Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৪০ পূর্বাহ্ণ

যেদিন সব কর্তৃত্ব আল্লাহর (—সূরা আল-ইনফিতারের আলোকে কিয়ামত, জবাবদিহি ও চিরস্থায়ী পরিণতির মহাগাথা( মোঃ মুজিবুর রহমান

যেদিন সব কর্তৃত্ব আল্লাহর

(—সূরা আল-ইনফিতারের আলোকে কিয়ামত, জবাবদিহি ও চিরস্থায়ী পরিণতির মহাগাথা(

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

যেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে, কাঁপবে ধরণী-প্রাণ,
ঝরে পড়বে নক্ষত্রমালা, স্তব্ধ হবে গান।
সমুদ্র হবে একাকার, ভাঙবে সৃষ্টির বাঁধ,
কবর খুলে উঠবে মানুষ—কোথায় যাবে আজ?

সেদিন আর গোপন থাকবে না কোনো জীবনের কাজ,
প্রকাশ হবে কর্মের খাতা, প্রকাশ হবে লাজ।
কে কী আগে পাঠিয়েছে, কে কী রেখে যায়,
সবকিছুরই পূর্ণ হিসাব সামনে এসে দাঁড়ায়।

হে মানুষ! বলো, কীসে তোমায় রব থেকে করল দূর?
কেন ভুলে গেলে সৃষ্টিকর্তা—পরম দয়ালু নূর?
যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন আপন কুদরত দিয়ে,
সুঠাম করে গড়েছেন তোমায় আপন রহমত দিয়ে।

যিনি তোমার দেহ গড়েছেন সুন্দর সামঞ্জস্যে,
অগণিত নিয়ামত দিয়েছেন জীবনভরা স্পর্শে।
যে রূপে তিনি চেয়েছেন, সেভাবেই গড়েছেন প্রাণ,
তবু কেন রবকে ভুলে মিথ্যা পথে দাও পা?

একদিন এই নীল আকাশ থাকবে না আর আগের মতো,
নক্ষত্রগুলো ছড়িয়ে পড়বে—শেষ হবে এই জগত।
সমুদ্রের গভীর জলও হারাবে নিজ সীমা,
কবরের নিস্তব্ধ বুক ফুঁড়ে উঠবে মানুষসীমা।

যে মানুষ আজ পৃথিবীতে নিজেকে ভাবে বড়,
সেদিন তার অহংকার হবে ধূলির মতো ঝরো।
রাজা, প্রজা, ধনী, গরিব—সবাই হবে সমান,
কর্ম ছাড়া সেদিন কারও থাকবে না সম্মান।

সোনা-রূপা, ধন-সম্পদ, প্রাসাদ, অট্টালিকা,
কোনোটিই সেদিন দেবে না নিরাপদ আশ্রয়টিকা।
ক্ষমতা, পদ, পরিচয়—সবই হবে ক্ষীণ,
আল্লাহর সামনে মানুষ হবে সম্পূর্ণ অধীন।

জীবন তো ক্ষণিকের সফর, ফিরে আসবে না কাল,
আজ যে সময় হাতে আছে, কাল সে হবে নাহি আর।
যে আমল আজ লিখে রাখো নিজের দুই হাতে,
সেটিই যাবে তোমার সঙ্গে অন্ধকারের রাতে।

কী পাঠালে সামনে তুমি—একবার ভেবে দেখো,
কোন পথে চলেছ তুমি—নিজ হৃদয়টাকে রেখো।
নামাজ কি আছে জীবনে? আছে কি তাকওয়া?
কুরআনের আলোয় কি চলে তোমার জীবন-নৌকা?

সত্যের পথে থেকেছ কি, রেখেছ হক আদায়?
অন্যের চোখের অশ্রু কি ঝরিয়েছ নিজের দায়?
কথায় কি দিয়েছ আঘাত, মনে কি পুষেছ হিংসা?
নাকি ক্ষমা, দয়া, সত্যে গড়েছ জীবনের দিশা?

