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক জীবনে ভাষার দায়িত্ব
একটি সমাজের চরিত্র তার মানুষের কথাবার্তায়ও প্রতিফলিত হয়।
যে সমাজে মানুষ সত্য বলে, অন্যের সম্মান রক্ষা করে, গুজব ছড়ায় না এবং সুন্দরভাবে মতভেদ প্রকাশ করে—সে সমাজে শান্তি ও পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।
আর যে সমাজে মিথ্যা, অপবাদ, গুজব, কটূক্তি ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে—সে সমাজে বিভেদ ও অশান্তি বাড়ে।
তাই সামাজিক যোগাযোগের যুগে বায়ানের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে।
কোনো কথা শেয়ার করার আগে যাচাই করা, কারও সম্মানহানি করে এমন তথ্য প্রচার না করা এবং মিথ্যা খবর ছড়িয়ে না দেওয়া একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব।
লিখিত ভাষাও ‘বায়ান’-এর অন্তর্ভুক্ত
মানুষ শুধু মুখে কথা বলে না; লেখার মাধ্যমেও ভাব প্রকাশ করে।
চিঠি, বই, সংবাদ, প্রবন্ধ, কবিতা, শিক্ষা-উপকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লেখা—সবই মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম।
তাই কলমের ব্যবহারও দায়িত্বশীল হতে হবে।
একটি লেখা মানুষকে জ্ঞানী করতে পারে, আবার একটি মিথ্যা লেখা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
একটি বাক্য কারও মনকে সাহস দিতে পারে, আবার একটি অপমানজনক বাক্য কারও হৃদয়ে কষ্ট সৃষ্টি করতে পারে।
অতএব, মুখের ভাষার মতো লিখিত ভাষাও আমানত।
ভাষার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা কীভাবে প্রকাশ করব?
আল্লাহর দেওয়া ভাষার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত কৃতজ্ঞতা হলো এই নিয়ামতকে সঠিক কাজে ব্যবহার করা।
আমরা যদি—
- কুরআন তিলাওয়াত করি,
- আল্লাহর জিকির করি,
- সত্য কথা বলি,
- সালাম দিই,
- ভালো পরামর্শ দিই,
- অসহায়কে সান্ত্বনা দিই,
- মানুষের ভুল সুন্দরভাবে সংশোধন করি,
- জ্ঞান শিক্ষা দিই,
- বাবা-মায়ের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলি,
- স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করি,
- সন্তানকে ভালো কথা শেখাই,
- এবং মিথ্যা, গিবত, অপবাদ ও অশ্লীলতা থেকে জিহ্বাকে সংযত রাখি,
তাহলে আমরা আল্লাহর এই মহান নিয়ামতের যথাযথ মূল্যায়নের পথে এগিয়ে যাব।
কুরআনের আলোকে মানুষকে সম্মান
মানুষকে আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।”
— সূরা আল-ইসরা : ৭০
তাই মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তার মর্যাদা বিবেচনা করতে হবে।
কেউ দরিদ্র বলে তাকে অপমান করা যাবে না।
কেউ দুর্বল বলে তাকে তুচ্ছ করা যাবে না।
কেউ কম শিক্ষিত বলে তাকে উপহাস করা যাবে না।
কেউ ভুল করেছে বলে তাকে অপমান করে দেওয়া যাবে না।
সংশোধন করতে হলে প্রজ্ঞার সঙ্গে করতে হবে।
কারণ মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং তার ভাষা ও প্রকাশক্ষমতাও আল্লাহর দান।
জ্ঞান, ভাষা ও আমল
জ্ঞান যদি মানুষের চরিত্র পরিবর্তন না করে, তবে সেই জ্ঞান তার জন্য যথেষ্ট কল্যাণকর হয়ে ওঠে না।
কুরআন শেখা মানে শুধু আয়াত মুখস্থ করা নয়; বরং আয়াতের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা।
সত্যের কথা বলা এবং সত্যের পথে চলা—দুটো একসঙ্গে প্রয়োজন।
যে ব্যক্তি মুখে ন্যায়বিচারের কথা বলে কিন্তু কাজে অন্যায় করে, তার মধ্যে বড় অসংগতি রয়েছে।
যে ব্যক্তি আল্লাহর কথা বলে কিন্তু মানুষের অধিকার নষ্ট করে, তাকে নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করতে হবে।
তাই প্রকৃত জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান, যা মানুষকে ঈমান, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র ও সৎকর্মের দিকে নিয়ে যায়।
আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা
সূরা আর-রহমান বারবার মানুষকে আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দেয় এবং প্রশ্ন করে—
“অতএব, তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”
এই প্রশ্ন আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করায়।
আমাদের চোখ আছে—আমরা কি তা সত্য দেখার কাজে ব্যবহার করছি?
