Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:২৩ পূর্বাহ্ণ

জারণ-বিজারণের দেনা-পাওনা

রসায়নের বাজারে এই ‘জারণ-বিজারণ’ চিজটি হলো একদম খাঁটি মাড়োয়ারি ব্যবসা! এখানে মান-ইজ্জতের চেয়ে বড় কথা হলো নগদ খতিয়ান—কার পকেট থেকে কয়টা ইলেকট্রন খসে পড়ল আর কার তহবিলে কয়টা জমা হলো, এটাই হলো আসল হিসাব। পণ্ডিতেরা একে সংক্ষেপে বলেন ‘রেডক্স’ (Redox)। নামখানা শুনলে মনে হয় যেন কাবুলের কোনো কড়া তামাকের মার্কা, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় এটি আসলে এক মস্ত বড় পকেটমারি কারবার!
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, জারণ মানেই হলো ইলেকট্রন বর্জন। অর্থাৎ, নিজের পকেটের সোনা-দানা অন্যের হাতে তুলে দিয়ে ফতুর হওয়া। রসায়নের পণ্ডিতেরা আমাদের বোঝালেন—‘ইলেকট্রন ছাড়ে যে, জারণ ঘটে তার’। এ যেন আমাদের লখনৌয়ের সেই দিলদরিয়া নবাব, শখের বশে পকেটের শেষ আশরফিটি উজার করে বিলিয়ে দিচ্ছেন, অথচ ভাবছেন বড়ই পুণ্যির কাজ হলো! সোডিয়াম বাবু যখন তার বাইরের ঘরের একমাত্র ইলেকট্রনটি ছেড়ে দিয়ে ‘প্লাস’ সাজেন, তখন তাঁর সেই দাতাঠাকুর রূপ দেখে স্বয়ং হাতেম তাই-ও লজ্জা পেতেন।
আর এই জারণ দাতার ঠিক উল্টো পিঠে ওত পেতে বসে আছেন আরেক চতুর ইয়ার—তার নাম বিজারণ। বিজারণের খাসলত হলো ইলেকট্রন গ্রহণ করা। দাতা বাবু যে ইলেকট্রনটি বাজারে ছেড়ে দিলেন, বিজারণ মহাশয় টপ করে সেটি নিজের পকেটে পুরে নিলেন। ক্লোরিন সুন্দরীর এই কাজে বড় আনন্দ! সে অন্যের পকেট কাটা ইলেকট্রনটি লুফে নিয়ে ‘মাইনাস’ চার্জের চাদর গায়ে জড়িয়ে পরম শান্তিতে বসে থাকে। এ যেন কলকাতার সেই ঘাঘু পকেটমার, ভিড়ের মধ্যে কার পার্সটি গায়েব হলো তা নিয়ে তার বিকার নেই, নিজের আখের গুছাতে পারলেই সে খুশি!
তবে সবচেয়ে বড় ভেলকিটা লুকিয়ে আছে এদের নামকরণে। যিনি ইলেকট্রন ছাড়লেন (অর্থাৎ যাঁর জারণ হলো), রসায়নের খাতায় তাঁর পোশাকি নাম হলো ‘বিজারক’। আর যিনি ইলেকট্রন গিললেন (অর্থাৎ যাঁর বিজারণ হলো), তিনি হলেন ‘জারক’! ভাবুন একবার কী কুদরত! যে নিজে চুরি করল সে হলো পুলিশ, আর যার পকেট কাটা গেল সে হলো চোর! এই উল্টো পুরাণের চক্করে পড়ে পরীক্ষার হলে আমাদের মতো গোবেচারা ছাত্রদের মগজের ঘিলু একদম কান্দাহারের বেদানা আর কাবুলের পেস্তার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। কার জারণ হলো আর কে জারক—তা মেলাতে গিয়ে চোখের জল আর নাকের জল একাকার হয়ে যায়।
পরীক্ষার হলে বসে যখন এই জারণ-বিজারণের সমতা মেলাতে দেয়—অম্লীয় মাধ্যম না ক্ষারীয় মাধ্যম, দর্শক আয়ন ডানে যাবে না বাঁয়ে ঘোরে—তখন আমাদের নম্বরের খতিয়ানও ওই ইলেকট্রনের মতোই ক্রমাগত বিয়োগ হতে হতে সোজা জিরোর কোঠায় গিয়ে ঠেকে।

হে রসায়নের কারিগরগণ, এই দেনা-পাওনার ব্যবসা যদি তোমরা ল্যাবরেটরির খাতায় না তুলে সোজা বড়বাজারের গদিতে গিয়ে করতে, তবে পরীক্ষার হলে আমাদের জীবনের এই জারণ-বিজারণের সমীকরণ অন্তত এভাবে দেউলিয়া হয়ে যেত না!
মন্তব্য করুন

ব্লগ