হে মানুষ! বলো তো, কীসে তোমার এত অহংকার?
তোমার রবই তো দিয়েছেন জীবন, শক্তি, অধিকার।
মাটি থেকে সৃষ্টি করে দিয়েছেন সম্মান, জ্ঞান,
তাঁরই দানে চোখে দেখো, তাঁরই দানে প্রাণ।

তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমায়, দিয়েছেন সুন্দর রূপ,
দিয়েছেন বিবেক, দিয়েছেন জ্ঞান—অমূল্য সেই ধূপ।
শ্বাসে শ্বাসে তাঁরই দয়া, রক্তে তাঁরই দান,
তবু কেন অবহেলায় কাটে তোমার প্রাণ?

যে রব তোমাকে গড়েছেন মায়ের গর্ভের ঘরে,
কেড়ে নিতে পারেন সবকিছু এক মুহূর্তের ঝড়ে।
তাই তো মানুষ, ফিরে এসো রবের দিকে আজ,
তাওবা করে শুদ্ধ করো অন্তর ও সমাজ।

তোমার ওপর নিয়োজিত সম্মানিত ফেরেশতারা,
তোমার কথা, তোমার কাজ লিখে রাখে তারা।
ভালো-মন্দ কোনো কিছুই থাকে না অগোচর,
প্রতিটি কাজের সাক্ষী হয়ে থাকে সেই প্রহর।

গোপনে করা পাপও তাদের কাছে গোপন নয়,
নিভৃতে করা নেক কাজও হারিয়ে কখনো নয়।
মানুষ ভুলে যায়, কিন্তু লেখা থাকে সব,
একদিন খুলবে সেই খাতা—জানবে তখন রব।

তাই জিহ্বাকে সংযত করো, সৎ রাখো মন,
অন্যের হক নষ্ট করে পেয়ো না কোনো ধন।
চোখকে রাখো পবিত্র, হাতকে রাখো সৎ,
হালাল পথে জীবন গড়ো—এ পথই সবচেয়ে মধুর।

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে, সৎপথে থাকে,
তাকওয়ার আলো হৃদয়ভরা, রবকে ভালোবাসে।
তারা পাবে নিয়ামত, পাবে শান্তির স্থান,
সৎ আমলের প্রতিদান হবে অশেষ সম্মান।

নামাজে যাদের হৃদয় নত, কুরআনে যাদের প্রাণ,
সত্য ও ন্যায়ের পথে যাদের অবিচল পদচারণ।
দুঃখে যারা ধৈর্য ধরে, সুখে করে শুকরিয়া,
আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় চলে প্রতিটি দিয়া।

তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ, রয়েছে পুরস্কার,
রবের অনুগ্রহে উজ্জ্বল হবে তাদের সংসার।
দুনিয়ার ক্ষণিক সুখ নয়—তাদের আসল আশা,
আল্লাহর সন্তুষ্টি আর জান্নাতের ভালোবাসা।

আর যারা সত্য অস্বীকার করে, পাপে ডুবে যায়,
অন্যায়কে আপন করে ন্যায়কে দূরে ঠেলে দেয়,
তাদের সামনে ভয়াবহ এক কঠিন পরিণতি,
জাহান্নামের শাস্তি—দুঃসহ তার গতি।

সেদিন আর পালানোর কোনো পথ থাকবে না,
কেউ কাউকে নিজের শক্তিতে রক্ষা করতে পারবে না।
দুনিয়ার বন্ধুত্ব, ক্ষমতা, সম্পদ, পরিচয়—
আল্লাহর বিচারের সামনে কোনো মূল্য নয়।

তাই আজই ফিরে এসো, সময় থাকতে ভাই,
মৃত্যু এলে তাওবার সুযোগ পৃথিবীতে আর নাই।
অন্তর যদি কলুষিত হয়, আজই করো শুদ্ধ,
রবের রহমত চেয়ে ফিরে এসো অবনত মস্তক।