আমাদের কান আছে—আমরা কি সত্য শুনছি?
আমাদের মস্তিষ্ক আছে—আমরা কি চিন্তা করছি?
আমাদের ভাষা আছে—আমরা কি সত্য ও কল্যাণের কথা বলছি?
আমাদের কলম আছে—আমরা কি তা মানুষের উপকারে ব্যবহার করছি?
আমাদের জ্ঞান আছে—আমরা কি তা অন্যের কল্যাণে ব্যয় করছি?
এগুলোই কৃতজ্ঞতার বাস্তব পরীক্ষা।
উপসংহার
সূরা আর-রহমানের প্রথম চারটি আয়াত মানুষের জীবনের কয়েকটি মৌলিক সত্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় তুলে ধরেছে—
আল্লাহ পরম করুণাময়।
তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
তিনি মানুষকে বায়ান—ভাব প্রকাশের সামর্থ্য দিয়েছেন।
এই কয়েকটি আয়াত আমাদের শেখায়, মানুষের জীবন আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতে পরিপূর্ণ। কুরআন হলো সবচেয়ে বড় হিদায়াতের নিয়ামতগুলোর একটি। মানুষ হলো আল্লাহর সৃষ্টি। আর ভাষা ও ভাব প্রকাশের ক্ষমতা হলো এমন এক অসাধারণ দান, যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে, জ্ঞান বিতরণ করে, সম্পর্ক গড়ে এবং সত্যের পথে আহ্বান জানাতে পারে।
তাই আমাদের উচিত ভাষাকে অবহেলা না করা। জিহ্বাকে লাগামহীন না করা। কথাকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করা। মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, কটূক্তি ও অশ্লীলতা থেকে নিজেদের রক্ষা করা। সত্য, জ্ঞান, দয়া, ন্যায়, ভালোবাসা ও কল্যাণের কথা বলা।
আমরা যেন কুরআন শুধু তিলাওয়াত না করি—কুরআনের শিক্ষা বুঝি, গ্রহণ করি এবং জীবনে বাস্তবায়ন করি।
আমাদের কথা যেন মানুষের হৃদয় ভাঙার কারণ না হয়; বরং হৃদয়ে আশা জাগায়।
আমাদের ভাষা যেন বিভেদ সৃষ্টি না করে; বরং সত্য ও কল্যাণের পথে মানুষকে একত্র করে।
আমাদের জ্ঞান যেন অহংকার সৃষ্টি না করে; বরং আল্লাহর প্রতি বিনয় বাড়ায়।
আমাদের কলম যেন মিথ্যার বাহন না হয়; বরং সত্য ও ন্যায়ের সাক্ষী হয়।
আর আল্লাহর দেওয়া ‘বায়ান’ যেন আমাদের জন্য গুনাহের কারণ না হয়ে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হয়।
হে পরম করুণাময় আল্লাহ!
আপনি আমাদের কুরআনের সঠিক জ্ঞান দান করুন।
কুরআন বুঝে জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন।
আমাদের জিহ্বাকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের কথায় অভ্যস্ত করুন।
মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, অশ্লীলতা ও কটূক্তি থেকে আমাদের রক্ষা করুন।
আমাদের জ্ঞানকে উপকারী করুন, ভাষাকে সুন্দর করুন, চরিত্রকে উত্তম করুন এবং আমাদের জীবনকে কুরআন-সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করুন।
হে আল্লাহ, আপনার দেওয়া প্রতিটি নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার তাওফিক দাও।
আমাদের কথা, কাজ ও চিন্তাকে তোমার সন্তুষ্টির উপযোগী করে দাও।
আমিন।
৪
৪ মন্তব্য