কী সেই দিন—প্রতিদান দিবস? কে পারে তার মাপ?
মানুষের কল্পনারও বাইরে তার ভয়াবহ চাপ।
সেদিন কেউ কারও জন্য নিজে থেকে কিছু নয়,
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারও কোনো ক্ষমতা নয়।

যে পিতা আজ সন্তানের জন্য জীবন দিতে চায়,
সেদিন প্রত্যেকে নিজের হিসাব নিয়েই ব্যস্ত হয়।
যে বন্ধু আজ বন্ধুর পাশে দাঁড়ায় প্রাণ দিয়ে,
সেদিনও সবকিছু হবে আল্লাহর হুকুম মেনে।

কেউ কারও হক বহন করবে না নিজের শক্তিতে,
প্রত্যেকে দাঁড়াবে রবের সামনে নিজের আমল নিয়ে।
সেদিন স্পষ্ট হবে কে সত্য, কে ছিল ভ্রান্ত,
কে ছিল আল্লাহভীরু, কে ছিল অবাধ্য ও অশান্ত।

দুনিয়া তোমার স্থায়ী ঘর নয়—এ শুধু ক্ষণিক পথ,
আজ যে জীবন পূর্ণ মনে হয়, কালই হতে পারে রথ।
যৌবন যাবে, শক্তি যাবে, সৌন্দর্য হবে ক্ষয়,
ধন-সম্পদও থাকবে পিছে—সঙ্গে যাবে নেকময়।

তাই সম্পদ রাখো হাতে, হৃদয়ে রেখো না,
দুনিয়ার মোহে আখিরাতকে কখনো ভুলো না।
হালাল পথে উপার্জন করো, হক আদায় করো,
অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো।

পিতা-মাতার সেবা করো, আত্মীয়ের হক দাও,
প্রতিবেশীর কষ্ট দেখলে সহায়তার হাত বাড়াও।
সত্য বলো, আমানত রাখো, অন্যায় থেকে ফেরো,
কুরআন-সুন্নাহর সরল পথে জীবনটাকে গড়ো।

আজও তো দরজা খোলা, আজও সময় আছে,
তাওবার অশ্রু ঝরাতে পারো নির্জন রাতের মাঝে।
আজও তুমি নামাজ পড়তে পারো রবের সামনে নত হয়ে,
আজও তুমি ফিরে আসতে পারো ভুলের পথটি ছেড়ে।

আজও তুমি ক্ষমা চাইতে পারো যার হক মেরেছ,
আজও তুমি ফেরত দিতে পারো যা অন্যায়ভাবে নিয়েছ।
আজও তুমি ভাঙা হৃদয়ে সান্ত্বনার হাত রাখো,
আজও তুমি অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে হাঁটো।

মৃত্যু এসে দরজায় কড়া নাড়ার আগেই ফিরে এসো,
কবরের নীরব ঘরে যাওয়ার আগেই নিজেকে গড়ো।
জীবন যতটুকু অবশিষ্ট—সেটুকু করো দান,
নেক আমলে পূর্ণ করো তোমার জীবনের মান।

সেদিন প্রকাশ পাবে জীবনের প্রতিটি অধ্যায়,
কোথায় ছিল সত্য তোমার, কোথায় ছিল অন্যায়।
কথা, কাজ, নিয়ত—সবই হবে প্রকাশিত,
কেউ পারবে না গোপন করতে কোনো অপরাধচিত্র।

তাই অন্তরকে শুদ্ধ রাখো, নিয়ত করো খাঁটি,
রিয়া-অহংকার থেকে রাখো নিজেকে দূরে সরিয়ে।
মানুষের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই,
তাঁরই পথে চললে মানুষ—হারিয়ে যাবে না ভাই।

সেদিন সব কর্তৃত্ব থাকবে এক আল্লাহর হাতে,
কেউ থাকবে না তাঁর সমকক্ষ কোনো ক্ষমতার সাথে।
রাজত্ব, কর্তৃত্ব, বিচার—সবই তাঁরই দান,
তাঁরই সামনে নত হবে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ প্রাণ।

তিনি রব, তিনি মালিক, তিনি পরম মহান,
তাঁরই হুকুমে সৃষ্টি পায় জীবন ও পরিণাম।
তাঁরই ইচ্ছায় সকাল আসে, তাঁরই হুকুমে রাত,
তাঁরই হাতে জীবন-মৃত্যু, তাঁরই হাতে প্রভাত।

তাই তাওহীদের পথে চলো, শিরক থেকে দূরে থাকো,
কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে ঈমানকে দৃঢ় রাখো।
আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই—এই সত্যে থাকো স্থির,
তাঁর সন্তুষ্টির পথেই খুঁজে নাও জীবনের নূর।

কোথায় চলেছ তুমি আজ? কী তোমার জীবনের পথ?
সামনে কি আখিরাত, নাকি দুনিয়ার মোহময় রথ?
কী পাঠালে সামনে তুমি—একবার হিসাব করো,
অবহেলার ঘুম ভেঙে আজ নিজেকে প্রস্তুত করো।

তোমার হাতে যতটুকু সময়, মূল্য দাও তার,
একটি ভালো কাজও হতে পারে মুক্তির দ্বার।
একটি সত্য কথা, একটি ক্ষমা, একটি দয়া,
আল্লাহর কাছে হতে পারে অমূল্য এক ছায়া।

আবার একটি জুলুম, একটি মিথ্যা, একটি হক নষ্ট,
মানুষের জীবনে আনতে পারে ভয়াবহ কষ্ট।
তাই আমলনামা ভরাও নেক কাজের আলোয়,
আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা রাখো হৃদয়ের ভালোয়।

ফিরে এসো, হে মানুষ, সময় থাকতে ফিরে এসো,
গুনাহের অন্ধকার ছেড়ে তাওবার পথে এসো।
রবের রহমত সীমাহীন—হতাশ হয়ো না আর,
সত্যিকার তাওবা করে চাও তাঁরই ক্ষমার দ্বার।

নামাজকে জীবনের সাথী করো, কুরআনকে করো পথ,
সুন্নাহর আলোয় গড়ে তোলো চরিত্র ও রথ।
হালাল-হারাম বুঝে চলো, ন্যায়কে করো সঙ্গী,
তাকওয়ার আলোয় আলোকিত হোক জীবনভূমি।

হে আল্লাহ! কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনের আগে,
আমাদের অন্তর জাগিয়ে দাও তোমারই অনুরাগে।
যে ভুল করেছি জীবনে—ক্ষমা করো হে রব,
তাওবার তাওফিক দাও, মুছে দাও সব কলুষ-কলব।

আমাদের ঈমান রাখো অটুট, তাওহীদ রাখো প্রাণে,
সুন্নাহর পথে চলার শক্তি দাও প্রতিক্ষণে।
সৎকর্মে জীবন ভরাও, পাপ থেকে রাখো দূর,
তোমার সন্তুষ্টির পথে দাও চলার নূর।

যেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে, কাঁপবে বিশ্বধাম,
যেদিন খুলবে আমলনামা, প্রকাশ পাবে সব কাজ,
সেদিন যেন নেককারদের কাতারে থাকে আমাদের নাম,
তোমার রহমতে জান্নাত হোক আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা।

হে আল্লাহ! দুনিয়ায় দাও ঈমান, আমলে দাও আলো,
মৃত্যুর আগে তাওবার সুযোগ, অন্তরে দাও ভালো।
কবরের জীবন করো শান্ত, কিয়ামতের ভয় করো দূর,
হাশরের ময়দানে দাও তোমার রহমতের নূর।

হে আল্লাহ! তোমার সন্তুষ্টিই হোক জীবনের লক্ষ্য,
তোমার আনুগত্যেই হোক আমাদের চূড়ান্ত সাফল্য।
কিয়ামতের দিনে তোমার রহমত ছাড়া নেই কোনো আশ্রয়—
আমাদের ক্ষমা করো, কবুল করো, হে পরম দয়াময়।

আমিন।

মন্তব্য করুন